ইরান যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের ফলে মার্কিন মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নতুন কোনো বিষয় নয়। এই পরিস্থিতি মূলত একটি পূর্ব বিদ্যমান সংকটকে কেবল উন্মোচিত ও ত্বরান্বিত করেছে।
লন্ডনের দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ডিফেন্স অ্যান্ড ফরেন পলিসি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ক্যাথরিন থম্পসন লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাস্ত্রের গুরুতর ঘাটতি এবং সামরিক বাহিনীর ওপর এর প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত ইরান যুদ্ধের বহু আগেই দৃশ্যমান ছিল। ২০১৮ সাল থেকে মার্কিন কৌশলগত নীতিতে আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে আমেরিকার অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা হয়েছে।
বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সঙ্গে সংঘাত প্রতিরোধের সম্পদ চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হলেও ওয়াশিংটনের উভয় রাজনৈতিক দলের নেতারা অগ্রাধিকার নির্ধারণের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর দেশটিকে সহায়তা করতে গিয়ে মার্কিন অস্ত্রাগার থেকে প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের উচ্চমানের যুদ্ধাস্ত্র কিয়েভের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত সেই মজুত পূরণ করতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্র নিজের বিকল্পগুলোকে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
পূর্বে মার্কিন কংগ্রেস নিজেদের বৈশ্বিক প্রস্তুতির স্বার্থে বিদেশি অংশীদারদের কাছে মজুত থেকে অস্ত্র স্থানান্তর সুরক্ষিত রাখলেও, পরবর্তীতে এমন সিদ্ধান্তের ফলে সম্ভাব্য পরিণতির ওপর কোনো গভীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যে ঘাটতিতে থাকা অস্ত্রাগারের ওপর নতুন করে চরম চাপ সৃষ্টি করে এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন থাড ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘপাল্লার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহও ৫০ শতাংশ কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন কংগ্রেসের কাছে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট এবং কেবল ইরান যুদ্ধের খরচ মেটাতে অতিরিক্ত ৭৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পূরক বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছে। এর একটি বড় অংশ যুদ্ধাস্ত্র তহবিলের জন্য নির্ধারিত। তবে কেবল অর্থ বরাদ্দ বা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে অর্ডারের সময়সীমা কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। ক্যাপিটল হিল থেকে এই বাজেট পাস হলেও চরম গুরুত্বপূর্ণ এসব যুদ্ধাস্ত্র ফের পূরণ করে ইরান যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বহু বছর লেগে যাবে। ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণে এই ধারণা গভীরভাবে প্রবেশ করেছে যে বিপুল অর্থ, অতিরিক্ত অস্ত্র ও সময় সর্বদাই তাদের হাতে থাকবে। আর এই ভুল আত্মবিশ্বাসের ফলেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চাপে থাকা ও সীমিত সম্পদ পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সংঘাত আরও বাড়ানোর পথ খোলা রেখেছেন।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিরক্ষা বাজেট এবং ইরানের জন্য সম্পূরক অর্থায়ন বিল অনুমোদনের যে চাপ সরকারের ওপর সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে শুধু বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করলেই এই কাঠামোগত ও কৌশলগত সমস্যার সমাধান হবে না। মৌলিক বিষয়টি হলো আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষার জন্য অতিরিক্ত মাত্রায় নিজেদের যুক্ত করে ফেলেছে। কিন্তু তারা কার্যত একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে একই সঙ্গে তাদের সামরিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম নয়।
ভবিষ্যতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা না রেখে বিপুল অর্থ এবং উচ্চ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে পরবর্তীতে আবার একই ধরনের যুদ্ধাস্ত্র সংকটের জন্ম হবে। কংগ্রেসের হাতে বাজেটের একক ক্ষমতা থাকায়, কেবল তারাই সামরিক সম্পদের ক্ষেত্রে কার্যকর পাহারা নির্ধারণ করতে পারে। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ক্যাথরিন থম্পসনের মতে, কংগ্রেসের উচিত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনো প্রতিরক্ষা বাজেট বা সম্পূরক তহবিল অনুমোদন না করা। নীতি নির্ধারকরা আর এই কঠিন সিদ্ধান্তের সময় পিছিয়ে দিতে পারেন না। কাগজে-কলমে এই ঘাটতিকে একটি গাণিতিক হিসাব মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি গভীর কৌশলগত সমস্যা, এবং কৌশলগত সীমারেখা স্বীকার না করলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।