ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি-আমেরিকানদের মালিকানাধীন সম্পত্তি দখল না করতে কট্টরপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সতর্ক করেছেন দেশটিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। তিনি এ ধরনের আচরণকে ‘ঈশ্বরের আইনের লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক এবং দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের সমর্থক হাকাবি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামের বাড়িগুলো অবরোধে অংশ নেওয়া কোনো বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। বাড়িগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লুই রিদির বাড়িও রয়েছে।
অধিকারকর্মী সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তি মালিকানাধীন ফিলিস্তিনি জমি দখলের চেষ্টায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ৯ আগস্ট কুসরায় কয়েকটি বাড়ি ঘিরে ফেলা শুরু করে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ওই এলাকায় কয়েক ডজন সেনা মোতায়েন করেছে এবং পরে বসতি স্থাপনকারীদের বাড়িগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবে তারা এখনো কাছাকাছি অবস্থান করছে। রিদিসহ স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, সেনারা সরে গেলে বসতি স্থাপনকারীরা আবার তাদের সম্পত্তিতে ঢুকে পড়তে পারে।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি-আমেরিকানদের মালিকানাধীন বাড়ি বা জমি দখলের কথা যারা ভাবছেন, তাদের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বার্তা কী—জানতে চাইলে হাকাবি ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দেন। গত সপ্তাহে তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের “ইসরায়েলি সন্ত্রাসী” বলেও নিন্দা করেছিলেন।
জেরুজালেমে রয়টার্সকে হাকাবি বলেন, “আমি মনে করি, এই বার্তাটি শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মৌলিক শিষ্টাচার ও সভ্য আচরণের বার্তা।”
তিনি আরও বলেন, “যা আপনার নয়, তা আপনি নেবেন না।”
‘তুমি চুরি করবে না’—বসতিস্থাপনকারীদের হাকাবি
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের হিসাবে পশ্চিম তীরে দশ হাজার ফিলিস্তিনি-আমেরিকান বসবাস করে। তাদের অনেকেই রামাল্লা ও নাবলুসের মধ্যবর্তী কয়েকটি গ্রামের এলাকায় থাকেন, যেখানে কুসরা অবস্থিত।
বৃহস্পতিবার কুসরার নিজের বাড়ি থেকে রয়টার্সকে রিদি বলেন, জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হাকাবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। তবে তার বাড়ির আশপাশে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হয়রানি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
দশ আজ্ঞার উদ্ধৃতি দিয়ে হাকাবি বলেন, “তুমি চুরি করবে না” এবং অন্যের জিনিস নেওয়া বা তার প্রতি “লোভ” করা—অর্থাৎ তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করাও উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর হাকাবি বলেন, “কেউ যদি জমির মালিক হন এবং সেই জমিতে তার নিজের বাড়ি থাকে, তাহলে অন্য কেউ এসে সেটি দখল করে পরিবারটিকে ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলে তা শুধু মানুষের আইনের লঙ্ঘন নয়, ঈশ্বরের আইনেরও লঙ্ঘন।”
ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাকাবিই প্রথম ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান [যুক্তরাষ্ট্রে ইভানজেলিক্যাল বলতে বোঝায় প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের একটি বিস্তৃত গোষ্ঠী, যারা যিশুখ্রিষ্টের বার্তা প্রচার, বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যা এবং রূপান্তরের ওপর জোর দেয়]। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের সমর্থক। তিনি ওই ভূখণ্ডকে এর বাইবেলীয় নাম “জুডিয়া ও সামারিয়া” বলে উল্লেখ করেন। ইসরায়েল সরকারও এই নাম ব্যবহার করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সাধারণত এ নাম ব্যবহার করে না।
সাধারণভাবে ইসরায়েলি বসতিগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে হাকাবি বলেন, সহিংসতায় জড়িত বসতিস্থাপনকারীরা একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং তারা বৃহত্তর বসতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে না। তার ভাষায়, অধিকাংশ মানুষ “শুধু জুডিয়া ও সামারিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে এবং নিরাপত্তার সঙ্গে নিজেদের পরিবার গড়ে তুলতে চায়।”
ফিলিস্তিনি ও তাদের সমর্থকেরা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, এসব বসতি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত ভূখণ্ড দখল করে নিচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং অধিকাংশ দেশ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ মনে করে। ইসরায়েল অবশ্য এ অবস্থানের বিরোধিতা করে।
হাকাবি বলেন, কুসরায় যা ঘটেছে তাতে যুক্তরাষ্ট্র “হতবাক ও ক্ষুব্ধ”। ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো “ক্ষমার অযোগ্য ও ঘৃণ্য” অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং এতে জড়িত বসতিস্থাপনকারীদের ইসরায়েলের ভেতরে উল্লেখযোগ্য শাস্তির মুখোমুখি হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হাকাবি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও থাকতে পারে। তবে তিনি জানান, এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে কি না, সে সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
ফিলিস্তিনি বাড়িগুলো অবরোধে জড়িত থাকার অভিযোগে কোনো বসতিস্থাপনকারীকে গ্রেপ্তার বা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কথা ইসরায়েলি পুলিশ এখনো জানায়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এ ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে একজন শীর্ষস্থানীয় বসতি নেতা বসতিস্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন।