দেশটা ভালো চলছে না। নতুবা বউ চাল সদৃশ ভাত খেতে দেয় কেন? একবেলা হলে কথা বলতাম না, কিন্তু এখন নিয়মিত একই দশা। ভাত এমন কেন জিজ্ঞেস করতেই বিস্ফোরণ। “সারাদিন কলাম লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাক, বহুদিন যাবত চুলায় গ্যাস থাকে না, মাঝে মাঝে মিটমিট করে জ্বলে, সেই জ্বলায় তাপ থাকে না, চাল আর ভাত হয় না, আমি করব কী।”
তাহাজ্জুতের জন্য বউ শেষ রাতে ওঠে, আমি তখনো নেটে। ফজরের নামাজ-কোরআন তেলোয়াত শেষে সে পাকঘরে ঢোকে। ইদানীং দেখি গভীর রাতেই ভাত রান্না করে ফ্রিজে রাখছে। পচে যাওয়ার ভয়ে এই ব্যবস্থা। ফ্রিজ থেকে বের করা ভাত চালের মতো শক্ত। ওভেনে গরম করে দেয় না কেন জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক। শুধু বাসা-বাড়ি নয়, পুরো জীবনযাত্রাই বিদ্যুৎ-গ্যাসের কাছে জিম্মি।
পরিবহন খাতও অচলপ্রায়। আত্মীয়ের দাওয়াতে সিএনজির জন্য এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে খালি গাড়ি না পেয়ে বাসায় ফিরেছি। পরে জানলাম, গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ সিএনজি বন্ধ। ট্রাক-বাসও একই অবস্থায়। জ্বালানি তেলে চললে পরিবহন খরচ বাড়ে, আর সেই চাপ পড়ে সবজির বাজারে। এখন কেজি প্রতি একশ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। নসিহতকারীদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বউ বাজারে যায়, বাজার থেকে এসে ঘ্যানঘ্যান করে, আমি শুনেও না শোনার ভান করি। নিম্ন আয়ের মানুষ কীভাবে টিকবে এই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে শিল্পে। সারা দেশের কারখানা ভয়াবহ গ্যাস সংকটে। শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে অনেক কারখানা বন্ধ। গাজীপুরে দৈনিক চাহিদা ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ ৩০ মিলিয়ন। সময়মতো পোশাক রপ্তানি না হলে কার্যাদেশ বাতিল কিংবা মূল্যছাড় দিতে হবে। শুধু পোশাক নয়, গ্যাসনির্ভর প্রতিটি শিল্পের উৎপাদন হুমকিতে। আমাদের নিজস্ব গ্যাস চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাই এলএনজি আমদানি করতেই হয়। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে দুটি ভাসমান টার্মিনাল হয়েছিল। গত ২১ জুলাই একটি অগ্নিকাণ্ডে বন্ধ। সেটি চালু না হওয়া পর্যন্ত সংকট থাকবেই। কাচশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। গ্যাসের অভাবে চুল্লি বন্ধ হলে সেটি আর চালু হয় না, নতুন করে বানাতে হয়। ইস্পাতেও একই অবস্থা। ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলে যেতে হচ্ছে, কিন্তু ডিজেলও নেই। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ভেঙে পড়ছে।
লোডশেডিং এখন নিত্য সঙ্গী। গরমে, ঠান্ডায়, দিনে, রাতে। ঘরের ফ্রিজ, টিভি নষ্ট হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী লাকড়ি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। ড. ইউনূস দেশকে ‘সিঙ্গাপুর’ বানাতে গিয়ে ‘ইথিওপিয়া’ বানিয়ে দিয়ে গেছেন। আবার ভারতের কাছ থেকে ডিজেলের জন্য ধরনা। গত দুই বছরে হাজার হাজার কারখানা বন্ধ। কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার। ফুটপাতে হকারের পাশাপাশি ভিক্ষুকও বেড়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগও থেমে নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ইউনূসের আমলেই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। অথচ ১৮ মাস ধরে ‘ধরা-ছোঁয়ার বাইরে’ থাকার সংস্কৃতি চলছে। বিরাট বাজেট, এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে না পারলে বাজেট ফেল করলে দেশ ডুববে, জনগণের ভোগান্তিও বাড়বে। আনুপাতিক হিসাবে ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি ঋণ করেছে, এখনকার সরকারও ঋণে চলছে।
জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপি জামায়াতকে সংসদে পাঠিয়েছে। সংসদে আলোচনা করে সরকারকে ভালোকাজে বাধ্য করা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখাই বিরোধী দলের কাজ। সেটা না করে সচিবালয় ঘেরাও কেন? সচিবালয় কি সংসদের চেয়ে বড়? আমলাতন্ত্র নিয়েও টানাটানি। ইউনূসের সময় থেকে আমলাতন্ত্র বিএনপি-জামায়াতের দখলে, এখন আবার ‘দলীয়করণমুক্ত’ করার নামে গণহারে ছাঁটাই হচ্ছে। দুয়েকজন বাদে আমলাদের তো রং নেই, সুযোগ বুঝে রং বদলায়।
সবশেষে একটা কথা, রাজনীতির অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে অর্থনীতির চাহিদা দিয়ে। মানুষ এখন স্লোগান নয়, গ্যাস চায়; ভাষণ নয়, বিদ্যুৎ চায়; মিছিল নয়, কারখানা চালু থাকা চায়। বিএনপির হাতে এখন রাষ্ট্রক্ষমতা। মাত্র ছয় মাস। দেশটা ভালো চলছে না—এই বাক্যটা যত দ্রুত ‘ভালো চলছে’তে বদলানো যায়, ততই মঙ্গল।
জিয়াউদ্দীন আহমেদ: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক