১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করেছিল।
সেই ঘটনার সাত দশকেরও বেশি সময় পর আবারও মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি।
ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, ইরান খুব শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এই সংঘাতের প্রভাব পুরো অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়ে। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়।
লেবাননেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ইসরায়েল দাবি করে, তারা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে।
ইয়েমেনেও এর প্রভাব পড়ে। সেখানে ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শান্তি চুক্তির পথে অগ্রগতিও থেমে যায়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ দুই দেশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের নতুন অধ্যায়।
তাদের সম্পর্কের ইতিহাসে রয়েছে অভ্যুত্থান, গোপন অভিযান, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক সমাধানের একাধিক ব্যর্থ চেষ্টা।
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের পতন ঘটে। এরপর থেকে ওয়াশিংটন বিভিন্ন সময়ে তেহরানের সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।
তবে ইরানই একমাত্র উদাহরণ নয়। গুয়াতেমালা, কিউবা, চিলি ও ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র এমন সব সরকারের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছে, যেগুলোকে ওয়াশিংটন নিজেদের স্বার্থবিরোধী মনে করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এসব প্রচেষ্টার ফল কী হয়েছে? আর ইরানের ক্ষেত্রে এসব ঘটনা থেকে ওয়াশিংটনের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে?
১৯৫৩ সালে যেভাবে শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র
১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ব্রিটেনের সঙ্গে মিলে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে কাজ করে।
এর আগে মোসাদ্দেক অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করেছিলেন। পশ্চিমা শক্তিগুলো মনে করেছিল, এই সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে। মোসাদ্দেক ১৯৫১ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
ইরানের শেষ শাহ প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৪১ সালে।
সে সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরানে প্রবেশ করার পর তার বাবা রেজা শাহকে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশের শাসনভার নেন।
মিত্রশক্তিগুলো তখন রেজা শাহের নাৎসি জার্মানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সে সময় জার্মানি ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
একই সঙ্গে নিজেদের যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করতে ইরানের স্থলপথ ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়েও আগ্রহী ছিল মিত্রশক্তি।
১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রায় ২৫ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির নেতৃত্বাধীন ইরান ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র শাহকে সমর্থন করার পাশাপাশি ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতেও সহযোগিতা করে।
১৯৫৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ উদ্যোগের আওতায় দুই দেশ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করে। এর এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি পারমাণবিক চুল্লি ও ইউরেনিয়াম সরবরাহ করে।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ক্ষমতার পরিবর্তন যেভাবে উল্টো ফল দিল
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শাহের শাসন আরও কঠোর হয়ে ওঠে। এতে তার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
১৯৭৯ সালে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শাহ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। একসময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষে।
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করে। তারা ৪৪৪ দিন জিম্মি ছিলেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে সমর্থন দেয়। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সংঘাতও হয়।
বোডোইন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সালার মোহান্দেসির মতে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে খোমেনি যে বিপুল মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন, তার অন্যতম কারণ ছিল শাহকে তিনি সফলভাবে ‘যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল’ হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
একই সঙ্গে তিনি মানুষের মর্যাদা, নিজস্ব পরিচয়, স্বাধীনতা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
মোহান্দেসি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান যুদ্ধকে সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করছে। তাদের দাবি, সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ থেকে ইরানকে রক্ষা করতে তারা সফল হয়েছে—যা আধুনিক ইরানের অন্য কোনো সরকার পারেনি।
এর ফলে দেশের ভেতরে সরকারের প্রতি এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
পরবর্তী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম এবং গাজায় হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
পরমাণু চুক্তি থেকে নতুন সংঘাত
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অশুভ অক্ষের’ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে এর আগে তালেবান ও আল-কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সহযোগিতা হয়েছিল।
এরপর কয়েক বছর ধরে দুই দেশের উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
তবে বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। দুই দেশের মধ্যে আবার কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বা জেসিপিওএ চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনসহ বিশ্বের কয়েকটি বড় অর্থনীতি এতে যুক্ত ছিল।
চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ছিল।
তবে চুক্তিটি বেশিদিন টেকেনি।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন এবং ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
এর এক বছর পর ইরান চুক্তিতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে। পরে দেশটি আনুমানিক ৪৪০ কেজি বা ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করে।
আলোচনার মাঝেই নতুন যুদ্ধ
২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে নতুন করে পারমাণবিক আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেন।
ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। তবে ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর পর সেই আলোচনা ভেঙে যায়। পরে এই সংঘাত ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়। দেশটি ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
আবারও ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা?
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলা শুরু করে। এবারও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলার সময়ই হামলা শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল তেহরানের সরকার পরিবর্তন। তিনি বিষয়টিকে ইরানের জনগণের ‘স্বাধীনতা’ হিসেবে তুলে ধরেন।
যুদ্ধ শুরুর দিন ট্রাম্প বলেন, “আমরা কাজ শেষ করার পর আপনারা নিজেদের সরকার নিয়ে নিন। সরকার আপনাদেরই হবে।”
তবে সেই লক্ষ্য সফল হয়নি।
শুরুর হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হলেও দ্রুতই তাদের জায়গায় অন্য ধর্মীয় নেতারা দায়িত্ব নেন। নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনি। তেহরানের সরকারও টিকে আছে।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বরং এই পরিস্থিতিতে দেশের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পাল্টা হামলায় পুরো অঞ্চলজুড়েও বহু মানুষ নিহত হয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করার কথা অস্বীকার করেন। জুনে তিনি বলেন, “আমি কখনো সরকার পরিবর্তন নিয়ে আগ্রহী ছিলাম না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বছরের পর বছর সরকার পরিবর্তনের ঘটনা দেখেছি; এগুলো কখনোই কাজ করে না।”
মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে কোথায় কোথায় হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র?
ইরানের বাইরে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের বিভিন্ন দেশেও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণে বড় ধরনের মানবিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইরাক
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাকে হামলা চালিয়ে দেশটি দখল করে। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরানো।
তখন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, সাদ্দামের কাছে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম অস্ত্র বা ডব্লিউএমডি রয়েছে। তবে পরে বিভিন্ন অনুসন্ধানে ইরাকে এমন কোনো অস্ত্রের মজুত পাওয়া যায়নি।
সাদ্দাম শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হন। মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বাগদাদে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় সরাসরি প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন।
আফগানিস্তান
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়। এরপর ২০ বছর ধরে দেশটিতে বেসামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখে যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু ২০২১ সালে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পরপরই তালেবান আবার দ্রুত ক্ষমতা দখল করে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের যুদ্ধ এবং পাকিস্তানে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘাতে সরাসরি আনুমানিক ২ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
লিবিয়া
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন।
শুরুতে গাদ্দাফির অনুগত বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পরে ওই বছরের মার্চে অভিযানের নেতৃত্ব ন্যাটোর হাতে তুলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে নজরদারি ও সশস্ত্র ড্রোনসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখে ওয়াশিংটন।
গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর লিবিয়া রাজনৈতিক বিভাজন, একাধিক সরকার এবং ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।
২০২০ সালে জাতিসংঘের সমর্থনে যুদ্ধবিরতি হলেও দেশটি এখনো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকেন্দ্রের মধ্যে বিভক্ত।
বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাস
১৯৪৫ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলা স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন নির্বাচিত বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে সমর্থন বা সহযোগিতা করেছিল।
এর অন্যতম কারণ ছিল এসব দেশে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা।
গুয়াতেমালা
১৯৫৪ সালে সিআইএ গুয়াতেমালার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হাকোবো আরবেনজকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তা করে।
এরপর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চলে।
কিউবা
কিউবায় ক্ষমতাসীন নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে সরাতে সিআইএ কিউবান নির্বাসিতদের প্রশিক্ষণ দেয়। তাদের দিয়ে কিউবায় হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
১৯৬১ সালের ‘বে অব পিগস’ অভিযান অবশ্য ব্যর্থ হয়। কিউবার বাহিনী হামলাকারীদের পরাজিত করে।
চিলি
চিলিতেও সিআইএ নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রচেষ্টায় অর্থায়ন করেছিল।
১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ক্ষমতায় আসেন। তিনি ১৭ বছর দেশ শাসন করেন।
পিনোশের শাসনামলে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। আরও কয়েক হাজার মানুষ নির্যাতন বা কারাবন্দি হন। জোর করে নিখোঁজ করার ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিখোঁজ হন। এ ছাড়া অন্তত ২ লাখ চিলিয়ানকে দেশ ছাড়তে হয়।
পানামা ও গ্রেনাডা
১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র গ্রেনাডায় এবং ১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক অভিযান চালায়। এসব অভিযানে ওয়াশিংটনের বিরোধিতার মুখে থাকা সরকারগুলোকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়।
ভেনেজুয়েলা
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে একটি মার্কিন সামরিক অভিযানে অপহরণ করা হয়।
ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা চরমে পৌঁছানোর পর এই ঘটনা ঘটে।
এরপর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি দেশটির নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করেছেন। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে।
মাদুরোকে অপহরণের পর ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র ও অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছে?
কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র বারবার দেশটির তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পর কী ঘটবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
ক্রিগ বলেন, “১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহকে ক্ষমতায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে রাজতন্ত্রের সঙ্গে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের সম্পর্ক স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।”
তার মতে, শাহের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কারণে ইরানের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা শুধু একটি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে থাকেনি। বরং ১৯৭৯ সালে শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিপ্লবী জোটের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
ক্রিগের ভাষায়, “সেই অর্থে ১৯৫৩ সালের অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে সফল হয়েছিল, কিন্তু ইতিহাসের বিচারে ব্যর্থ হয়েছিল।”
ইরাকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিচ্ছাকৃত ফল দেখা গেছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ইরাকে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়, যার সুযোগ নিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি ২০০৩ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাবের বড় একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
ক্রিগের মতে, গত ৭০ বছরের ইতিহাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মূল শিক্ষা হওয়া উচিত—
ধৈর্য।
তিনি মনে করেন, নির্দিষ্ট কোনো ইরানি সক্ষমতা দুর্বল করা এবং ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে দেওয়ার চেষ্টা—এই দুটি বিষয়কে যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা করে দেখা উচিত।
একটি সরকার সরানো সহজ, এরপর কী হবে?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাভেজির মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফল বহুবার ভয়াবহ হয়েছে।
তিনি বলেন, “১৯৫৩ সালে ইরানে অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ ও হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ইতিহাস বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভরা।”
তার মতে, ইরানে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করেছিল, কর্তৃত্ববাদী শাসনকে আরও শক্তিশালী করেছিল এবং গভীর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
এই মনোভাব এখনো দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে বলে তিনি মনে করেন।
মোর্তাভেজির মতে, পুরো অঞ্চলজুড়ে সরকার সরিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের মতো করে বদলে দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চেষ্টা দেশগুলোকে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
এর ফলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা ওয়াশিংটন আগে ভাবেনি বা পরে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
তার ভাষায়, “মূল শিক্ষা পরিষ্কার একটি সরকারকে ধ্বংস করা যতটা সহজ, এরপর কী হবে তা নিয়ন্ত্রণ করা ততটাই কঠিন।”
তার মতে, ওয়াশিংটন বারবার সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এবং সরকার সরানোকে বিজয়ের সঙ্গে এক করে দেখেছে।
বদলেছে কি মার্কিন জনগণের মনোভাব?
অন্যদিকে বোডোইন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সালার মোহান্দেসি বলেন, অতীতের সামরিক ব্যর্থতার পরও বিদেশে হস্তক্ষেপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান খুব একটা বদলায়নি।
তবে এসব যুদ্ধে সাধারণ মানুষের সমর্থন কমেছে।
মোহান্দেসি বলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ যখন বাড়ানো হয়েছিল, তখন ৬০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক যুদ্ধকে সমর্থন করতেন। একই সময়ে প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করতেন, সরকার সঠিক কাজ করবে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন ব্যাপকভাবে কমেছে বলে জানান তিনি।
মোহান্দেসির মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অজনপ্রিয় যুদ্ধ।
তার মতে, শুধু ডেমোক্র্যাট বা স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যেই নয়, রিপাবলিকান ভোটারদের একটি বড় অংশও বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
জনগণের সমর্থন কমে যাওয়ায় ওয়াশিংটনকে সামরিক হস্তক্ষেপের খরচ যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।
ঋণ, মূল্যস্ফীতি, সেনা হতাহত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের মতো বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সামরিক অভিযান থেকে সরে আসার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।
গত সাত দশকের ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে। একটি সরকারকে সরিয়ে দেওয়া আর একটি দেশকে স্থিতিশীল করা এক বিষয় নয়।
১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু ২৬ বছর পর সেই শাহের বিরুদ্ধেই বিপ্লব ঘটে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষে পরিণত হয়।
ইরাকে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হন, কিন্তু তার পরের রাজনৈতিক বাস্তবতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়।
আফগানিস্তানে তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল, কিন্তু দুই দশক পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।
লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পরও দেশটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিভাজন থেকে বের হতে পারেনি।
তাই ইতিহাসের প্রশ্নটি হয়তো এখন আর শুধু “যুক্তরাষ্ট্র সরকার পরিবর্তন করতে পারবে কি না?”এটি নয়।
বরং বড় প্রশ্ন হলো একটি সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেটি কে পূরণ করবে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওয়াশিংটন কি এবার ইতিহাসের পুরোনো ভুল থেকে সত্যিই শিক্ষা নেবে?