বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং এর ক্যানসার-বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার’ (আইএআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ক্যানসার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্তত ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে–অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রতি ৬টি মৃত্যুর ১টির পেছনেই দায়ী এই মরণব্যাধি।
২০৫০ সালের মধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বছরে ৩ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বের এই মহামারীতুল্য স্বাস্থ্যসংকটে আরও একটি করুণ বাস্তবতা হলো উন্নত ও অনুন্নত বিশ্বের বৈষম্য।
যখন উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে আধুনিক স্ক্রিনিং, জিন থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপির সুযোগে রোগীর বেঁচে থাকার হার বাড়ছে, ঠিক তখন উন্নয়নশীল দেশগুলো উপযুক্ত চিকিৎসা সেবার অভাবে ধুঁকছে।
ঠিক এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, বহু দশকের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভূরাজনৈতিক বৈরিতা ও নানামুখী চাপ উপেক্ষা করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ইরান।
সম্প্রতি দেশটি ক্যানসার চিকিৎসায় প্রতিষেধক হিসেবে কার্যকর অনকোলাইটিক বা ক্যানসার ধ্বংসকারী ভাইরাসের নকশা, জিনগত প্রকৌশল, উৎপাদন ও পরিশোধনের সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তি সফলভাবে উন্মোচন করেছে।
অনকোলাইটিক প্রযুক্তি
ইরানের ইংরেজি ভাষার গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, গত রোববার ‘অ্যাকাডেমিক সেন্টার ফর এডুকেশন, কালচার অ্যান্ড রিসার্চ’ (এসিইসিআর)-এর ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক এই প্রযুক্তির উন্মোচন করা হয়।
এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
এসিইসিআর-এর ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের প্রধান রামিন সারামিফারোশানির নেতৃত্বে ‘অ্যাডভান্সড ক্যানসার থেরাপি টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ গ্রুপ’ দীর্ঘ প্রচেষ্টায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
অনকোলাইটিক ভাইরাস প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সুস্থ কোষের কোনো ক্ষতি না করে কেবল নির্দিষ্ট ক্যানসার আক্রান্ত কোষে আঘাত হানে।
এটি ক্যানসার কোষের ভেতরে বংশবৃদ্ধি করে এবং ক্যানসার কোষগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে প্রচলিত চিকিৎসায় যেসব জটিল ক্যানসার নিরাময় সম্ভব হচ্ছিল না, সেগুলোর চিকিৎসায় এটি আশার আলো দেখাচ্ছে।
প্রকল্পটিতে ভাইরোলজি, বায়োটেকনোলজি, জিনগত প্রকৌশল ও ‘অ্যাডভান্সড থেরাপিউটিক মেডিসিনাল প্রোডাক্টস’ (এটিএমপিস)-এর সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
এতে করে গবেষকরা এখন আধা-শিল্প স্কেলে ভাইরাস তৈরি, তা পরিশোধনের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনায় সক্ষম।
ইতিমধ্যে ল্যাবরেটরি ও প্রাক-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর, পণ্যটি বর্তমানে কঠিন ও জটিল ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ইরানে প্রথমবারের মতো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ধাপে প্রবেশ করেছে–যা দেশটির প্রথম ‘ক্যানসার ভায়রোথেরাপি’ প্রকল্প হিসেবে এক নতুন মাইলফলক।
তবে এই প্ল্যাটফর্মটি কেবল একটি একক পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এটি পরবর্তী প্রজন্মের অনকোলাইটিক ভাইরাসের পাশাপাশি জিন থেরাপি এবং অন্যান্য এটিএমপি-সহ বিভিন্ন উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবনে সহায়তার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
একইসঙ্গে এটি জ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাপণ্য উন্নয়ন ও বাণিজ্যিকীকরণের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে।
এসিইসিআর জানিয়েছে যে, প্রকল্পটি মেডিকেল বায়োটেকনোলজির মতো একটি উন্নত ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং বিশেষায়িত মানবসম্পদ তৈরিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে।
এটি বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি উন্নত ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
পশ্চিমা ধারণার বিপরীতে ইরানের উচ্চশিক্ষা ও লিঙ্গসমতা
ইরানের এই যুগান্তকারী সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
