নিরাপত্তা প্রশ্নে বাংলাদেশ আবারও সিএনজিচালিত অটোরিকশা মডেলে ঢুকেছে। যাত্রীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা ঢাকতে যাত্রীকেই খাঁচায় ভরা হয়েছিল যে মডেলে, তা এখনো অক্ষুণ্ন। সেই অটোরিকশা মডেলই কাজ করছে বাংলাদেশের সর্বত্র–এবার সেটা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের দাবিদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই হোক, আর সড়ক পরিবহনই হোক।
বলছি নারীর কথা। সম্প্রতি দেশের বেশ তিন শহরের কয়েকটি রুটে ১৪টি বাস নামানো হয়েছে। গোলাপী রঙের সেই বাসগুলো সাধারণ্যে, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিংক বাস হিসেবে এরই মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে বাসগুলো নিয়ে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে–পথচলতি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতেই এই বিশেষ বাসের ব্যবস্থা।
আর ‘অবরোধবাসিনী’…। রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের লেখা ‘অবরোধবাসিনী’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩১ সালে। অবরুদ্ধ নারী সমাজের কথা, তাদের ওপর চলা পীড়নের কথা, নারী মুক্তির কথা তো বটেই সে সময়ের সমাজের নানা সংস্কার ও নারীর ওপর চলা কাঠামোবদ্ধ পীড়নের কথা সেই প্রবন্ধের বইয়ে লিখেছিলেন রোকেয়া। এর প্রায় শত বছর পর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা ঠিক একই শিরোনামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়েছেন শুধু এ কথার জানান দিতেই যে, উচ্চশিক্ষার্থে আসা নারী শিক্ষার্থীরা কাঠামোবদ্ধ বৈষম্যের শিকার।
একটু খুলে বলা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি নারী হলের শিক্ষার্থীরা একটি অদ্ভূত নিয়মের বেড়ীতে আটকা পড়ে আছেন। সান্ধ্য আইন নামে পরিচিতি পাওয়া বিধিটির বলে নারী হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য রাত ১০টার পর তাদের হলগেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত এই গেট খোলা বারণ। কেউ অসুস্থ হলেও গেট খুলে চিকিৎসকের শরণ নিতে পারেন না। অপেক্ষা করতে হয় ভোর হওয়া পর্যন্ত। এই পুরো সময়ে গেট দিয়ে হলে প্রবেশ যেমন, তেমনি বের হওয়াও বারণ। লেট খাতা বলে একটি খাতা আছে বটে। তবে তাতে নাম ওঠা নারী শিক্ষার্থীদের ‘চরিত্রহীন’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, হলগুলোর অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংযুক্ত হলে প্রবেশ করতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের নারী স্বজনরাও আসতে পারেন না হলে। এমনকি এক হলের শিক্ষার্থীদের অন্য হলে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়াও বারণ। এক রকম কারফিউ বলা চলে এটাকে। অথচ, রাষ্ট্রে কোনো জরুরি অবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রেও অজুহাতের নাম–নিরাপত্তা।
নারী বাস হোক বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হল হোক–নারীর নিরাপত্তার নামেই তাকে আলাদা করা হচ্ছে, তার জন্য আলাদা বিধি ও ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এ যেন সেই প্রাণপ্রিয় তোতা–যা কিনা কারও প্রিয় বলেই বন্দী!
সমাজের নানা স্তরে নারীর প্রতি ঘৃণামিশ্রিত বয়ান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীকে আক্রমণের একমাত্র পন্থা হিসেবে ‘স্লাটশেমিং’ কিংবা ধর্ষণ বা হামলা ও হুমকির মতো ফৌজদারি অপরাধের হাজারটা উদাহরণ দেওয়া যাবে। দেশে প্রতিদিন কত নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে–সে পরিসংখ্যান একটু ঘাটলেই পাওয়া যাবে। আর এই হামলা, পীড়ন বা হুমকির মতো ঘটনাগুলো ঘটছে পুরুষের দিক থেকেই। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হিসেবে নারীর যেমন কোনো বয়স নেই, তেমনি আক্রমণকারী হিসেবে পুরুষও বয়সনিরপেক্ষ। এমনকি ছেলে শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পুরুষ পর্যন্ত রয়েছে নিপীড়কের তালিকায়। আর শিকারের তালিকায় কোন বয়সী নারী নেই! ছয় মাস থেকে ৭০ বছর বয়সী–যে কেউ থাকছে ভুক্তভোগীর তালিকায়।
এই যখন দশা, তখন নিরাপত্তার নামে পিংক বাস চালু বা হলগেট খোলা বা বন্ধের বিষয়ে আর কী বলবার থাকে! অথচ, নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এই বেড়ীকেই, এই পৃথকীকরণকেই দাওয়াই হিসেবে হাজির করছে। পিংক বাসের প্রসঙ্গটি এমনিতে বেশ সু-উদ্যোগ বলেই মনে হওয়ার কথা। একটি বাসের চালক থেকে শুরু করে কনডাক্টর, বা চালকের সহকারী এবং অতি অবশ্যই যাত্রী হিসেবে শুধু নারীরা থাকবেন–এটুকুতে কোনো সমস্যা নেই বলেই মনে হওয়ার কথা। বিশেষত যখন বাসচালক, হেলপারের মতো পেশায় নারী যুক্ত হচ্ছে–তখন তো এটা এক ধরনের ক্ষমতায়নও! কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন নারী বাসচালককে শুধু নারী যাত্রীদের জন্য চলাচলকারী বাসের চালক হিসেবেই যোগ্য মনে করা হয়।
এ ক্ষেত্রে সংকট দুটি–এক, নারীদের জন্য চলাচলকারী বাসের চালক হিসেবে নারীকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তাদের যোগ্যতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় তরফ থেকেই একটি প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছে। কীভাবে? প্রশ্নটি উল্টে করা যেতে পারে, বিশেষায়িত বাস সার্ভিসের স্টিয়ারিং হুইলটি ধরবার আগে নারী চালকের হাত দুটি কেন সাধারণ কোনো বাসের স্টিয়ারিং ধরবার সুযোগ পেল না? দ্বিতীয় এ প্রশ্নেই রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিগত উত্তরটি লুকিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে হওয়া বিভিন্ন ট্রল এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কয়েকটিতে নারী বাসচালকের যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে করা বিভিন্ন কনটেন্ট বলছে, এই যোগ্যতার প্রশ্নটি কতটা প্রকট। এই প্রশ্ন যদি আমলে নেওয়া হয় (যেমনটা অনেকে নিচ্ছেনও এবং সামাজিক মাধ্যমে সে অনুযায়ী পোস্টও দিচ্ছেন), তাহলে প্রশ্ন আসে চালক হিসেবে অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে নারীদের জন্য ডেডিকেটেড বাসটির স্টিয়ারিং হুইল কেন ছাড়া হলো? নারীদের জীবনের কম মূল্যবান বলে? কেন তাদের অন্য বাসের স্টিয়ারিং ধরতে দেওয়া হলো না? প্রশ্নগুলো নিছক কুতর্কের উদ্দেশ্যে তোলা নয়। দুই, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সমাজে বিদ্যমান নারী ও পুরুষের মধ্যকার দূরত্বটি কি আরও বাড়ল। কারণ, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বলে দেওয়া হলো যে, নারী ও পুরুষ সহাবস্থান ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এমনকি তারা একই বাসে করে যাতায়াত করতেও আর পারছে না। এটি শুধু নারীকেই কাঠামোগত বেড়ী পরালো না, বরং পুরুষদের চরিত্র নিয়েও মোটাদাগে প্রশ্ন তুলে দিল।
সমাজের একটি অংশ প্রতিনিয়ত যেভাবে নারীকে আরও ঘরবন্দী করে তার পোশাক ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তাকেই এক রকম স্বীকার করে নেওয়া হলো পিংক বাসের ধারণা ও তার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। এখানে নারী বাসের রং হিসেবে পিংক বাছাই এবং এর রাজনীতি এবং গত শতকের ৬০–৮০ দশকের মধ্যকার পুঁজিকাঠামো এবং পণ্যায়ন–এমন অনেক কথাই আনা যায়, কিন্তু তা আলোচনাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। ফলে সেটি এড়িয়ে যাওয়া গেল আপাতত। যার খুশি একটু খুঁজে দেখলেই হবে। মোটাদাগে এই রঙের ব্যবহার, নারীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা আদতে রাষ্ট্রের তরফ থেকে পরোক্ষ দুই বিবৃতি হিসেবে পাঠ করার সুযোগ আছে–এক, সমাজে নারী ও পুরুষ সহাবস্থান সম্ভব নয়; এবং দুই, নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্র হাত ধুয়ে নিয়েছে। রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে একটা দায়মুক্তির পথে হাঁটছে, ঠিক যেমনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন হাঁটছে আজ বহু বছর।
রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’ তাই এখনো ভীষণভাবে বাস্তব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সেই বাস্তবতা দেখতে পেয়েছেন বলেই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তার প্রতিবাদ করছেন। তারা নিজেদের ক্যাম্পাসে নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন; নিরাপত্তার নামে দেয়ালঘেরা দাওয়াই ও হলগেটের তালা নামক কটাক্ষটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই বাস্তবতা পাল্টে দেওয়ার আওয়াজ তুলেছেন। তারা ক্যাম্পাসের প্রশাসনকে বলছেন–আর দশটা শিক্ষার্থীর মতো তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রশাসনকেই নিতে হবে। তাদের সঙ্গে এখনো ক্যাম্পাসের পুরুষ শিক্ষার্থীরা সেভাবে ঘোষণা দিয়ে একাত্ম হননি বা তেমন কোনো প্রবণতা দেখা যায়নি। এর কারণ সম্ভবত স্বেচ্ছা অন্ধত্ব। কার? ক্যাম্পাসের পুরুষ শিক্ষার্থী, কর্মচারী, কর্মকর্তা, নির্বিশেষে সব শিক্ষকেরও। কারণ, তারা হয়তো দেখছেন না যে, প্রশাসন আসলে কাদের কারণে নারী শিক্ষার্থীদের রাত ১০টার পর হলের বাইরে থাকা অনিরাপদ মনে করছে? পুরুষই তো? মানে সে নিজে। এ আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে না পারা শিক্ষার্থীসহ সব পুরুষ আসলে প্রকারান্তরে নিজেকে হেনস্তাকারী বা আক্রমণকারীর ভূমিকাতেই মেনে নিচ্ছে। এটাকেও কি কুতর্ক বলা যাবে?
এ আন্দোলন কতটা সফল হবে, সে অন্য আলোচনা। কিন্তু এ আন্দোলন এবং পিংক বাস বাস্তবতা সমাজের ও রাষ্ট্রের এক গভীর ক্ষতের দিকেই নজর টানছে–আর তা হলো–অপরায়ণ, যা সামাজিক মাধ্যমের ইকো চেম্বারে বসে যেমন, তেমনি চলতি পথের নানা আচরণের মধ্য দিয়ে ঘটছে প্রতিনিয়ত। এই অপরায়ণে রাষ্ট্র নিযুক্ত হচ্ছে নানাভাবে, নানা বিধি ও ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে, যা তার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ব্যর্থতাই মেনে নেওয়ার শামিল। আর এর ব্যর্থতা থেকে সে বরাবরের মতোই সিএনজি থিওরি সামনে এনেছে, যার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। যাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তাকেই খাঁচায় পুরে ফেললে বরং ল্যাঠা চুকে যায়। রাষ্ট্র এই ল্যাঠা চোকানোর পথে হাঁটছে। নাগরিকের সামনে প্রশ্নটি গুরুতর, করের টাকায় পোষা রাষ্ট্র কাঠামোকে তারা এমন নিষ্কৃতি দেবে কি? নাকি নিজেদের কথাটা আরও জোরালোভাবে বলবে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা