টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম ২০ বছরে বাংলাদেশ ১১৯ ম্যাচে জিতেছিল মাত্র ১৪ বার। আর ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৩ ম্যাচে জয় ধরা দিয়েছে ১১টি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের চতুর্থ দিনে এই তালিকায় যোগ হতে পারে একটি জয় বা পরাজয়। তবে ফলাফল যাই হোক, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ যা করে ফেলেছে, সেটা হলো কিছুটা সম্মান আদায় করা।
ডারউইন টেস্টের আগে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার দলের কাছে ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। সফরের প্রত্যাশা নিয়ে সাবেক অধিনায়ক বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সম্মান আদায় করতে চান তারা। ২৩ বছর আগে দেশটিতে বাংলাদেশের প্রথম সফরের দলে ছিলেন বলেই তিনি জানেন, অস্ট্রেলিয়ায় খেলা কতটা কঠিন এবং কেন বাংলাদেশকে সেখানে যথেষ্ট সম্মানের চোখে দেখা হতো না। তবে এখন তা আর সেভাবে নেই। প্রথম টেস্টের তিন দিনে যে অবিশ্বাস্য ক্রিকেট উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ, সেটা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকেই বড় একটা ধাক্কা দিয়েছে।
যেমন, প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ব্যাট করেছে প্রায় দেড় দিন এবং ১৩৮ ওভার। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দলটির বিপক্ষে গত প্রায় আট বছরে এক ইনিংসে এরচেয়ে বেশি ওভার আর কোনো দলই ব্যাট করতে পারেনি। এছাড়া ইনিংস পরাজয়ের শঙ্কা নিয়ে খেলতে নেমে অস্ট্রেলিয়াকেই সেই বাস্তবতায় ঠেলে দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনা তো রয়েছেই, যা সমালোচকদের কাছ থেকেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
২০০৩ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গিয়েছিল, তখনও একটা জবাব দেওয়া গিয়েছিল। টেস্টে হাঁটি হাঁটি পা করতে থাকা দলটিকে নিয়ে হাসিঠাট্টায় মেতেছিল অজি মিডিয়া এবং সাবেক ক্রিকেটাররা। ডেভিড হুকস তার বিখ্যাত কলামে লিখেছিলেন, কীভাবে মাত্র একদিনেই বাংলাদেশকে হারাতে পারবে বাংলাদেশ!
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছিল বটে, তবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ছিল তাদের আয়োজনে। দুটি টেস্ট রাখা হয় ডারউইন ও কেয়ারসের মতো ভেন্যুতে, যেখানে অস্ট্রেলিয়া টেস্টই খেলত না। দেশটির বিখ্যাত ভেন্যুগুলোয় বাংলাদেশকে খেলার সুযোগ দেওয়ার ‘যোগ্য’ মনে করেনি অস্ট্রেলিয়া।
প্রায় দুই যুগ পরও এই চিত্রে আসেনি বদল। সিরিজের প্রথম টেস্ট হচ্ছে সেই ডারউইনেই, আর পরের ম্যাচে ম্যাকাইতে। অর্থাৎ, বাংলাদেশকে এখনো বড় ভেন্যুতে খেলতে দেওয়ার মতো যোগ্য প্রতিপক্ষ মনে করেনি অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড। কেন? উত্তর খুব সহজ। বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলাটা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান নয়।
এর পেছনে মূল কারণ প্রায় দুই যুগ আগের সেই সফরের হতাশাজনক পারফরম্যান্সই। এক দিনে না হারলেও দুই টেস্টেই খালেদ মাহমুদের দল হেরে গিয়েছিল ইনিংস ব্যবধানে। সেই পারফরম্যান্সের সঙ্গে টেস্টে নিজেদের ধারাবাহিকতার অভাবের কারণেও অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে টেস্ট খেলার সৌভাগ্য আর হয়নি।
এরপর কেটে গেছে অনেক সময়। এখনো টেস্টে বাংলাদেশ সমীহ জাগানিয়া দল হতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটু একটু করে অবশ্য ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে ভালো করতে শুরু করেছে নাজমুল হোসেনের দল। দায়িত্ব পেয়ে তিনি বলেছিলেন দেশের বাইরে বড় দলগুলোকে নিয়মিত হারানোর স্বপ্নের কথা।