সাধারণ পশ্চিমা গণমাধ্যম ও ধারণায় ইরানকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়, বাস্তব পরিসংখ্যান তার একদম বিপরীতচিত্র তুলে ধরে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই দেশটি স্বাবলম্বী হওয়ার কৌশলগত অংশ হিসেবে শিক্ষা ও গবেষণায় রেকর্ড বিনিয়োগ শুরু করে।
ভারতীয় স্বাধীন গণমাধ্যম দ্য ওয়্যারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের মতে, বর্তমানে ইরানের বয়স্ক সাক্ষরতার হার প্রায় ৯৩-৯৪ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় ৯৭ শতাংশ। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ইরান এক বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করেছে–যেখানে নারীদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৮৫ শতাংশ।
শিক্ষা ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতার আঞ্চলিক দৌড়ে ইরান বহুদূর এগিয়ে। দেশটির মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীই নারী।
উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক; যেখানে বর্তমানে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়ন করছেন।
প্রতি বছর বিশেষ করে এসটিইএম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়গুলো থেকে শত শত হাজার শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে বের হচ্ছেন।
বিশ্বখ্যাত ফ্যাক্ট চেকিং ওয়েবসাইটের মতে স্নোপসের মধ্যে এই স্নাতক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশই নারী, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ধনী দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
অন্যদিকে ইরানি সংবাদমাধ্যম ওয়ানা-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের মোট উদ্ভাবক বা পেটেন্টধারীদের মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশই নারী এবং প্রচুর নারী উদ্যোক্তা টেক-স্টার্টআপ পরিচালনা করছেন।
এই সবকিছু সম্ভব হয়েছে পশ্চিম বিশ্বের কাছে তথাকথিত মোল্লাতন্ত্রের সরকার বলে পরিচিত ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের জন্য।
দ্য ওয়্যারের ওই প্রতিবেদন মতে, ‘ইরান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন’ ও ‘ন্যাশনাল এলিট ফাউন্ডেশন’-এর মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো মেধাবীদের অর্থায়ন, গবেষণা ও বাণিজ্যিকীকরণে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে থাকে।
বৈশ্বিক গবেষণায় ইরানের অবস্থান
কঠোর মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য বিশ্ববাজার থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার, বৈদেশিক অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল।
এমনকি মেধা পাচার ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত কড়াকড়ি দেশটির গবেষকদের সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু এই বৈরী পরিবেশই ইরানকে দেশীয় প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরশীল হতে বাধ্য করেছে।
‘নেচার ইনডেক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাধা সত্ত্বেও সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক আউটপুটে বিশ্বজুড়ে ইরানের অবস্থান ৩৪তম (পশ্চিম এশিয়ায় ৪র্থ)।
বিশেষ করে ন্যানোটেকনোলজি গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে ইরান বিশ্বের চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছে।
ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও)-এর ২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স’-এ ইরানের রাজধানী তেহরান বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাস্টারের মধ্যে ৬৩তম স্থান অর্জন করেছে। মোট ১৩৯টি দেশের মধ্যে ইরানের সার্বিক অবস্থান ৭০তম হলেও জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত আউটপুটে দেশটি বিশ্বে ৪৬তম এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিধিতে বিশ্বজুড়ে অষ্টম স্থান অধিকার করে আছে। এই অগ্রগতি ৩৩টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পার্কে বিস্তৃত প্রায় ১০ হাজার জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি প্রাণবন্ত স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি খাত গড়ে তুলেছে।
ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা এই অনকোলাইটিক ক্যানসার থেরাপি কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি বড় অগ্রগতিই নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে স্বাবলম্বিতা, নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষার ওপর সঠিক বিনিয়োগ থাকলে বাহ্যিক চরম নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে বৈশ্বিক বিজ্ঞানের শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব।