গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির তীব্র সংকট এবং দেশের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সারা দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট (২৭ আগস্ট দিবাগত রাত ১টায়) মধ্যরাতে দেশে তিন হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগেরদিন, বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় লোডশেডিং পৌঁছায় তিন হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। এভাবে চলতে থাকলে জ্বালানির অভাবে নতুন রেকর্ড হবে লোডশেডিংয়ের।
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ, তবে গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিটি এলাকায় দৈনিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা নিলেও, গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বহুতল ভবনে লিফটে আটকে পড়ার আতঙ্ক ও বাসাবাড়িতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত
পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং বাকি ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় চলেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি অব্যবহৃত পড়ে ছিল।
দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ছবি: বাসস
দেশে বর্তমানে খাতা-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেই সক্ষমতার সিংহভাগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিপযয়ে বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ ও খুলনা
২৬ আগস্ট রাত ৮টার ইভনিং পিকের অঞ্চলভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, দেশের প্রতিটি জোনই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেদিন মোট চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮১২ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছিল মাত্র ১৫ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট।
| জোন | চাহিদা (মেগাওয়াট) | লোডশেডিং (মেগাওয়াট) |
|---|
| ময়মনসিংহ | ১,৬২২ | ৪৫৬ |
| খুলনা | ২,০৬৮ | ১৮৪ |
| ঢাকা | ৫,৮৪৮ | ১৬৬ |
| সিলেট | ৭৯৯ | ১৬০ |
| কুমিল্লা | ১,৭০৯ | ১৫৭ |
| রাজশাহী | ১,৮২১ | ১৪৭ |
| চট্টগ্রাম | ১,৫৮৭ | ১০৮ |
সূত্র: পিজিসিবি
এর আগের দিন, ২৫ আগস্ট রাত ৯টায় দেশজুড়ে মোট এক হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই ছিল ৪১৮ মেগাওয়াট। বুধবার মধ্যরাতে সারা দেশে মোট লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট, যার মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) এলাকায় একাই ছিল দুই হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট। আরইবি ৮০টি সমিতির মাধ্যমে ঢাকার বাইরের গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে একই এলাকায় দিনে একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
জ্বালানি সংকটে বন্ধ হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র
গ্যাস সংকট: পিজিসিবি এবং পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ছিল মাত্র ৮৮০ দশমিক ৯৩ এমএমসিএফডি। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে ঘোড়াশাল ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের ইউনিট-২ ও ইউনিট-৫ এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ। ঘোড়াশাল ইউনিট-৪ (বর্তমান উৎপাদন ১৮০ মেগাওয়াট), ইউনিক মেঘনাঘাট ৫৮৪ মেগাওয়াট সিসিপিপি (উৎপাদন ৪১৫ মেগাওয়াট) এবং মেঘনাঘাট (জেরা) ৭১৮ মেগাওয়াট সিসিপিপি (উৎপাদন মাত্র ২৩৩ মেগাওয়াট)—এই বড় কেন্দ্রগুলো ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে। আরপিসিএল ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি লো-গ্যাস প্রেসারের কারণে কোনো উৎপাদন করতে পারেনি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গ্যাসের সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। এই সংকটের একটি বড় কারণ ২১ জুলাইয়ের একটি দুর্ঘটনা। ওই সময় কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বিকল হয়ে পড়ে, যাতে রাতারাতি দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে মেরামতের পর কিছু গ্যাস সরবরাহ ফেরানো গেলেও এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারার কারণে টার্মিনালটি থেকে এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটি: দেশের অন্যতম বৃহৎ পায়রা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে যান্ত্রিক ত্রুটিতে ভুগছে। ২৬ আগস্ট এই কেন্দ্রের উৎপাদন নেমে আসে মাত্র ৫৫০ মেগাওয়াটে। রামপাল এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি কয়লা সংকটের কারণে এক হাজার ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করছে। মাতারবাড়ী ২×৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটিই বন্ধ (আইটিভি বিডি)। দেশের ৮টি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম।
ভারতের আদানি গ্রুপের ঝাড়খণ্ডের কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে এক হাজার ৪০০- এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হওয়ার কথা থাকলেও, ঝাড়খণ্ডে বন্যায় কয়লা ভিজে যাওয়ায় এবং ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন সেখান থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮০০-৯০০ মেগাওয়াট। মাঝে মাঝে শুধু পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট মিলছে।
তরল জ্বালানি সংকট: বকেয়া পরিশোধ না করায় বেসরকারি খাতের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের অভাবে বন্ধ রয়েছে। আরপিসিএল ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র ফার্নেস অয়েল সংকটে বন্ধ এবং পিডিবি-আরপিসিএল ১৪৯ মেগাওয়াট কেন্দ্র আংশিক উৎপাদনে রয়েছে। বৃহস্পতিবার মোট ২৪টি কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল সরবরাহে ঘাটতি ছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম চরচাকে বলেন, “পিডিবির সঙ্গে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ-সংক্রান্ত বিরোধ মেটানো গেলে তেলভিত্তিক উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।”
চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ লোডশেডিং কত?
চলতি আগস্ট মাসে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড একাধিকবার ভেঙেছে। ১০ আগস্ট রাত ১টায় দেশে তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। এর মাত্র ১০ ঘণ্টা আগে, ৯ আগস্ট বিকেল ৩টায় রেকর্ড হয়েছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট— অর্থাৎ চলতি সংকট আগের যেকোনো রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
পিডিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৮-১২ আগস্ট সপ্তাহে গড়ে চাহিদার ১৫ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে লোডশেডিং ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
জনভোগান্তি ও প্রতিক্রিয়া
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সহিংস প্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া গেছে। লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের কিছু এলাকায় গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিবেদনটি। সিলেটের টুকের বাজারেও বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া গেছে।
শিল্প খাতেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। গ্যাস সংকটের পর বিদ্যুৎ ঘাটতিতে কারখানাগুলোতে বারবার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে বিকল্প জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ১৩ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ পুরোপুরি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত সরকারের হাতে বেশি বিকল্প নেই। এর আগে ১২ আগস্ট তিনি জানিয়েছিলেন, নতুন কৌশল নেওয়ার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন, তবে সংকট পুরোপুরি কাটতে কত দিন লাগবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেননি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম সার্বিক অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজের ব্যবহার এবং অনভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভরতার কারণে সংকট থেকে মুক্তি মিলছে না। তার মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং দুর্নীতি বন্ধ না করলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তির সুযোগ নেই।
আবহাওয়া দিকে চেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ
২৬ আগস্টের হিসাবে, প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৫ টাকা, যা ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্র বেশি চালানোর ফল। ওই দিন সারা দেশে মোট ৩৫৬ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে সংকট আরও ঘনীভূত করেছে।