সময়টা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর। আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ঘোষণা দিয়েই একাদশে সব স্পিনার নিয়ে নামেন। নামমাত্র একজন পেসার রাখার চেয়ে না রাখাই শ্রেয়, এই যুক্তিতে সৌম্য সরকারকে পেসার বানিয়েই সেই টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞ চার স্পিনারের সঙ্গে পার্টটাইম দুজন স্পিনার মিলে দলটা ছিল স্পিনময়। প্রায় সাত বছর পর সেই একই দল একাদশে চারজন পেসার নিয়ে খেলার চিন্তা করছে। এই বিশাল বিবর্তনটা কিন্তু একদিনে হয়নি।
আফগানদের বিপক্ষে সেই ম্যাচে বাংলাদেশ হেরে গিয়েছিল ২২৪ রানে। সাকিব, তাইজুল, মিরাজ, নাঈমরা মিলে স্পিন উইকেটে পারেননি প্রতিপক্ষকে ধসিয়ে দিতে। উল্টো রশিদ খানের স্পিন বিষে নীল হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে নিজেরাই ফাঁদে বন্দী হয়েও এমন শর্টকাট সাফল্য–ফর্মূলার পেছনে আরও কিছুদিন ছুটেছিল বাংলাদেশ।
এর আগে দেশের মাটিতে, বিশেষ করে মিরপুরে টার্নিং উইকেট বানিয়ে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে এটা যে দীর্ঘমেয়াদে যে সুফল বয়ে আনবে না, তা অধিনায়কত্ব পেয়েই বুঝে গিয়েছিলের টেস্ট স্পেশালিস্ট খ্যাত মুমিনুল হক। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি বিসিবিকে কিছু শর্ত দিয়েছিলেন।
এর অন্যতম দুটি ছিল ঘরোয়া ক্রিকেটে পেসারদের সহায়ক উইকেট প্রস্তুত করা এবং চারদিনের ম্যাচে একাদশে দুজন পেসার রাখা বাধ্যতামূলক করা। বিসিবি তার চাওয়া মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য পেস ও বাউন্সি উইকেট বানানোর কাজ শুরু করে।
অন্যদিকে সব দলকে মানতে বাধ্য করা হয় যে নির্দিষ্ট সংখ্যক পেসার খেলানোর ব্যাপারটি। শুধু তাই নয়, তারা যেন ৫-৬ ওভার বোলিং করে দর্শক না বনে যান, সেটা মনিটর করার ব্যবস্থাও করা হয়। আর যেহেতু উইকেটও স্পিন থেকে ক্রমেই স্পোর্টিং হচ্ছিল, তাই দলগুলোও পেসারদের খেলাতে আপত্তি করেনি। সিলেট থেকে আগেই পেসার উঠে আসছিল। এরপর পেসার উঠে আসা শুরু করে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও। এই দুটি পরিবর্তনে দেশের ক্রিকেটের পেস বোলিং সংস্কৃতির একটা ধারা সূচিত হয়।
সাবেক ক্রিকেটার ও ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত কোচ রাজিন সালেহ চরচাকে বলেছেন তার অভিজ্ঞতার কথা, “আগের বোর্ডের (নাজমুল হাসান) সেরা কাজের একটা হল ঘরোয়া ক্রিকেটে স্পিন সহায়ক উইকেট বদলে পেসারদের জন্য উইকেট তৈরি শুরু করা। এটা অনেক আগেই দরকার ছিল। দেখুন, আগে আপনার উইকেট থাকত স্পিনের, প্রথম দিন থেকেই স্পিন ধরত। পেসারদের কেন খেলাবেন আপনি? তাই এই চেঞ্জটা সরাসরি পেসারদের উৎসাহ যুগিয়েছে ভালো করার। এখন দেশের ক্রিকেট এর ফল পাচ্ছে।”
ঘরোয়া ক্রিকেটে দুই পরিবর্তনের ফল টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল পান ২০২২ সালে, নিউজিল্যান্ড সফরে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের সমান বা তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সেই জয়টা। বাংলাদেশে পেস বিপ্লব তখনও শুরু হয়নি। তবে আগমনী বার্তাটা মিলেছিল সেই সফরেই।
মাত্রই আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল নিউজিল্যান্ড। তারকায় ঠাসা ব্যাটিং লাইনআপের পাশাপাশি বোলিংয়ে ছিলেন সেরা ফর্মের বোল্ট, সাউদিরা। তাদের বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিয়ে বাংলাদেশ হেসেখেলে জিতে যায় ৮ উইকেটে। তিন পেসার তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেন আর শরীফুল মিলে নেন ১৩ উইকেট। এর মধ্যে ক্যারিয়ার সেরা স্পেলে দ্বিতীয় ইনিংসে ইবাদত নেন ৬ উইকেট।
বিদেশের মাটিতে টেস্ট জেতার প্রধান শর্ত হল, প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নেওয়ার মতো বোলার লাগবেই। আর সেটার জন্য দরকার বিশ্বমাপের পেসার। সেই জয়ে তাই বাংলাদেশ একটা বার্তা দিতে পেরেছিল, তারা দেশের বাইরে পেসারদের ওপর নির্ভর করে টেস্ট জিততে জানে।
তবে দলে শুধু পেসার থাকলেই তো হবে না, ব্যাটসম্যানদেরও পেস খেলা রপ্ত করতে হবে। আর এই বিভাগে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দুর্বলতা তো যুগ যুগ ধরেই। তবে যেহেতু ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিতভাবে তাদের পেসারদের বিপক্ষে বেশি বেশি খেলতে হয়েছে, ফলে টিকে থাকার জন্যই তাদের স্কিল বাড়াতে হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় ২০২৬ সালে এসে মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্সের মতো পেসারদেরও রয়েসয়ে খেলতে পারেন তানজিদ-নাজমুলরা।
চরচাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচ তালহা জুবায়ের এই প্রসঙ্গে তুলে ধরেছিলেন তার মতামত, “স্পোর্টিং উইকেট ব্যাটসম্যান-বোলার সবার স্কিলই বাড়ায়। কোচ হিসেবে আমরা সবসময় চেয়েছি ঘরোয়াতে পেসারদের জন্য উইকেটে যেন থাকে। এটা হলে ব্যাটারদের যে পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়, সেটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের অনেক সাহায্য করে। সাদমান, মুমিনুলরা এভাবেই উন্নতি করেছে।”
টেস্টে বাংলাদেশের উন্নতির পেছনে বিসিবির আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এসেছিল ২০২২ সালেই। সেবার প্রথমবারের মতো দেশের ক্রিকেটে ডিউক বলের ব্যবহার শুরু হয়। পেস বিপ্লবের সূচনালগ্নে এটি রাতারাতি বদলে দেয় ঘরোয়া এবং জাতীয় দলের চিত্র। উঠে আসেন নাহিদ রানা, মুসফিক হাসানসহ অনেক তরুণ সম্ভাবনাময় পেসার। অন্যদিকে ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলার প্রবণতাও অনেক বেড়ে যায়।
২০২২ সালের শুরু থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ১৯টি সেঞ্চুরি করেছেন। এর মধ্যে দেশের বাইরে এসেছে ৮টি। ২০২২ সালে মাহমুদুল হাসান জয় প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সেঞ্চুরি করেন। চার বছর বাদে তানজিদ হাসান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শতরান করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হয়েছেন।
তরুণদের পাশাপাশি এই সময়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ হয়েছেন মুশফিকুর রহিম। দেশের প্রথম ও একমাত্র ১০০ টেস্ট খেলা অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রখর হয়েছেন। ক্যারিয়ারের ১৪ সেঞ্চুরির অর্ধেকই করেছেন ২০২২ সাল থেকে। এই সময়ে তার গড় প্রায় ৪৫। ফিফটিও করেছেন পাঁচটি।
দলের সবচেয়ে বয়সী ক্রিকেটারের পাশাপাশি তরুণ ও সাদা বলের ক্রিকেটাররাও এখন টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে অনেক নিবেদিত। এর অন্যতম কারণ, টেস্ট ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা চুক্তির ব্যবস্থা। পাশাপাশি এই সংস্করণে ম্যাচ ফি দ্বিগুণ করা হয়। বর্তমানে একটা টেস্ট ম্যাচের জন্য খেলোয়াড়েরা ৮ লাখ টাকা পাচ্ছেন।
টি-টোয়েন্টির এই যুগে ক্রিকেটারদের টেস্টের প্রতি আকর্ষণ বজায় রাখতে এটি ছিল মাস্টারস্ট্রোক। এই কারণেই বাংলাদেশের টেস্ট দলের অংশ হতে চান সবাই। টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার পূর্বশর্ত একটা টেস্ট সংস্কৃতি গড়ে তোলা। আলাদা চুক্তি ও ম্যাচ ফি বাড়িয়ে বিসিবি এই জায়গায় বড় একটা পরিবর্তন এনেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের পর টেস্ট দল, বিশেষ করে পেসারদের নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে হইচই চলছে। আর সেটাও দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গতিময় পেসার নাহিদ রানা এই সিরিজে না থাকার পরও। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে বা চলতি বছর দেশের মাটিতে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ে তার ছিল বড় ভূমিকা। চোটের কারণে ছিটকে না গেলে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তিনি হতে পারতেন সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।
নাহিদ থেকে শুরু করে জাতীয় দল এবং জাতীয় দলের বাইরে থাকা অসংখ্য পেসারদের উঠে আসায় বড় অবদান তালহা জুবায়েরের। চোটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার খুব একটা লম্বা না হলেও কোচ হিসেবে নীরবেই তিনি দেশের ক্রিকেট বদলে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন। বয়সভিত্তিক দল থেকেই তিনি নাহিদকে নিয়ে কাজ করেছেন।
আর এখন তো জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সফলতার সঙ্গে। তালহাসহ ঘরোয়া ক্রিকেটের কোচদের বিসিবি গত কয়েক বছরে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের যেন বড় তফাৎ না থাকে, সেটা নিয়েই কাজ করছেন তালহা, মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, সোহেল ইসলাম, মিজানুর রহমান বাবুরা। জাতীয় দল ও অন্যান্য দলে দেশি কোচদের আধিক্য তাই উপকৃত করেছে টেস্ট ক্রিকেটকে সবচেয়ে বেশি।
সবশেষ কথা বলতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক নাজমুল হোসেনকে নিয়ে। বিসিবি সেই বয়সভিত্তিক দল থেকেই তার ওপর বিনিয়োগ করে গেছে। এমনকি শুরুর দিকের ব্যর্থতার পরও ছুঁড়ে না ফেলে তাকে আরও শাণিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। টেস্ট অধিনায়ক হয়ে নাজমুল যেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন।
বাংলাদেশের এই দলে টেস্ট ক্রিকেটকে আলাদাভাবে লালন করা খেলোয়াড় আছেন কয়েকজনই। তবে নাজমুলের মতো ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণ নিয়ে আবেগ, সম্মান আর নিবেদন খুব বেশি নেই। এমনকি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক থাকার সময়ও তিনি সবচেয়ে বেশি কদর করেছেন টেস্টকেই।
ভারতের বিরাট কোহলির মতো তাই নাজমুলের অধীনে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রমশ পরাশক্তি হয়ে উঠছে। কোহলি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন পেসারদের নিয়ে। খারাপ সময়েও তাদের আঁকড়ে রেখেছেন এবং হেরে গেলেও পেসারদের নিয়ে আপস করতে রাজি হননি।
ব্যক্তিত্বের দিক থেকে অনেক অমিল থাকলেও নাজমুলের অবস্থানও প্রায় একই। তিনি দেশে তো বটেই, দেশের বাইরেও টেস্টে বাংলাদেশকে শীর্ষ তিন দলের একটি হিসেবে দেখতে চান। আর তাই পেসারদের প্রতি তার রয়েছে বাড়তি দুর্বলতা।
নাহিদকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে না পাওয়ার ধাক্কা সামলেও তাই নাজমুল তার লক্ষ্যে অটুট ছিলেন। তৃতীয় পেসার হিসেবে একেবারেই ছন্দহীন ইবাদত হোসেনকে একাদশে রেখেছেন। অধিনায়কের আস্থায় বলীয়ান হয়ে প্রথম ইনিংসে তিনি দুর্দান্ত স্পেল উপহার দেন।
নাহিদ, তাসকিন, হাসান মাহমুদ, শরীফুলদেরও এভাবেই প্রতিনিয়ত আত্মবিশ্বাস যোগান নাজমুল। কারণ তিনি জানেন, দেশের বাইরে নিয়মিত জিততে হলে এই পেসাররাই তার মূল অস্ত্র।
অধিনায়ক যখন টেস্ট ক্রিকেটকে নিয়ে এত সিরিয়াস থাকবেন, পুরো দলের সবার মাঝে তা ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। এই কারণেই ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গিয়ে অনায়াসেই জিতে গেছে বাংলাদেশ। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম টেস্টে (৩) দেশটিতে জেতার রেকর্ড গড়েছে নাজমুলের দল।
আর এভাবেই স্পোর্টিং উইকেট বানানো থেকে শুরু করে ডিউক বল, পারিশ্রমিক বাড়ানো, পেস বিপ্লব এবং মুমিনুল ও নাজমুলের মতো দুজন অধিনায়কের হাত ধরে বদলে গেছে টেস্ট দল।
এই ধারা বজায় রাখতে পারলে আগামীতে টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্ব শাসন করার সব রসদ তাই এই দলটার মাঝে আছে। প্রয়োজন পথ না হারানো। নাজমুলরা কি সেটা পারবেন?