গুনে গুনে ৮ দিন। নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন রংপুরের মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রীয়ম। প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ঘটনাটি সামনে আসার পরপরই এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার হন স্থানীয় দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। গ্রেপ্তারের পর দুজন স্বীকার করে নেন তাদের অপরাধ। আদালতে দেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি।
স্বীকারোক্তিতে তাদের সরল দাবি শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় এবং সম্মানহানির ভয়ে একে একে পরিবারের চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ, সম্পর্কে যারা মামাতো-ফুপাতো ভাই।
তাৎক্ষণিকভাবে দুই আসামি গ্রেপ্তার এবং তাদের সরল স্বীকারোক্তির পরও অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সংবাদকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট নন কেউই। তাদের মধ্যে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে চরচা। অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়, দুই আসামির আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের কাছে দেওয়া মৌখিক জবানবন্দির মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি কেবল ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় আবেগতাড়িত হয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হত্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত চুরির ঘটনা, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় নির্মম হত্যাকাণ্ডে।
নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ। ছবি: চরচা
এই ঘটনার পেছনের কারণ জানার চেষ্টা করার আগে, হত্যাকারী এবং হত্যার শিকার ব্যক্তিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। এই ঘটনার ভিকটিম এবং অপরাধীরা বাড়ির প্রাচীর ঘেঁষা প্রতিবেশী। তাদের ধর্ম একই হলেও জাতিগত পার্থক্য রয়েছে। রংপুরের দাসপাড়ার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধদের মতো দাস গোত্রের পরিবারগুলোর মাঝেই এক টুকরো জমি কিনে তাতে নির্মাণাধীন দোতলা বাড়ি করে বসবাস করছিলেন সপরিবারে হত্যার শিকার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর ব্রাহ্মণ পরিবারটি। একসময় এই জমির মালিক ছিলেন হত্যাকারীদের পূর্বপুরুষেরা। জাতভেদের কারণে প্রতিবেশীদের সঙ্গে খানিকটা দূরত্ব মেনেই চলত পরিবারটি। আর পরিবার বলতে চারজন–গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রীয়ম। অন্যদিকে অপরাধী দুজন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পরস্পর আত্মীয়।
সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী আর মুগ্ধের পেশা মাছ কাটা। মাদক অধ্যুষিত এই দাসপাড়া এলাকার মাদক কারবারিদের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হন তারা। ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি খুচরা বিক্রির সঙ্গেও যুক্ত হন এই দুজন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আর ঘটনাস্থলে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, নিহত শিক্ষকের নির্মাণাধীন বাড়িটির নিচতলার কাজ চলমান। দোতলায় একমাত্র ফ্ল্যাটে পরিবারের চারজন থাকতেন। তার উপরে ভবনের ছাদ। বাড়িটির সামনে বড় লোহার গেট থাকলেও চারপাশে কোথাও ছোট প্রাচীর এবং কোথাও সম্পূর্ণ অরক্ষিত। তাই বাড়িটির নিচতলায় এবং ছাদে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। আর এই বাড়ির ডান পাশের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে আসামি সিদ্ধার্থ দাসের টিনের ঘর। কিছুটা এগোলেই আবার মুগ্ধ দাসের বাড়ি। আবার শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির মূল ফটকের বাম পাশেই মুগ্ধ দাসের বন্ধু সীমান্তদের আধাপাকা বাড়ি। ঘটনার আগে মাঝরাত পর্যন্ত এই সীমান্তদের বাড়িতেই বসে ইয়াবা সেবন করেছিল দুই ‘হত্যাকারী’। আর সীমান্তদের বাড়ির ঠিক পিছনে আরও একটি নির্মাণাধীন ভবন যা স্থানীয়ভাবে ‘দেবুদের বাড়ি’ নামে পরিচিত। ভবনের বাসিন্দা বলতে কেবল দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়ারা। এই ভবনের তিনতলা থেকেই গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়েছিল সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
যে অবস্থায় মিলেছিল চার মরদেহ
দুই আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী ২১ আগস্ট শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাজানি হয়নি। পরবর্তী ৪০ ঘণ্টায় আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর বন্ধু ও প্রেমিকের তৎপরতায় ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রাত দেড়টার দিকে ওই বন্ধুর সঙ্গে ফোনে ৪০ সেকেন্ড কথা হয় প্রার্থীর। হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার দুপুর থেকে প্রার্থী ও তার মাকে টেলিফোনে না পেয়ে শনিবার বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়ে ডাকাতির সন্দেহে পুলিশ ডাকেন তিনি। রাত ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে আসে কোতয়ালী মডেল থানা এবং গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকে। এ সময় বাড়িটি ছিল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। নিজেদের মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট এবং পোর্টেবল জেনারেটর ব্যবহার করে বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে যাওয়ার একমাত্র পথ সিঁড়ির মুখের লোহার দরজাটি খোলার কাজ করেন তারা।
দরজার কিছু অংশ কাটার পর বোঝা যায় এটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। সবশেষে হাইড্রোলিক হ্যামার ব্যবহার করে এটি খোলা হয়। অন্ধকারের মাঝে ফায়ার সার্ভিসের ফ্ল্যাশ লাইটের সহযোগিতায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। নিচতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতেই দেখা যায় ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। ভেতরে বাসিন্দাদের কোনো উপস্থিতি নেই, সব এলোমেলো, লুটপাটের চিত্র স্পষ্ট। তল্লাশির সময় বাসার ভেতরে দুর্গন্ধের সূত্র ধরে দোতলার ফ্ল্যাটে কিছু না পেয়ে ছাদে সিঁড়ি ঘরে গিয়ে পাওয়া যায় মা-মেয়ের মরদেহ। সুরতহাল প্রতিবেদন এবং সে সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে মরদেহগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ওই সিঁড়ি ঘরের মুখেই ছাদে যাওয়ার লোহার দরজা, যা ভেতর থেকে সবসময় বন্ধ থাকার কথা থাকলেও এর ছিটকিনি ছিল খোলা। এই দরজার সামনে উপুড় হয়ে পড়েছিল প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মরদেহ। তিন তলা থেকে আরও অর্ধেক সিঁড়ি নির্মাণ করা ছিল, যেখানে গণপতি কবুতর পালতেন। এই সিঁড়িতেই মাথা নিচে এবং পা উপরের দিক করে চিৎ হয়ে মায়ের মরদেহ ঘেঁষে পড়েছিল প্রার্থীর মরদেহ। দুজনের শরীরেই পচন ধরেছিল। বাইরের কেউ যেন মা-মেয়ের মরদেহ দেখে না ফেলে সেজন্য সিঁড়ির ফাঁকা অংশের গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখা ছিল ঘরের বিছানার চাদর।
বাসান নিচতলার গেট। এটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ছবি: চরচা
রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে প্রথমে পাওয়া যায় দুজনের মরদেহ। অন্ধকার ছাদে গিয়ে শুরুতে গণপতির মরদেহ দেখতে পায়নি পুলিশ। প্রাথমিকভাবে এটিকে ডাকাতির পর হত্যাকাণ্ড এমন ঘটনা ধরে নিয়ে কাজ শুরু করে পুলিশ। অপরাধীদের পালানোর একমাত্র পথ ছিল বাড়ির ছাদ। তাই আলামত খুঁজতে ছাদে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সে সময় ছাদে কোনো দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। কৌতূহলবশত ছাদের দরজার বাম পাশে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি পুরাতন টিন এবং কাঠের তক্তা সরাতেই বেরিয়ে আসে গণপতির পচন ধরা মরদেহ। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মরদেহটি খুঁজে পেয়েছিলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সাইদ বাবলা। চরচাকে তিনি বলেন, “আমরা ছাদে গিয়ে প্রথমে স্যারের বডি পাইনি। তেমন গন্ধও ছিল না। টিনের স্তূপটা উঁচু হয়ে থাকায় মনে হলো, ক্রাইম সিন যেহেতু একটু সরিয়ে দেখি কিছু আছে কি না। টিনের ওপর আবার কিছু কাঠের তক্তা আর ভাঙা টাইলসের কয়েকটি টুকরা রেখে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো সরাতেই ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ নাকে লাগে আর স্যারের বডি পাই। ছাদে ঢুকতে হাতে বাম পাশেই রাখা ছিল বডিটা।”
সবার শেষে উদ্ধার হয় গণপতির ছেলে প্রীয়মের মরদেহ। তার মরদেহটি পাওয়া যায় রুমের ভেতরে খাট ও দেয়ালের মাঝে ছোট ফাঁকা জায়গায় লুকানো অবস্থায়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, প্রীয়মের মরদেহটি খুঁজে পেতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে। কারণ, ওই রুমে কিছুটা দুর্গন্ধ থাকলেও মরদেহটি লুকানো ছিল। প্রথমে কেউ ধারণা করতে পারেনি যে, খাটের পাশের ফাঁকা জায়গায় মরদেহ থাকতে পারে। প্রীয়মের মরদেহেও পচন ধরেছিল, তবে বাকি তিনটি মরদেহের তুলনায় কম। আর ঘরের জানালা বন্ধ থাকায় দুর্গন্ধ বাইরে ছড়ায়নি। অন্যদিকে, ঘরের প্রতিটি জিনিস ছিল ছড়ানো-ছিটানো, যা চোখে দেখায় চুরি বা ডাকাতিকেই ইঙ্গিত করে। গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে ডাইনিং টেবিলের ওপর থেকে ইয়াবা খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত ফয়েল কাগজের টুকরো এবং একটি বালতিতে পাওয়া যায় ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে রাখা তিনটি মোবাইল ফোন। আর নিচতলায় সিঁড়ির নিচে লোহার দরজাটি ছিল ভিতর থেকে তালাবদ্ধ। রাত ১২টার পর স্থানীয় দুই ইলেকট্রিশিয়ানের সহযোগিতায় বাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করা হয়।
আসামি দুজন শনাক্ত যেভাবে
মরদেহগুলো শনাক্ত হওয়ার পর ক্রাইম সিন হিসেবে বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহে কাজ শুরু করে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। অন্যদিকে অপরাধীদের বিষয়ে ধারণা পেতে মাঠে নামেন পুলিশ সদস্যরা। যেহেতু মরদেহগুলো দেখেই বোঝা গেছে ঘটনাটি দু-একদিন আগের তাই স্থানীয় নিজস্ব সোর্সদের ব্যবহার করে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া শুরু করে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। এ বিষয়ে প্রতিবেশীরা সরাসরি কোনো তথ্য না দিলেও একজন নিজের পরিচয় গোপন রেখে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থের বিষয়ে তথ্য দেন। এদিন ভোর ৫টার দিকে গোয়েন্দারা কৌশল করে সিদ্ধার্থের অবস্থান সম্পর্কে বাবা বিনয় দাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি নিজেই একই এলাকার তার ভাইয়ের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখান থেকে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। আটকের সময় সিদ্ধার্থের গায়ে আঁচড়ের দাগ লক্ষ্য করেন গোয়েন্দারা। সিদ্ধার্থকে আটক করা হলে তিনি মুগ্ধের বিষয়ে তথ্য দেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে মুগ্ধের বাড়িতে গেলে পুলিশ দেখে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মুগ্ধ। পরে প্রায় দুই কিলোমিটার তাড়া করে স্থানীয় দক্ষিণগঞ্জ মহাশ্মশান থেকে মুগ্ধ দাসকে আটক করেন গোয়েন্দারা।
শ্মশানের ডোম বিদ্যুৎ মোহন্তের কাছে পানি এবং আশ্রয় চেয়েছিলেন মুগ্ধ। বিদ্যুৎ মোহন্ত জানান, ভোরে আটকের কয়েক মিনিট আগে তার রুমের দরজার সামনে এসে লুটিয়ে পড়েন মুগ্ধ। নিজের পরিচয় দিয়ে পানি ও আশ্রয় চেয়েছিলেন তিনি। মুগ্ধ যে খুন করেছেন, সেটি বিদ্যুতের কাছে স্বীকারও করেন তিনি। পরে শ্মশানের এই ডোমের বক্তব্য মামলার সাক্ষী হিসেবে আদালত গ্রহণ করেন। দুজনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন গোয়েন্দারা। শুরুতে সিদ্ধার্থ নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও শরীরের আঁচড়ের চিহ্ন ধরে প্রশ্ন করলে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। অন্যদিকে শ্মশান প্রাঙ্গণ থেকে আটকের সময়ই ভয়ে ভেঙে পড়েন মুগ্ধ। গোয়েন্দাদের তিনি অনুরোধ করেন, তাকে যেন মারা না হয়, পুরো ঘটনা তিনি নিজ থেকেই স্বীকার করবেন।
পরে গোয়েন্দা হেফাজতে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন মুগ্ধ। আলাদা জিজ্ঞাসাবাদে দুজনের বক্তব্য প্রায় একই রকম হওয়ায় আদালতে পাঠিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী চরচাকে বলেন, “ঘটনাস্থলে মরদেহগুলো দেখেই আমাদের বুঝতে পারি এটা কয়েকদিন আগের ঘটনা। তাই আমরা শুরুতেই প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি। বেশির ভাগই কোনো তথ্য দেননি, সবাই বলছিল, তারা কিছু জানেন না। তবে একজন আমাকে সিদ্ধার্থের বিষয়ে তথ্য দেয়, সেটি কাজে লাগে। অপরাধের পর তারা খুব সচেতনভাবে সময় নিয়ে আলামত নষ্ট করেছে বলে পালানোর প্রয়োজন মনে করেনি, তারা ভেবেছিল তাদের কেউ শনাক্ত করতে পারবে না বরং পালালেই সন্দেহের আওতায় চলে আসবে।”
সনাতন বলেন, “এজন্য ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তারা আমাদের সামনেই ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘোরাঘুরি করেছে। তারা যেহেতু পেশাদার অপরাধী না, তাই ধরা পড়ার পরপর সহজেই সব স্বীকার করে নিয়েছে। পেশাদার অপরাধী হলে হয়তো এত সহজে স্বীকার করত না।”
দুজনের জবানবন্দি ও পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে বিস্তর ফারাক
গত ২৩ আগস্ট ভোরে আটক হওয়ার পর প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হন দুই আসামি। একই দিন সন্ধ্যায় দুজনকে আদালতে তোলা হলে দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা ম্যাজিস্ট্রেট তাদের বক্তব্য শুনে তা রেকর্ড করেন।
নিয়ম অনুযায়ী, এসময় আসামিদের সামনে কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। জবানবন্দি রেকর্ডের আগে তাদের অভয় দিয়ে আশ্বস্ত করা হয়, যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য প্রকাশ পায়। গত বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে আদালতে দেওয়া দুজনের জবানবন্দির কিছু অংশ পড়ে শোনান সদ্য বিদায়ী রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। আদালতের জবানবন্দিতে দুজনের দায় স্বীকারের বিষয়টি থাকলেও হত্যার মোটিভ এবং আলামত নষ্টের বিষয়টি উল্লেখ করেননি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
তবে চরচার অনুসন্ধান বলছে, হত্যার উদ্দেশ্যসহ অপরাধ আড়াল করতে আলামত নষ্টের চেষ্টার কথা দুজনই পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিল। শুরুতে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলার কারণে তাৎক্ষণিক এই হত্যার কথা বললেও তা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছিল না তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে না পারায় সিদ্ধার্থ এক সময় জানান, ওই বাড়িতে সেদিন তারা চুরি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এরপর তার দেওয়া তথ্যেই চুরি করা স্বর্ণালঙ্কার তার চাচার বাড়ির নারকেল গাছের গোড়ায় পুঁতে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করেন গেয়েন্দারা।
সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে চরচাকে বলেন, “আমি যখন সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞাসাবাদ করি তখনো ইয়াবার গল্পই ঘুরেফিরে বলছিল। কিন্তু শুধু ইয়াবা খেয়ে ভয় পেয়ে দুটি ছেলে চরজনকে হত্যা করে ফেলবে, তা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছিল না। তাছাড়া তাদের যদি পূর্ব পরিকল্পনা না থাকে, পুরো বিষয়টাই যদি আকস্মিক হবে, তবে তিনজনকে হত্যার পর তাদের শুধু চুরির নাটক সাজাতে এত ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে কেন ঢুকতে হবে?