পাকিস্তানকে দুই বছর আগে পাকিস্তানে গিয়ে টেস্ট সিরিজে হারানো দিয়ে শুরু হয় সেই যাত্রার। তবুও অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে বাংলাদেশকে কেউই পাত্তা দিতে চাচ্ছিল না। জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। টেস্ট শেষ হবে কত দিনে, কত রানের মধ্যে অলআউট হবে বাংলাদেশ—এসবই ছিল গবেষণার বিষয়।
তবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট শুরু হতেই ক্রিকেট বিশ্বকে কিছুটা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে বাংলাদেশ। প্রথম দিনেই অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে যার শুরু। ৬ উইকেট নিয়ে একাই ধস নামান হাসান মাহমুদ। সঙ্গে তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেনরাও ভড়কে দেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা ব্যাটসম্যানদের।
দ্বিতীয় দিনের পুরোটা ব্যাট করার পর তৃতীয় দিনেও অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখতে সমর্থ হয় সফরকারীরা। ছবি: বিসিবি
এরপর দ্বিতীয় দিনের পুরোটা ব্যাট করার পর তৃতীয় দিনেও অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখতে সমর্থ হয় সফরকারীরা। দলীয় ইনিংস থামে ৪২৬ রানে গিয়ে। সঙ্গে ২২৮ রানের বেশ বড় লিড।
অনেক কারণেই এই ইনিংসটি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য ল্যান্ডমার্ক। এশিয়ার বাইরে এটি নিজেদের ইতিহাসের পঞ্চম সর্বোচ্চ স্কোর। বড় দলগুলোর বিপক্ষে ২২৮ রানই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি লিডের কীর্তি। আর সব মিলিয়ে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের পঞ্চম বড় লিড এটি।
এদিকে সেই ২০১৯ সালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের পর এই প্রথম দেশের মাটিতে মাঠে কোনো দলের কাছে ২০০ বা তার বেশি প্রথম ইনিংসের লিড হজম করেছে অস্ট্রেলিয়া।
পরিসংখ্যান যা বলবে না, তা হলো ব্যাট হাতে সময়ের সেরা বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে বাংলাদেশের দৃঢ়তা। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জস হ্যাজেলউড ও নাথান লায়নদের বিপক্ষে টপ অর্ডার থেকে শুরু করে মেহেদি হাসান মিরাজ, হাসান, তাসকিন, তাইজুল ইসলামরা দেখিয়েছেন চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা।
২০০৬ সালে এই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ১৫৮ রানের লিড নিয়েও হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ব্যাটিং ও বোলিংয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে অনুজ্জ্বল পারফরম্যান্সই ছিল এর মূল কারণ। তবে সেই বাংলাদেশ আর এই বাংলাদেশ দলের মূল পার্থক্য মানসিকতায়।
বড় একটা লিড পেয়েও তাই বল হাতে হাসানরা অস্ট্রেলিয়াকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। ট্রাভিস হেড, স্টিভ স্মিথসহ চার উইকেট নিয়ে ম্যাচের লাগাম অনেকটাই নিজেদের হাতেই নিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। ক্যামেরন গ্রিন, অ্যালেক্স কেয়ারি, বিউ ওয়েবস্টাররা অতিমানবীয় কিছু না করলে এই টেস্টে বাংলাদেশের হেরে হওয়াটা বেশ কঠিনই।
ডারউইন টেস্টে তাই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিততে পারে, আবার হেরেও যেতে পারে নাটকীয়ভাবে। তবে এই ম্যাচের বড় প্রাপ্তি, নাজমুল-তানজিদরা বিশ্ব ক্রিকেটে মাথাটা একটু উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছেন।