২০০০ সালের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর অনেক স্মরণীয় মুহূর্তই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল উপহার দিয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে উড়িয়ে দিয়ে জেতাটাকেই সবার ওপরে রাখতে হবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে ৯ উইকেটে হারানোর এই দিনটি—১৬ আগস্ট ২০২৬! ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে রাখা দিন। রেড লেটার ডে, যাকে বলে এই তারিখটা তেমনই। শতবর্ষ পরেও ডারউইনের এই সকালটাকে স্মরণ করবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এ তো শুধুই একটা টেস্ট জয় নয়। ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার ভূমি জয় করার জয়। যে দেশটি বাংলাদেশকে গত ২৩ বছর টেস্ট খেলার আতিথেয়তা জানায়টি শুধুমাত্র তাচ্ছিল্য করে। এমন তাচ্ছিল্য যে টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার যোগ্যই নয় বাংলাদেশ।
শুধু কি তাই? অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ সর্বশেষ ওয়ানডেই খেলেছে ১৭ বছর আগে—২০০৮ সালে! টেস্ট তো দূরের কথা! সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে তাদের মাটিতে খেলার যোগ্য দল মনে করেনি গত ২৩ বছর! অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে না পারতে টেস্ট খেলতে এর আগে একবারই ডেকেছিল, সেটা ২০০৩ সালে। তাও মেলবোর্ন, পার্থ, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড, সিডনি - আমরা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ভ্যেনু বলতে যে মাঠগুলোকে বুঝি, সেই মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলেনি অস্ট্রেলিয়া।
কারণ, বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল নয়। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচকে এতটাই একপেশে ধরে নিয়েছিল তারা যে এই ম্যাচ বাণিজ্যিকভাবে ভায়াবল মনে করারও কারণ দেখেনি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। সে হিসেবে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৯ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় অস্ট্রেলিয়াকে এক মোক্ষম জবাব, তুচ্ছ–তাচ্ছিল্যের পাল্টা। মাঠে খেলে দেখিয়ে দেওয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন আর ফেলনা পাত্র নয়।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় ক্রিকেট দুনিয়াকে আরও বড় বার্তা দিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে শিশুকাল অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়, সেই স্টেটমেন্টের একটা বড় স্বীকৃতি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় কতটা বড় ঘটনা! কেন এটাকে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন বলতে হবে? কেন ডারউইনের সকালকে ঠাঁই দিতে হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়। অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ তাদের মাটিতেই উড়িয়ে দিয়ে হারিয়েছে—এটা অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার।
তবে ডারউইনের মারারা ওভালে টেস্টের শুরুর দিন থেকেই সবার চোখ ছিল বাংলাদেশের ওপর। যে উইকেটে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জস হ্যাজলউডদের রাজত্ব করার কথা, সেই উইকেটেই ছরি ঘুরিয়েছেন হাসান মাহমুদ, ইবাদত হোসেন, তাসকিন আহমেদরা। অথচ এই টেস্টে বাংলাদেশের সেরা পেসার নাহিদ রানা চোটের কারণে খেলতেই পারেননি।
এখন আসুন দেখি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় কেন বড় ঘটনা! একটা তথ্য দিই। উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সর্বশেষ টেস্ট জিতেছিল ১৯৯৫ সালে। ৩১ বছর আগে! শ্রীলঙ্কা এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টই জেতেনি। উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই হাল আমলে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে জিততে পেরেছে।
২০০৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জিতেছে ৭টি টেস্ট। যদিও ১৯৪৭ সালে ভারত অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম সফর করার পর ৭১ বছর সে দেশে কোনো টেস্ট সিরিজ জিততে পারেনি। ২০২১ সালে ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৩৬ রানে অলআউটও হয়েছে। ভারত ছাড়া গত ১০ বছরে অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে হারাতে পেরেছে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড।
নিজেদের অস্ট্রেলিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ সালের পর ৬ অ্যাশেজ সিরিজ খেলে ২০০৫ সালে সিরিজ জিতেছিল ইংল্যান্ড।
টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা 'অঘটন'গুলোর একটি।
'অঘটন' লিখে উর্ধ্বকমা দেওয়ার কারণ, পুরো ক্রিকেট বিশ্ব তা বলছে বটে, কিন্তু এই টেস্টে চার দিনের ১১ সেশনে বাংলাদেশ এত ডমিনেট করেছে, অস্ট্রেলিয়া জিতলেই বরং অঘটন হতো।
এবারের সফরের উড়াল দেওয়ার আগে দেশে প্রেস কনফারেন্সে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন অদ্ভুত একটা কাণ্ড করেছিলেন। বলেছিলেন, “সব সিরিজের আগে তো আপনারা প্রশ্ন করেন আপনাদের লক্ষ্য কী, এবার আমি এক কাজ করি, এখানে তো অনেক সিনিয়র সাংবাদিক আছেন...আপনারাই বলেন অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত।”
এক সাংবাদিক বললেন, “ভালো খেলা।” শান্ত বললেন, “এই উত্তর আমি দিলে আপনারা মানতেন?”
প্রেস কনফারেন্সে হাসির রোল পড়ে গেল।
কে বিশ্বাস করেছিল, মাত্রই জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরে আসা বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জিতবে? যারা প্রস্তুতি ম্যাচেই ৫৪ রানে অলআউট হয়েছে এখানে এসে!
বাংলাদেশই সম্ভবত এখন ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আনুনমেয় দল, একসময় যে খেতাব ছিল পাকিস্তানের।
হয়তো এই অনুনমেয়তাই হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের সৌন্দর্য! যে সৌন্দর্য দারুণভাবে উপভোগ করে ক্রিকেট দুনিয়া।