“এটা ও যত সহজভাবে বলছিল আমাদের অত সহজ মনে হচ্ছিল না। তারপর ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে মোবাইল ফোনে লেগে থাকা ফিঙ্গার প্রিন্ট নষ্টের চেষ্টা তাদের অতটা ইনোসেন্ট প্রমাণ করে না। আমি যখন বারবার প্রশ্ন করেছি, তখন সে স্বীকার করে যে, সে যেহেতু স্বর্ণের দোকানে কাজ করে তাই স্বর্ণের দাম সম্পর্কে তার বেশ ধারণা ছিল। তাছাড়া সম্প্রতি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্থানীয় ইয়াবা কারবারি শান্ত ও তুশির ঘনিষ্ঠ হয়ে খুচরা ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাই আমাদের ধারণা তারা বড় বিনিয়োগ খোঁজার চেষ্টায় ছিল।”
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “সব বিষয় তুলে ধরে প্রশ্ন করলে সে একসময় আমাকে জানায় গণপতি স্যারের স্ত্রী সবসময় স্বর্ণালংকার পরে থাকতেন। বাড়ির বাইরে কোথাও গেলেও তিনি ভারী অলংকার পরতেন। তাই ওই বাসায় চুরি করার ইচ্ছা ছিল সিদ্ধার্থের। কিন্তু পরে আদালতের জবানবন্দিতে সে কৌশলে এসব বিষয় এড়িয়ে গেছে। সে সচেতনভাবেই শুধু ইয়াবা আসক্তির ওপর ঘটনাটি চাপিয়ে দিয়েছে। আমরা কেউ তো ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষে ছিলাম না, তাই এই সুযোগটি নিয়েছে।”
এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী চরচাকে বলেন, “দেখুন আমি কিন্তু শুরু থেকেই বলে আসছি, যে তারা ইয়াবা খেয়ে এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, তা আমরা বিশ্বাস করছি না। আমরা সম্ভাব্য সকল মোটিভকে আমলে নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। আমি আপনাকে (চরচার প্রতিবেদক) আসামির স্বীকারোক্তির পরও স্পষ্টভাবে বলেছি শুধু ইয়াবা খাওয়া দেখে ফেলাই একমাত্র কারণ না। আমরা সব বিষয়েই তদন্ত করছি। এখন উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তো আমার সুনির্দিষ্ট করে মিডিয়ায় কিছু বলে দিতে পারি না। আমি এখনো বলছি, ওদের স্বীকারোক্তিই শেষ কথা নয়। আমরা একাধিক মোটিভ মাথায় রেখে কাজ করছি। এখানে পরিকল্পিত চুরির বিষয়টি যেমন আছে, একইভাবে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ও আমরা দেখছি, এমনকি কোনো পূর্ব বিরোধ ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।”
আদালতে জবানবন্দি রেকর্ড হওয়ায় তদন্তে ভিন্ন কিছু উঠে এলে তা পরে কোনো সংকট তৈরি করবে কি না জানতে চাইলে এই গেয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “না। এমনটা ভাবার কারণ নেই যে, আদালতে তারা যা বলেছে, এখানেই তদন্ত শেষ। বরং আমাদের তদন্ত মাত্র শুরু হলো। এখন আমরা সময় নিয়ে প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য ক্রসচেক করব। তারা যা বলেছে, তার ভিন্ন কিছু পেলে আদালতকে অবহিত করব। প্রয়োজন আমরা আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রেয়ার দেব, এখানে কোনো জটিলতা নেই।”
বাড়ির বিদ্যুৎ নিয়ে বিভ্রাট কেন?
এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থা গেলে দেখা যায়, বাড়িতে কোনো বিদ্যুৎ নেই। পরে স্থানীয় দুই ইলেকট্রিশিয়ানের সহযোগিতায় রাত ১২টায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়। দুই আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছিল, শুক্রবার ভোরে হত্যা এবং স্বর্ণালংকার চুরির পর তাদের সন্দেহ হয় ওই বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে। সেই সন্দেহ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সিঁড়ি ঘরে থাকা একটি কাটিং প্লাস দিয়ে মিটারের তার কাটতে যাওয়ার মুহূর্তে শর্ট সার্কিট হয়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে হত্যা এবং স্বর্ণালংকার লুটপাটের পর দুজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এই কাজটি করে।
বিদ্যুৎ বিচ্ছন্ন করে দেওয়া হয়েছিল বাড়িটির। ছবি: চরচা
যদিও আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার তথ্যটি আড়াল করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। পুলিশের কাছে তাদের স্বীকারোক্তির বরাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সামনে এলে এ নিয়ে শুরু হয় এক তুমুল বিতর্ক। কারণ এরই মধ্যে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে প্রার্থীর সঙ্গে তার এক বান্ধবীর ফেসবুক মেসেঞ্জারের চ্যাট প্রকাশ পায়। সেখানে দেখা যায় ঘটনার কিছুসময় আগে প্রার্থী তার ওই বান্ধবীকে লিখেছেন, তাদের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগে কোনো একটি সমস্যা হয়েছে। আশপাশের সব বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তাদের বাড়িতে রাতভর বিদ্যুৎ নেই। তাই তিনি ঘুমাতে পারছেন না।
এই স্ক্রিনশটের তথ্য সঠিক হলে দুই আসামির বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ঘটনার পর পালানোর সময় আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিলেন–এই স্বীকারোক্তি সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। তাই স্ক্রিনশটের সত্যতা জানতে প্রার্থীর ওই বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, প্রার্থী ও তিনি ব্যাচমেট। প্রায় সময়ই তাদের নিজেদের মধ্যে মেসেঞ্জারে কথা হতো। তিনি ওই স্ক্রিনশটের সত্যতা দাবি করেন এবং জানান ঘটনার দিন ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে সবশেষ চ্যাট হয় তাদের দুজনে। বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করাই ছিল প্রার্থীর শেষ রিপ্লাই। এরপর আর কোনো জবাব আসেনি প্রার্থীর ফেসবুক আইডি থেকে।
এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে মেসেঞ্জারে ওই কথোপকথন যাচাই করতে চান এই প্রতিবেদক। কিন্তু চ্যাটবক্সে ঢুকে দেখা যায়, ২০২৩ সালের পর তাদের আর কোনো আলাপচারিতার রেকর্ড নেই। কারণ, ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রার্থীর চ্যাটবক্সের সেটিংসে ‘ডিজঅ্যাপেয়ারিং মেসেজেস’ অপশনটি চালু করে রেখেছিলেন ওই বান্ধবী। তবে সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি জানার পর ওই স্ক্রিনশটটি নিয়ে পরিচিত একজন স্থানীয় সাংবাদিককে পাঠিয়েছিলেন। ওই স্ক্রিনশটের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ না থাকায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এটিকে আলামত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে সম্পাদিত কি না। সেটি না হলে তা গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে মামলায় সংযুক্ত করা হবে।
এদিকে ঘটনার পর প্রার্থীর এই বান্ধবী প্রার্থীর প্রেমিককে টেলিফোন করে একই তথ্য জানিয়েছিলেন। রাতভর বিদ্যুৎ কেন ছিল না–সে বিষয়ে খোঁজ নিতে বলেছিলেন ওই বান্ধবী। চরচার সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য জানিয়েছিলেন প্রার্থীর প্রেমিক নিজেই।
শনিবার সন্ধ্যার পর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর উদ্ধার অভিযানে আসা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিপাকে পড়েন। কারণ, ওই বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। স্থানীয় পুলিশের অনুরোধে বেলাল নামের একজন ব্যক্তি তার পরিচিত স্থানীয় ইলেক্ট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মনকে অনুরোধ করে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগটি পরীক্ষা করে মেরামত করান। বেলাল চরচাকে জানান, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার একজন সিনিয়র নেতা তাকে ফোন করে ইলেক্ট্রিশিয়ানের ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন।
উজ্জ্বল কুমার বর্মনের সঙ্গে কথা হয় চরচার। তিনি জানান, তিনি রাত ১১টার পর ঘটনাস্থলে যান। বাড়ির মিটারে লাইন পরীক্ষা করে দেখতে পান বাড়ির বাইরে সড়কে থাকা মূল বিদ্যুৎ লাইন থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ হচ্ছে না। উজ্জ্বল বলেন, “আমি স্যারের বাড়ির মিটারের পজেটিভ এবং নিউট্রাল ফেইজের ভোল্টেজ মেপে দেখি পজেটিভে ভোল্টেজ আছে। কিন্তু নিউট্রালে কোনো ভোল্টেজ নেই। বুঝলাম মেইন লাইন থেকে সমস্যা হয়েছে। তখন আমার আরেক আত্মীয়কে মই আনতে বলে। মই দিয়ে বিদ্যুৎ পোলে উঠে দেখি নিউট্রালের কালো তারটা খুলে আছে। এটা লাগানোর সাথে সাথেই বিদ্যুৎ চলে আসে।”
কেন নিউট্রালের তার খুলল জানতে চাইলে উজ্জ্বল বলেন, “এটা শর্ট সার্কিটও হতে পারে আবার কেউ খুললেও হতে পারে। শর্ট সার্কিট হলে বড় ধরনের হয়েছে। কারণ তারটা একেবারে খুলে চলে এসেছে। আবার কেউ যে খুলবে সেটাও সহজ বিষয় না, খুলতে হলে আমার মতো মই নিয়ে এসে পোলে চড়ে তারপর খুলতে হবে।”
পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে সিদ্ধার্থ জানিয়েছিলেন, তারা মিটারের লাইন কেটেছিলেন। উজ্জ্বলের কাছে জানতে চাওয়া হয়, বাড়ির ভিতরে মিটারের কয়টা তার কাটা ছিল? উজ্জ্বল জানান, ভেতরে মিটারের কোনো তার কাটা ছিল না। তিনি শুধু মিটার থেকে মূল বিদ্যুৎ লাইনের খুলে যাওয়া নিউট্রাল তারটি যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “ভিতরে লাইন কাটা থাকলে তো আমাকে ভিতরের লাইনেও কাজ করতে হতো, আমার তেমন কিছু করার প্রয়োজন পড়েনি তাই আর ভিতরেও যাইনি।”
বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে স্থানীয় আরেক ইলেক্ট্রিশিয়ান সবুজের সহযোগিতা নেয় চরচা। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি নির্মাণের সময় পুরো ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করেছিলেন সবুজ। তিনি জানান, ভবনের নিরাপত্তার জন্য ভালো মানের আগুন প্রতিরোধক তার ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে কখনো এই তারে শর্ট সার্কিট হলে তা ভবনে ছড়াবে না। সেই সঙ্গে দোতলায় ফ্ল্যাটের ভেতরে আলাদা সার্কিট ব্রেকার দেওয়া ছিল। যেন কোনো ধরনের শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটলে তা ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে পারে। মূল লাইন থেকে নিউট্রাল ফেইজ আলাদা হবার বিষয়ে উজ্জ্বলের মতো সবুজও জানান একই তথ্য, তবে তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে জানান ভিতরের লাইন কাটা থাকলে তা জোড়া না দিলে মূল লাইনে নিউট্রাল ফেইজ যুক্ত করার সাথে সাথে বিদ্যুৎ চলে আসার কথা নয়। এরপর সবুজ যেহেতু ভাল জানে ওই বাড়ি বিদ্যুৎ লাইনের কোথায় কী আছে তাই তাকে দিয়েই সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধের বয়ান অনুযায়ী, তারা কোথায় মিটারের তার কেটেছিল, সেটি পরীক্ষা করান তদন্তকারী কর্মকর্তা। সবুজ মিটারের তার কাটার অংশটি খুঁজে বের করেন। বেরিয়ে আসে শর্ট সার্কিটের কারণ এবং সিদ্ধার্থ আর মুগ্ধের কথার সত্যতা। কিন্তু ওই কাটা তার সামনে এনেছে আরও বড় প্রশ্ন। কারণ, কাটার পর সেটি আবার অদক্ষ হাতে জোড়া দেওয়া; সেটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অরক্ষিত অবস্থায় রাখা, যা থেকে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ইলেক্ট্রিশিয়ান সবুজ বিষ্ময় প্রকাশ করে চরচাকে বলেন, “এত বাজে কাজ কে করেছে? তারগুলো ঠিকমতো জোড়া লাগেনি, কোনো স্কচটেপও লাগানো হয়নি।”
আরও সহজ করে বলতে গেলে, এই ধরনের হাই ভোল্টেজ লাইনের জোড়া দিতে হলে জোড়াগুলো নিখুঁত এবং শক্ত হতে হবে। তারের জোড়ায় কোনো লুজ কানেকশন থাকা যাবে না। নয়তো এই জোড়ায় স্পার্ক হয়ে আগুন ধরতে পারে। শক্ত করে তামার তার জোড়া দিয়ে তার ওপর আবার নিরাপত্তার জন্য স্কচটেপ পেঁচিয়ে দিতে হয়। ওই তারের কাটাস্থানে ভালো করে খেয়াল করে দেখা যায়, নিরাপত্তার জন্য তামার তারের সংযোগস্থলে নিরাপত্তার জন্য স্কচটেপ তো দূরের কথা দুটি কাটা তারের একটির তামার তারের সংযোগটিও দেওয়া আছে কোনোরকমে, যা যেকোনো সময় আলাদা হয়ে যেতে পারে।
ইলেক্ট্রিশিয়ান উজ্জ্বল যেহেতু ভেতরের লাইনে কোনো কাজ করেননি, তাহলে এই কাটা তার অদক্ষ হাতে জোড়া কে দিয়েছেন, তা জানা দরকার। কারণ কোনো সাধারণ মানুষ নিশ্চিতভাবে বিদ্যুতের লাইনে হাত দেবে না। চরচা যোগাযোগ করে ওই দিন ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজে যোগ দেওয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার সঙ্গে। রংপুর ফায়ার স্টেশনের ইনচার্জ আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তারা রাতে নিচতলার লোহার গেটটি কাটার কাজ শুরু করেন। কারণ, সেটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। বিদ্যুৎ না থাকলেও নিজেদের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো জ্বালিয়েই কাজ সেরে নেন। তারা ভবনের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগে জোড়া দেওয়ার কাজ করেননি, এমনকি কোনো লাইন কাটা ছিল কি না, তাও তাদের জানা ছিল না।
ওই সময় ঘটনাস্থলে আরও উপস্থিত ছিলেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের। চরচাকে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তারও কিছু জানা নেই। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ লাইনে পুলিশের কেউ হাত দেবে না।
তাহলে ঘটনাস্থলের এই কাটা তারে হাত দেবে কে? নাকি ঘটনা জানাজানির আগেও সংযোগটি পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেছে কেউ? কারণ যারা এটি করেছিলেন বলে ধারণা; অর্থাৎ, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ, তারা এলাকাতেই ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। মামলাটির বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেও সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন। তারের কাটা অংশটুকু নজরে আসেনি তারও। তাই এবার বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন তিনিও।
বিদ্যুতের সংযোগ ঘিরে যে রহস্য, তা উন্মোচনে সরাসরি কোনো অকাট্য প্রমাণ না মিললেও কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে; যা হত্যার মোটিভ নিয়ে দুই আসামির বয়ানকে উল্টো প্রশ্নের মুখে ফেলে। প্রথমত, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানের কারিগর। তিনি যে দোকানে কাজ করেন, সেখানেও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে। তাই তার এটা জানার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই ফুটেজ মুছে যায় না। তাই সিসি ক্যামেরা থেকে নিজেদের আড়াল করতে হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে ভবনে ঢোকার আগেই। আর এই সুযোগ রয়েছে অনেক বেশি। কারণ যেখানে বিদ্যুতের লাইন কাটা হয়েছে, সে জায়গাটি হলো বাড়ির নিচতলায় উন্মুক্ত। বাড়ির সীমানা প্রাচীর ডিঙিয়ে যখন-তখন এ কাজ করা সম্ভব। যদি সিদ্ধার্থের দাবিও সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয় তারপরও ওই তার কাটার জন্য বাসা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সুযোগ ছিল না। কারণ, নিচের গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল, যা ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা কেটে খোলেন। তাহলে একমাত্র উপায়, যে পথ ধরে তারা দুজন শিক্ষকের বাড়ির ছাদে গেলেন, একই পথে আবার ফিরে যাওয়ার সময় দেয়াল টপকে তার কেটে তারপর বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু দিনের আলোতে তারা এতটা ঝুঁকি নেবেন? কারণ তারা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন শুক্রবার দুপুর নাগাদ। তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, যাদের মাথায় এসেছে ফিঙ্গার প্রিন্ট মুছতে হলে মোবাইল ফোন ডিটারজেন্টযুক্ত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে, তাদের ভাবনায় কেন আসবে না সিসিক্যামেরার ডিভিআর বক্স নষ্ট না করে শুধু বিদ্যুতের লাইন কেটে নিজেদের উপস্থিতির প্রমাণ মোছা যাবে না? সেই সঙ্গে আরও লক্ষ্য করার বিষয়, তারা ওই বাড়ি থেকে লুট করেছিল শুধুই স্বর্ণ আর নগদ ১৫ হাজার টাকা।
আবার ২১ আগস্ট ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর সঙ্গে তার বান্ধবীর কথোপকথনে শুধু তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকার দাবিটি সঠিক হলে তা সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধের পূর্ব পরিকল্পিত অসৎ উদ্দেশ্য জোরালোভাবে প্রমাণ করবে। কারণ নিশ্চয় তারা দুজন শুধু ছাদে বসে ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ মাঝরাতে বিচ্ছিন্ন করবেন না।
অন্যদিকে, মিটারের কাটা তারের অদক্ষ হাতে জোড়া দেয়ার চিত্র বলছে ঘটনার পর এই সংযোগ আবারো চালু করার চেষ্টা হয়েছে। ইলেক্ট্রিশিয়ান উজ্জ্বলের ভাষ্য আমলে নিলে মূল লাইন থেকে নিউট্রাল ফেইজ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেও খুলে ফেলতে পারে। আসলে সেখানে কী হয়েছিল তার স্পষ্ট ধারণা মিলতে পারতো যদি বাড়ির উল্টো দিকের মন্দিরের সিসি ক্যামেরা সচল থাকতো, কয়েকমাস ধরে সেগুলোও নষ্ট।
তবে সব সূত্র এক কর ঘটনার আগে রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে বিচ্ছিন্ন করা হয় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ। কারণ রাত দেড়টায় প্রেমিকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে ৪০ সেকেন্ডের আলাপকালে বাসায় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি জানাননি আগামী। আবার তার কিছু সময় পর রাত ২টা ৪০ মিনিটে নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর নম্বর থেকে কল পেয়েছিলেন বোন পূজা চক্রবর্তী। ঘুমে থাকায় কলটি রিসিভ করতে পারেননি তিনি। রাত সাড়ে ১১টায় একবার কথা হবার পরও আবার গভীর রাতে বোনের মিসড কল ভাবাচ্ছে তাকে। তদন্তকারী কর্মকর্তার ধারণা সেসময় বাড়ির বিদ্যুৎ চলে যাবার বিষয়টি জানাতেই হয়তো বোনকে ফোন করেছিলেন প্রীতিলতা। একই সময়ে ওই বাড়ির পাশে মুগ্ধের বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন আসামী দুজন।
এর বাইরে সবশেষ দুই আসামির মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। বিশ্লেষণে জানা গেছে, ঘটনার আগের দিন দুপুর থেকে দুজন আটক হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে ৮০ বার ফোনে কথা বলেন, যা অস্বাভাবিক। একই এলাকায় এবং একই মোবাইল টাওয়ারের আওতায় থেকে হঠাৎ ঘটনার আগের দিন দুপুর থেকে এত যোগাযোগ সন্দেহ জাগিয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তার মনে।
তদন্তের আওতায় আছে আরও মোটিভ
এই ঘটনা তদন্তের শুরু থেকেই একাধিক মোটিভ ধরে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছেন গোয়েন্দারা। যেহেতু আসামি সিদ্ধার্থের পূর্ব পুরুষের জমি কিনে বাস করছিলেন শিক্ষক পরিবার। তাই শুরুতেই মোটিভ হিসেবে ধরা হয় জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে। ধারণা করা হচ্ছিল, শুধু স্বর্ণালংকারই নয়, খোয়া যেতে পারে বাড়ির দলিলটিও। কিন্তু পরে ক্রাইম সিন থেকেই জমির দলিল উদ্ধার করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
বেশ কিছুদিন ধরে এলাকায় গুঞ্জন ছিল, নতুন ফ্ল্যাট কিনবেন গণপতি চক্রবর্তী। তাই তার বাসায় অনেক টাকা রাখা আছে। তবে ঘটনার কাছাকাছি সময়ে মোটা টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন বা লেনদেনের কোনো তথ্য পায়নি চরচা। সবশেষ চলতি বছরের ২৯ জুন নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৪ লাখ টাকা তুলেছিলেন গণপতি। আর চলতি মাসের ৩ তারিখ সোনালী ব্যাংকের স্যালারি অ্যাকাউন্ট থেকে তোলেন ১ লাখ টাকা। সেই অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট আছে ৩ লাখ টাকার মতো। এলাকার গুঞ্জনকে আমলে নিয়ে এই সময়ে চুরির পরিকল্পনা হয়েছিল কি না তাও আছে তদন্তের আওতায়।
চুপ কেন প্রতিবেশীরা?
ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শনের সময় স্থানীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে চরচা। অধিকাংশই ‘কিছু জানেন না’ বলে এড়িয়ে যান। বাড়ির পেছনের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, শুক্রবার ভোরে প্রার্থী এবং তার মায়ের উচ্চ শব্দে চেঁচামেচি শোনেন তিনি। কিন্তু তা গুরুত্ব দেননি। কারণ প্রায় সময়ই রাতে তাদের বাসা থেকে মা-মেয়ের উচ্চস্বরে কথা বলা শব্দ পেতেন। প্রার্থী ও তার মা রাত জাগতেন আর সকালে ঘুমাতেন, এমনটা নিয়মিতই হতো। ওই প্রতিবেশীর দাবি, এই পরিবার কারো সঙ্গেই মিশত না, তাদের বাসায় কেউ যেতেন না। তাই পরবর্তী সময়ে বাসায় কোনো সাড়া-শব্দ না পাওয়ার বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেননি বাড়ির পেছনের প্রতিবেশীরা।
আবার বাড়ির সামনে ও দুপাশে আসামিদের আত্মীয়-স্বজন হওয়ায় তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য মেলে না। খোঁজ নিতে এলে প্রার্থীর প্রেমিককে বিভ্রান্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে তদন্তে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, প্রেমিককে বিভ্রান্তকারী তিন নারী কারা, সেটিও খোঁজা হচ্ছে।
এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আচরণ এবং বক্তব্য পাল্টাচ্ছেন আসামিদের স্বজনরা। বিশেষ করে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস। শুরুতে তিনি মামলার রহস্য উদঘাটনে সার্বিক সহযোগিতার কথা বললেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না তিনি।
এমন অসহযোগিতার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তেজিত হয়ে চরচাকে বলেন, “আমি কেন ডিবি অফিসে যাব? আমি কী করেছি? আমার ছেলেকে নিতে চেয়েছে, আমিই তাদের কাছে তুলে দিয়েছি। এখন আমাকে আর আমার স্ত্রীকে ডাকে কেন? আমি ডিবি অফিস চিনি না। আমি কোথাও যাব না।”
মামলা ঘিরে এত বিতর্ক কেন, যা বলছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা
চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দুই আসামি ধরা পড়লেও বিতর্ক এবং সমালোচনা পিছু ছাড়ছে না। কখনো তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বয়ানে পার্থক্য, কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত–শুরু থেকেই বিতর্কিত করছে তদন্ত প্রক্রিয়াকে।
নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছেন কি না, জানতে চাইলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী চরচাকে বলেন, “আমাদের মাঝে কোনো দুর্বলতা ছিল না। বরং আমরা এত বড় একটি ঘটনাকে স্বচ্ছতার আর আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করছি সেটিই উল্টো চাপ সৃষ্টি করেছে। আপনাদের একটি বিষয় বুঝতে হবে, আমাদের কাজ তদন্ত করে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক আসামি শনাক্ত করে তার বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই মামলাটির ক্ষেত্রে আমাদের বড় একটি অ্যাচিভমেন্টকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে শুরু থেকে। এটি এমন একটি জটিল মামলা, যার কোনো ডিজিটাল আলামত নেই। তাই আমরা যখন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বুঝলাম, এটায় ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে এগোতো হবে। কারণ যারা উইটনেস, তারা তো আর নেই। তখন আমরা আসামি ধরার কাজে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই।”
সনাতন বলেন, “আপনাকেই প্রশ্ন করি, আমরা যদি আসামি ধরতে না পারতাম, তখন আপনি আমাদের তদন্ত নিয়ে কী হেডলাইন করতেন? নিশ্চয়ই ভালো কিছু লিখতেন না। আসামি আটকের পর স্বীকারোক্তি দিয়েছে, এটিও দ্রুত জানানো হয়েছে স্বচ্ছতার খাতিরেই। কিন্তু এখন দেখছি এটাও আমাদের সমস্যা, এটা নিয়েও বিতর্ক! আসামি যা বলেছে, সত্য বলেছে কি না এটা যাচাই করাও তো তদন্তের অংশ। আবারও নিশ্চিত করতে চাই, এই তদন্তে কোনো গ্যাপ নেই। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।”