পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে গত ২৭ জুলাই মো. ইব্রাহীম নামের এক মাদরাসা শিক্ষককে আটক করে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দারা ইব্রাহিমকে ধরে দুমকি থানায় সোপর্দ করেন।
ইব্রাহিমের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক খবর, অনেক মামলা, গ্রেপ্তার, আদালতের রায় এবং মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ–সবই বলছে, দেশজুড়ে অনেক মাদরাসায় শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এসব মাদরাসায় মেয়ে শিশুদের মতো ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনাও সামনে এসেছে। এর বাইরে মাদরাসাগুলোতে শিশুদের বেধড়ক পেটানোর মতো অভিযোগ তো আছেই!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নির্যাতনে শিশুদের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা মারাত্মক। কঠোর আইন বাস্তবায়নের ওপরও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ?
সামাজিক চাপ বা ভয়ে হোক, কিংবা ধর্ষণের শিকার হওয়াকেই লজ্জা ভেবে গোপন রাখার প্রবণতায়ই হোক, বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো ঘটনা সব সময় পুলিশে নথিবদ্ধ হয় না। মাদরাসায় শিশুদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসতে না দেওয়ার এই প্রবণতা আরও বেশি।
তা সত্ত্বেও মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণেই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদরাসায় ধর্ষণের ঘটনাগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে। তাতে চিত্রটা ভয়াবহ বলেই মনে হবে যে কারও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ঘাটলে আলিয়া মাদরাসার চেয়ে কওমি মাদরাসায় এমন ঘটনা বেশি ঘটছে বলেই মনে হবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কওমি মাদরাসাগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই।
কিন্তু মাদরাসায় শিশুদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সেটা আলিয়া মাদরাসার ক্ষেত্রেও নয়, কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রে তো নয়ই! তবে ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় বক্তারা জানান, মাদরাসায় ছেলে শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির ঘটনা বেশি ঘটে। এর মধ্যে বেশির ভাগই কওমি ধারার মাদরাসা।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গত ৬ মে তারিখেও এক বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে। দেশের সব মাদরাসায় অবিলম্বে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের জোর দাবিও জানায় তারা। এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীনের আনাম বলেন, মাদরাসাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান–তাই উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাইরে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
উচ্চ আদালত ২০২৩ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে বিবৃতিতে এমজেএফ লিখেছে, “…তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলো অনেকাংশে এই নির্দেশনার বাইরে থেকে গেছে। এমজেএফ মনে করে, সব মাদ্রাসাকে এই নির্দেশনার আওতায় এনে দ্রুত যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা জরুরি।”
উল্টো দাবি এসেছে কওমি ঘরানা থেকে
গত ২৯ জুলাই রাজধানী যাত্রাবাড়ীতে আল-হাইআতুল উলয়ার কার্যালয়ে এক সভায় অভিযোগ করা হয়, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি কওমি মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট কিছু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের বিষয়গুলো যেভাবে উঠে আসছে, সেটা ‘একমুখী প্রচারণা’।
একইসঙ্গে সভায় জানানো হয়, অভিযোগ যাচাই, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং কওমি মাদরাসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদারকি জোরদারের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণের জন্য ‘হটলাইন’ চালুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
সেদিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, কোনো অপরাধ, অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গণমাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লাখ লাখ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কওমি মাদরাসা: অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার
বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষার ঐতিহাসিক ভিত্তি ভারতীয় উপমহাদেশের দেওবন্দি শিক্ষাধারায়। ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর, এর দেওবন্দী আদর্শ এবং ‘দারসে নিজামি’ শিক্ষাপদ্ধতি অবিভক্ত বাংলায় বিস্তার লাভ করে। এই ধারার মাদরাসাগুলোই মূলত আমাদের দেশে ‘কওমি মাদরাসা’ নামে পরিচিত।
বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাগুলো মূলত জনগণের অনুদানে পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বীকৃতি নেই, নিয়ন্ত্রণও এত বছরে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি কোনো সরকার। আর চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার প্রভাব বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা অঙ্গনে ঐতিহাসিকভাবে বেশ শক্তিশালী।
১৯৭৮ সালে ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বাড়ে। কওমি শিক্ষায় কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ও ইসলামী ইতিহাসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে সাধারণ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ইংরেজির পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদিস সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবিতে মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে এখনো বাংলাদেশে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেক আলাদা। কওমি মাদরাসাগুলো সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয় না। সেগুলো মূলত স্বতন্ত্র বেসরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব আলেম-উলামা ও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) অন্যতম।
মাদরাসায় শিশু নির্যাতন বেশি–প্রচার নাকি বাস্তবতা?
ভারতীয় উপমহাদেশে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা; অর্থাৎ, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ শেখানোর বিষয়টি বেশ পুরনো। প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদরাসার ওপর অভিভাবকদের আস্থা অনেক বেশি। বিশেষ করে আবাসিক মাদরাসায় সন্তানকে রেখে অনেক পরিবার মনে করে, সেখানে শিক্ষা ও নিরাপত্তা–দুটিই নিশ্চিত হবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেক মাদরাসায় শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো মাদরাসা শিক্ষার জন্য বদনাম বয়ে আনছে বলে মনে করছেন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদরাসাগুলোর একটি বড় অংশ আবাসিক। সেখানে পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া সবকিছুই ফ্রি। আর যারা সেখানে পড়ে, তাদের বড় একটি অংশই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা। ফলে মনিটরিং থাকে না, জবাবদিহির অভাব আছে। অভিভাবকরাও খোঁজ রাখেন না।
রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি মাদরাসা জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ। সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আরিফ উদ্দিন মারুফ–যার বড় ভাই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের সাবেক গ্র্যান্ড ইমাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। মারুফ জানালেন, তারা বেশ কয়েকটি মাদরাসা চালান। মাদরাসায় শিশু নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বলেন, “এ দেশের মানুষ ও সমাজব্যবস্থা অনুসারে একটি প্রবাদ আছে না? অভিভাবকরা (শিক্ষকদের) বলেন যে, হাড্ডিগুলো আমার আর গোশত আপনার। এটা তো শুধু মাদরাসা নয়, স্কুলেও আগে এমন ছিল।”
তবে ইদানীং মাদরাসায়ই কেন ছাত্র-ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের বিষয়গুলো বেশি আসছে, জানতে চাইলে আরিফ উদ্দিন মারুফ বলেন, “এটার জন্য সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় দায়ী। না হলে এটা কি চিন্তা করা যায়!” মাদরাসায় ঘটা এমন ঘটনার সবগুলো সামনে আসছে না বলেও স্বীকার করেন তিনি।
শুধু সমাজে নৈতিক অবক্ষয়কেই দায়ী করা হলে সেটাকে সমস্যা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে। কারণ, সাধারণ স্কুল-কলেজে তো পরিস্থিতি এমন নয়। মাদরাসায়ই কেন এসব ঘটনা এত বেশি হচ্ছে?
এ ক্ষেত্রে আরিফ উদ্দিন মারুফের ভাষ্য–শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকা ও তুলনায় কম বয়স্ক হওয়ার কারণে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। চরচাকে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে হেফজখানায় যারা শিক্ষক হন, তাদের অনেকে কিন্তু আলেম না। অনেকে উচ্চ শিক্ষিত পড়ুয়া নয়। তারা কোরআন শরিফ জানে, এটুকুই।”
আরিফ উদ্দিন বলেন, “তাদের আবার বয়সও কম থাকে। বয়স্কদের মেজাজের মধ্যে যে স্থিরতা, পরিপক্কতা থাকে, তরুণদের মধ্যে তো সেই জিনিসটা থাকে না। এরপর অনেকের ট্রেনিং নেই। তাতে মানসিকভাবে ডেভেলপ করার জন্য যে ট্রেনিং দরকার, সেটা নেই। সব কিছু মিলিয়ে এসব অবস্থার তৈরি হচ্ছে।”
কয়েকটি ঘটনা
নেত্রকোণার মদনে ১২ বছর বয়সী এক কওমি মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ ও গর্ভবতী করার মামলায় শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগর হুজুরকে প্রধান করে দুই আসামির বিরুদ্ধে গত ২৭ আগস্ট আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। মদনের পাঁচহাট বড়বাড়ি এলাকার একটি মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক আমান ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। পরে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখে বিষয়টি জানাজানি হলে চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল শিশুটির মা মদন থানায় মামলা করেন। দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হলে র্যাব-১৪ ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে মূল অভিযুক্ত আমানকে গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী। ছবি: সংগৃহীত
একইভাবে কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে ওই মাদরাসার মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক শিক্ষককে ২১ জুলাই আটক করে পুলিশ। ১২ জুলাই ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ করা থেকে বিরত রেখেছিলেন মোস্তাফিজুর। কিন্তু অন্য শিক্ষার্থীরা ঘটনাটি দেখে ফেলায় জানাজানি হয়ে যায়। পরে পুলিশ মোস্তাফিজুরকে আটক করে। তাকে আটকের পর ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থী পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে বলে, “১২ তারিখ সকালে ঘুমিয়ে ছিলাম। সে সময় হুজুর এসে আমার সঙ্গে জিনা (বলাৎকার) করেছে। তখন আমি চোখ খুললে হুজুর মাথায় হাত দিয়ে বলে, মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেছ।” ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, স্বপ্ন দেখার কথা বলে হুজুর মোস্তাফিজুর রহমান ১০ থেকে ১২ দিন তাকে ধর্ষণ করেছে। জানা গেছে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাটি সালিশের মাধ্যমে আপসের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীর বাবা তা মানেননি, তিনি পুলিশকে জানান।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মাদরাসার আট বছর বয়সী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে গত ৪ আগস্ট ওই মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুক্তভোগী শিশুটি ওই মাদরাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী। মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে প্রধান শিক্ষক শিশুটিকে ওয়াশরুমে নিয়ে ধর্ষণ করতেন।
গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদরাসায় শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আবদুল মালেক নামে এক মাদরাসা শিক্ষককে ২০২৫ সালের ৮ মার্চ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পর ওই শিশুর পরিবারের সদস্য ও এলাকার লোকজন আবদুল মালেককে আটক করে। তিনি ধর্ষণচেষ্টার কথা স্বীকার করেন এবং পরে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়। আতিকুর রহমান নামে একজনের ফেসবুক আইডি থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে আবদুল মালেক ধর্ষণচেষ্টার কথা স্বীকার করেন। ৫৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে তিনি বলেন, “আমি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে করে ফেলেছি। এমন কাজ আমি আর কখনো করিনি।”
২০১৯ সালের ২৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের একটি মাদরাসার শিক্ষককে আটকের পর তাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব। ধর্ষণের শিকার ৩ শিক্ষার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, ওই মাদরাসা শিক্ষক তিন বছরে মোট ১১ জন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানি করে আসছিল। শিক্ষক কখনো আখিরাতের ভয়, কখনো ‘হুজুরের কথা শোনা ফরজ’, ‘না শুনলে গুনাহ হবে’, ‘জাহান্নামে যেতে হবে’ ইত্যাদি ভয় দেখাতেন। আবার কখনো তাবিজ করে পাগল করা বা পরিবারের ক্ষতি করার ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন বয়সী মাদরাসার ছাত্রীদের ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি করতেন। তাদের মধ্যে আট বছর বয়সের একটি শিশুও আছে।
শুধু মেয়েরা নয়, ঝুঁকিতে ছেলেরাও
মাদরাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের আলোচনায় সাধারণত মেয়ে শিশুদের ঘটনাই বেশি সামনে আসে। কিন্তু বিভিন্ন মামলায় ছেলে শিশুদেরও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের একটি আদালত ২০১৯ সালে দুই মাদরাসাছাত্রকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি মাদরাসার রাঁধুনি ছিলেন। আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দণ্ড দেন। একই মামলায় মাদরাসার দুই শিক্ষকও অভিযুক্ত ছিলেন, তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।
এই রায়টি দেখায়, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে–দুই ধরনের ভুক্তভোগীই থাকতে পারে, এবং প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও ঘটনার প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
শুধু যৌন নির্যাতন নয়, বেধড়ক পেটানোর ঘটনাও আছে
চলতি বছরের এপ্রিলে নরসিংদীর ‘মাদরাসাতুল আবরার এরাবিয়া’ মাদরাসায় ৭ বছরের এক শিশুকে নির্মমভাবে পেটানোর অভিযোগ ওঠে শিক্ষক নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। আহত শিশুর নাম মুজাহিদ। শিক্ষকের পিটুনিতে শিশুটির পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট বেঁধে ক্ষত হয়ে যায়। পরে শিশুটিকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৪ এপ্রিল ভেলানগর জেলখানার মোড় এলাকা থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক নাজমুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শিশু নির্যাতন প্রতীকী ছবি। ছবি: ফেসবুক
২০২২ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে একটি কওমি মাদরাসায় আট বছরের শিশু ইফতেখার মালেকুল মাশফির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল। তখন এই ঘটনায় ওই মাদরাসার তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
মাদরাসাগুলোতে শিশুদের বেধড়ক মারধর নিয়ে কয়েক বছর আগেই সোচ্চার হয়েছিলেন ধর্মীয় বক্তা রফিক উল্লাহ আফসারী। কুমিল্লার এই বক্তা এক ওয়াজে আবাসিক মাদরাসাগুলোতে সন্তানদের পেটানোর বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। ভাইরাল হওয়া সেই ওয়াজে আফসারী বলেন, “…যে মারটা দেয় ভাই! খবর নেন? সরল বিশ্বাসে আপনেরা হাফিজি মাদরাসায় দিয়ালান। কত মাইর দেয়! এই ছোট পোলাইনগুলার (শিশুদের) বদদোয়া…।”
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের সঙ্গে মাদরাসার শিক্ষকদের পার্থক্যও তুলে ধরে সেই ওয়াজে আফসারী বলেছিলেন, “…প্রাইমারি স্কুলে চাকরি হলে সরকার হ্যাতেরে দুইটা বছর ট্রেনিং দেয়, পিটিআইয়ের ট্রেনিং দেয়। আগে শেখ, পরে পড়াইস। (মাদরাসায়) হ্যাতেরা তো হেফজ হইয়াই দৌড় দেয় হাফিজি মাদরাসায়, আইয়া তামা কইরালায় পোলাইনগুলারে পিডাইয়া।”
মাদরাসায় যৌন নির্যাতন নিয়েও কয়েক বছর আগে আরেক ভিডিওতে কথা বলেছিলেন এই বক্তা। ওই বক্তব্যে মাদরাসায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা ভয়াবহ। শেষে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, “…বুঝিহুনি (বুঝেশুনে) প্ল্যান করিয়েন। আপনেরা তো খালি মনে করেন, হুজুরেরা ভালা… খালি হুজুরেরা ভালা।”
মাদরাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ মাদরাসার অধ্যক্ষ আরিফ উদ্দিন মারুফের মতে, গণমাধ্যম সচেষ্ট হওয়ায় এই বিষয়গুলো কমতে শুরু করেছে। ঢাকার বাইরেই এ ঘটনাগুলো বেশি ঘটে বলে মত তার, “ঢাকায় এগুলি তুলনামূলক কম। গ্রামে সাধারণত দেখা যায় আরকি। তাদের (গ্রামের শিক্ষার্থীদের) ও রকম সামর্থও থাকে না। ঢাকায় তো সচেতন, তাই হয় না।”
মাদরাসায় শিশুদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের এই প্রবণতা ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না বলে জানান আরিফ উদ্দিন। বললেন, “আমাদের আন্ডারেও তো অনেক মাদরাসা আছে। এসব বিষয় নিয়ে আমরাও চিন্তা করছি। তবে আমরা এসব বিষয় স্ট্রিক্টলি লক্ষ্য রাখছি। তারপরও দেখা যায় ঘটনা ঘটায় ফেলে।”
এভাবে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে মাদরাসার শিক্ষার্থী কিংবা তাদের পরিবারের করণীয় কী? মাদরাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষেরই-বা দায়িত্ব কী? উত্তরণের উপায় নিয়ে আরিফ উদ্দিন বলেন, “সামগ্রিকভাবে যে নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে, এটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। দ্বিতীয় বিষয় হলো–সিস্টেমগত কিছু পার্থক্য করা দরকার। যেমন, আমরা আমাদের এখানে ২৪ ঘণ্টা সিসি ক্যামেরা করেছি। আমরা একজন শিক্ষকের রুমে একা উনাকে দেই না। একজনের রুমে একাধিক শিক্ষক থাকে। এভাবেই খেয়াল রাখতে হয় আরকি।”
মাদরাসাভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি নীতিমালার দিক থেকেও উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন অধ্যক্ষ আরিফ উদ্দিন মারুফ, “আমাদের যে সর্বোচ্চ মাদরাসা বোর্ড আছে–হাইয়াতুল ওলিয়া (আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া), সেখানকার আমিও সদস্য। সেখানে তারা আরও আগেই বই আকারে নীতিমালা করেছে। এ ছাড়া তদারকির জন্য একটি কমিটি করা হচ্ছে।”
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান চরচাকে বলেন, “এ বিষয়টি আমাদের কাছে (এখতিয়ারে) না, আমাদের আন্ডারে না। এটা মাদরাসা অধিদপ্তরের বিষয়। এটা তারা দেখে। তা-ও আমরা আমাদের কথা বলি, কোথাও গেলে এ বিষয়ে কথা বলি।”
অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের সহকারী পরিচালক ড. মো. ইসমাইল হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কেন্দ্রে কথা বলতে বলেন। তাকে যখন জানানো হলো যে, সংশ্লিষ্টরা ঢাকার বাইরেই এসব ঘটনা বেশি ঘটছে বলে জানিয়েছেন এবং বরিশালের একটি ঘটনার দিকেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, তখন ড. ইসমাইল বলেন, “আমাদের কাছে তো এ বিষয়ে তেমন অভিযোগ ফরমালি আসতেছে না।” তবে তিনি সরাসরি কথা বলবেন বলে জানান। টেলিফোনে কথা বলা যাবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আজকে তো ছুটির দিন।”
একই বিভাগের পরিদর্শক ইমন আমিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা কী করব? সেটার জন্য তো স্থানীয় প্রশাসন আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। যা করার, তারাই তো করবেন। মামলা হবে, অ্যারেস্ট হবে।” এ সব ঘটনা যাতে কমে আসে, তার জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরের দিক থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আমি বলতে পারব না। অবশ্যই এটা সামাজিক সমস্যা, সব সময়ই তো এটা নিয়ে বলা হয়।”
বিশেষজ্ঞদের চোখে
ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া যেকোনো বয়সী মানুষেরই বাকি জীবন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। শিশুদের ওপর এর প্রভাব তাহলে কতটা গভীর হওয়ার কথা? যে বয়সে পৃথিবীর রঙয়ে বিস্ময়ামুগ্ধ হওয়ার কথা, সে বয়সে কিছু বোঝার আগেই এমন জঘন্যতম অপরাধের শিকার হতে হচ্ছে শিশুদের। সেটাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজেরই মাদরাসার শিক্ষকের হাতে! এসব তাদের মনে কতটা প্রভাব ফেলে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন চিত্রটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, “যেকোনো শিশুর ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা যে-ই ঘটাক, সেটা তার ওপর প্রভাব পড়ে। এর অনিবার্য কুফল হচ্ছে, এতে (শিশুটি ভবিষ্যতে) আগ্রাসী মনোভাব দেখাবে, অনেক ধরনের লক্ষণ দেখাবে।”
নিপীড়নের শিকার শিশুর ভবিষ্যৎ কতটা শঙ্কায় পড়ে যায়, এ ব্যাপারেও ধারণা পাওয়া যায় ড. কামাল উদ্দিনের কথায়, “যারা এ রকম নিপীড়ন করে, সেটা শারীরিক হোক আর যৌন হোক, এটার দীর্ঘমেয়াদী ফল মারাত্মক। এতে সে (নিপীড়নের শিকার শিশু) যেটা শিখেছে, সে ভবিষ্যতে অন্যদের ওপর এমনটা করতে পারে। তার আত্মসম্মান কম থাকবে, সামাজিকভাবে অ্যাডজাস্ট কম হবে। আগ্রাসী মনোভাব দেখাবে। এমন অনেক কিছু করবে।”
শিক যারা এমন ঘটনা ঘটায়, তাদের এমন মানসিক বিকৃতির সম্ভাব্য কারণ কী কী হতে পারে, সে প্রশ্নে মনোবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক সামনে নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায়–বিশেষ করে কওমি মাদরাসার পুরনো সমস্যার কথা, “যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নেই, সেসব জায়গাকে তারা অভয়ারণ্য মনে করে। যেখানে তারা মনে করে, সব কিছু করা যায়। সেখানে (যা-ই করুক) কোনো কিছু হবে না। দোহাই দিয়ে হোক কিংবা ভয় দেখিয়ে হোক, এটা তারা জাস্টিফাই করে। এ জন্য সেখানকার শিশুরা ধরে নেয়, এটাই বোধ হয় নিয়ম।”
মাদরাসায় পাঠ শেষে মাদরাসার শিক্ষক হিসেবে যিনি যোগ দিচ্ছেন, তিনিও এই ব্যবস্থার একজন ভুক্তভোগী। নারী ও পুরুষের মধ্যকার দূরত্ব বজায় রাখা একটা কাঠামোতে তারা বেড়ে ওঠেন। ফলে এ ক্ষেত্রে একটা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা থেকে যায়। এর প্রভাবও এখানে থাকতে পারে বলে মনে করছেন ড. কামাল উদ্দিন।
কিন্তু এসব তো সমস্যার আলাপ, সমাধান কী? মাদরাসায় শিশু যৌন ও শারীরিক নির্যাতন বন্ধে কী কী করা উচিত? এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক হাফিজুর রহমান বলেন, “মাদরাসায় এসব ঘটনা যাতে না হয়, সে জন্য এ দিকগুলো দেখতে যারা আছে, তাদের আরও অ্যাকটিভ হতে হবে। এগুলোর জন্য তো আইন রয়েছে। আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে হতে হবে। তাহলে এগুলো বন্ধ হয়ে আসবে। কিন্তু সেটা প্রোপারলি হচ্ছে না বলেই এ ধরনের ঘটনা হচ্ছে।”
অধ্যাপক হাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণ, স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর বেতের ব্যবহার কমানোসহ অনেক ব্যবস্থা যেভাবে নেওয়া গেছে, একইভাবে ব্যবস্থা নিলে মাদরাসার ক্ষেত্রেও ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ কমিয়ে আনা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে একটাই শর্ত বেঁধে দিয়েছেন তিনি, “আইনের সঠিক প্রয়োগ হলেই এগুলো কমে যাবে বলেই আমি মনে করি। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক যদি এমন কিছু করে, তাহলে তো অবশ্যই আইন আছে। সেটা প্রোপারলি প্রয়োগ হলে এবং স্টেপ নেয়া গেলে এগুলো কমে যাবে।”