আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন দুটি দেশের মধ্যকার মুখোমুখি সংঘাত কেবল সেই নির্দিষ্ট দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক গভীর রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নেয়। মিডল ইস্ট মনিটর-এ প্রকাশিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক রঞ্জন সলোমনের এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে এমনই এক মোড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এ সংঘাতকে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা বা যুদ্ধবিরতির শর্ত বলে মনে হলেও, মূল সংগ্রামটি সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের।
ওয়াশিংটন যা আরোপ করতে চায়, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইরান তা মেনে নেবে কি না—নিবন্ধে এই প্রশ্নটিকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব বলতে আদেশের ক্ষমতার চেয়ে আদেশের কাছে মাথা নত না করার দৃঢ়তাকেই বোঝানো হয়েছে।
রঞ্জন সলোমনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী ৬০ দিনের কূটনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক কোনো সার্বিক শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ওয়াশিংটন এ কাঠামোর মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে তারা কোনো আলোচনায় ফিরবে না। সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রচণ্ড চাপে থাকা সত্ত্বেও তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ওয়াশিংটনকে সরাসরি পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এটি কেবল কোনো সরকারের রাজনৈতিক অহংকার নয়, বরং সামরিক ক্ষমতার সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতার পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা এক কৌশলগত অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু এটি কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পছন্দ বা ভাগ্য নির্ধারণের স্বয়ংক্রিয় অধিকার দেয় না।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি, নৌবহর ও অর্থনৈতিক অস্ত্রের এক সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। পারস্য উপসাগরকে নিজেদের কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গণ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখাকে সবসময় জ্বালানি নিরাপত্তার নামে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে নিবন্ধক স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতে সামরিক দখলদারত্ব কখনো সেখানে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব আনেনি। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফা বের হয়ে যাওয়া তেহরানের মনে এমন এক গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। যেখানে যে কোনো মার্কিন প্রতিশ্রুতিই অর্থহীন মনে হয়। যদি কোনো দেশ আজ মেনে নেওয়া শর্তের পর কাল তা লঙ্ঘন করে আরও বেশি ছাড় দাবি করে, তবে সেখানে কূটনীতির পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং হুমকি মেনে নেওয়া মানে দাঁড়িয়ে যায় চিরস্থায়ী অধীনতা স্বীকার করা।
নিবন্ধে নিরাপত্তার সংজ্ঞায় দুই দেশের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটনের কাছে ‘নিরাপত্তা’ মানে হলো ওই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি কৌশলগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইরান যাতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, তেহরানের কাছে ‘নিরাপত্তা’ অর্থ হলো কোনো বহিরাগত শক্তি যেন তাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করতে না পারে, তার জন্য স্বাধীন প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ফলে পারমাণবিক বিষয়টিকে ইরান কোনো বিচ্ছিন্ন কারিগরি ইস্যু হিসেবে না দেখে তাদের সামগ্রিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার ঢাল হিসেবে দেখে। তাই সামরিক হুমকির মুখে তেহরান আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ যে টেবিলে একপক্ষকে পূর্বেই আত্মসমর্পণ ধরে নিয়ে বসতে বলা হয়, সেটি কূটনীতি নয় বরং দাসত্ব নিশ্চিত করার প্রয়াস।
এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ইঙ্গিত কেবল আন্তর্জাতিক আইন বা ভৌগোলিক সীমানার লঙ্ঘন নয়, এটি এই ধারণাকে উন্মোচিত করে যে আমেরিকা নিজের সামরিক শক্তিকে সরাসরি রাজনৈতিক মালিকানায় রূপান্তর করতে চায়। অথচ হরমুজ প্রণালি কোনো একক দেশের সম্পদ নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত এক বৈশ্বিক কৌশলগত জলপথ।
বিশ্বের মোট বাণিজ্যকৃত খনিজ তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং বিপুল পরিমাণ গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর ওপর যে কোনো অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশেষ করে ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের দরিদ্র দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ও চরম অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে।
রঞ্জন সলোমন জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরান তার ভৌগোলিক সুবিধার কারণে পাওয়া রাজনৈতিক সুবিধাটি খুব ভালোভাবেই বোঝে। ইরান হয়তো বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করতে পারবে না, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি যে তাকে বাদ দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে না, তা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে প্রমাণ করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানে, ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি খোলার শর্তগুলো মেনে নেওয়ার অর্থ হলো বিশ্বমঞ্চে নিজ সামরিক শক্তির ব্যর্থতা ও ক্ষমতার সীমা স্বীকার করে নেওয়া। ফলে এই বিরোধ কেবল নৌযান চলাচলের নয়, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাসের এক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী যে, আফগানিস্তান, ইরাক, ভিয়েতনাম কিংবা কিউবা ও উত্তর কোরিয়ার ওপর দীর্ঘ অর্থনৈতিক শাস্তি প্রদান সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক আনুগত্য আদায়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
চীন, রাশিয়া, ও ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরবের মতো উদীয়মান শক্তিগুলো এখন বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে নিজ নিজ ভৌগোলিক সীমানায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন খুঁজছে। তেহরান যে হোয়াইট হাউসের সাদা পতাকা তোলার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, তা প্রমাণ করে যে কেবল হুমকি দিয়ে সব দেশ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আদায় করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা অপরিসীম হলেও, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে সেই ক্ষমতার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সলোমনের বিশ্লেষণে উঠে আসা মূল বার্তাটি হলো— মার্কিন পরাশক্তি যদি সামরিক ক্ষমতার মাধ্যমে রাজনৈতিক আদেশ জারি করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রেরই এক ধরনের পরাজয় নির্দেশ করে। হরমুজ প্রণালি কেবল একটি তেল পরিবহনের রাস্তা নয়, বরং এটি সেই নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরীক্ষার মঞ্চ, যেখানে পরাশক্তিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে মধ্যম ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিজেরাই সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করেছে।