গত শুক্রবারের একটি ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম নিজ বাসায় হত্যার শিকার হন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইয়াবা আসক্ত দুই প্রতিবেশী যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরই মধ্যে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন এই দুই যুবক।
গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
এই ঘটনার দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা শুরু হয় এক আসামি এবং পুলিশ কর্মকর্তার পোশাকের মিল দেখে। শুক্রবার ঘটনাস্থলে তদন্তকাজে নিয়োজিত এক পুলিশ কর্মকর্তার গায়ে ছিল সাদা-হলুদ-নীল রংয়ের একটি চেক শার্ট, যা উপস্থিত সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। একদিন পর রোববার সকালে সংবাদ সম্মেলনের পর আসামিদের ছবি নেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হলে সেখানে দেখা যায় দুই আসামির মধ্যে একজন সেই পুলিশ কর্মকর্তার গায়ে থাকা একই ধরনের শার্ট পরা।
এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে অনেকেই তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সন্দেহ প্রকাশ করেন, এই যুবক আদৌ আসামি কি না? নাকি যেকোনো একজনকে ধরে তাকে পুলিশ কর্মকতার শার্ট পড়িয়ে তাৎক্ষনিকভাবে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে?
ঘটনাস্থলের ছবিতে ওই শার্ট পরা যে পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা যায় তিনি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়ন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। এই বিতর্ক সম্পর্কে জানতে চরচা যোগাযোগ করে তার সঙ্গে। প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয়। তিনি এখনো সেই একই শার্ট গায়ে দিয়ে আছেন, আর আসামির গায়েও প্রায় একই ধরনের শার্ট। যা এখনো অভিযুক্তের গায়েই আছে। এটি তাকে পুলিশের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়নি।”
সনাতন চক্রবর্তীর গায়ে ওই শার্ট আছে কি না জানতে চরচা তাকে ভিডিও কলে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানায়। এই পুলিশ কর্মকর্তা ভিডিও কলে এসে জানান, বিতর্কের কারণে তিনি এখনো সেই একই জামা গায়ে দিয়ে আছেন। তিনি বলেন, “এই শার্টটি কয়েক বছর আগে আড়ং থেকে কিনে দিয়েছিল আমার শ্যালিকা। এটার দাম ৮৫০ টাকার আশপাশে। বাস্তবতা হলো, আমি আমার শার্ট পরে আছি। আর আসামি তার শার্ট পরে জেলে আছে। দুইজনের শার্ট মিলে গেছে বলে ঘটনা ভিন্ন কিছু ভাবার সুযোগ নেই।”
দ্রুত আসামি শনাক্ত হল যেভাবে
অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অকাট্য প্রমাণের অভাবে আসামি ধরা পড়ে না। কূল কিনারা মেলে না তদন্তের। একসময় মামলার কার্যক্রম চলে যায় হিমঘরে। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সপরিবারে হত্যার নৃশংস ঘটনাটির তদন্তের ক্ষেত্রেও হতে পারত একই পরিণতি। কারণ, এই ঘটনায় অপরাধী শনাক্তে কোনো ডিজিটাল আলামত মেলেনি। নিহত শিক্ষকের বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। নিহতদের এবং গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির মোবাইল ফোনগুলো থেকেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একমাত্র প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত হন দুই অপরাধী।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী চরচাকে জানান, গত শুক্রবার সকালে ঘটনাটি ঘটলেও সন্ধ্যার মধ্যেই অপরাধী সিদ্ধার্থ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। পরে সিদ্ধার্থের দেওয়া তথ্যে অপর আসামি মুগ্ধকে আটক করা হয়। উদ্ধার হয় তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে পুঁতে রাখা স্বর্ণালংকার।
এই ঘটনায় আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে। তা হলো, দুই মাদকাসক্ত যুবক কেন এমন পথ বেছে নিলেন? প্রশ্ন উঠেছে, একজনকে হত্যার পর তারা পালিয়ে না গিয়ে কেন অন্যদের হত্যা করল?
পুলিশের দাবি, দুই যুবকের জবানবন্দি বলছে, পরিচয় শনাক্ত হবার ভয় এবং লুটপাটের জন্য তারা হত্যা করেছে। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই ঘটনার পেছনে থাকতে পারে পূর্ব বিরোধের মতো কোনো বিষয়, যা ধারাবাহিক তদন্তে জানা যাবে।
পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এ দিন সকালে শিক্ষকের বাসার ছাদে বসে ৯ পিস ইয়াবা সেবন করে। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে পরিচয় জানাজানির ভয়ে তারা শিক্ষকের কাঁধে থাকা গামছা গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করে। নির্মাণাধীন ছাদে রাখা টিন দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ আড়াল করতে গেলে সেই শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা উপরে উঠে এলে তাকেও হত্যা করা হয়।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “আমাদের মনে হয়নি, শুধু ইয়াবা খাওয়ার জন্যই এ ঘটনা ঘটেছে। অথবা লুটপাটের উদ্দেশ্য ছিল। এর পেছনে আরও বড় কোনো কারণ থাকতে পারে। যেমন-পূর্ব বিরোধ। ধারাবাহিক তদন্তে সবই উঠে আসবে।”
মায়ের চিৎকারে মেয়ে আগামী চক্রবর্তীও ছুটে এলে তার সঙ্গেও ধস্তাধস্তিতে জড়ায় দুই অপরাধী। এ সময় আগামীর নখের আচড়ে সিদ্ধার্থের শরীরে জখম হয়। এই আলামত পরবর্তীতে সিদ্ধার্থের আটকে ভূমিকা রাখে। তিনজনকে হত্যার পর অপরাধী দুজন বাসায় গিয়ে লুটপাটের চেষ্টা চালালে ঘুমিয়ে থাকা ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম জেগে যায়। সে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়।
আলোচিত এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই অপরাধী গতকাল রোববার রাতে আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সন্ধ্যা ৬টা শুরু হয়ে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ ঘণ্টায় আদালতের কাছে ঘটনা বর্ণনা করেন তারা। স্বচ্ছ তদন্তে এই ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ দ্রুত উদঘাটন হবে আশা সবার।