ইরানের সাথে সাম্প্রতিক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের বহরে থাকা দূরপাল্লার এমকিউ-৯ রিপার নজরদারি ও আক্রমণকারী ড্রোনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হারিয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে। আর্থিক হিসাবে যার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে তিনজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আরও একজন মার্কিন কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন যে, হারানো সব ড্রোন কেবল শত্রুপক্ষের সরাসরি হামলায় ধ্বংস হয়নি; বরং বেশ কয়েকটি ড্রোন অপারেটর বা চালকদের সাথে সংযোগ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে ভেঙে পড়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতের জন্য এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতি কেবল আর্থিক দিক থেকেই বড় আঘাত নয়, বরং এটি আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ড্রোন প্রযুক্তির অকার্যকারিতাকেও বিশ্বদরবারে প্রকাশ করে দিয়েছে।
এমকিউ-১ প্রিডেটর ড্রোনের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত এমকিউ-৯ রিপার মূলত একটি মিডিয়াম-অলটিটিউড লং-এন্ডুরেন্স ড্রোন, যা টানা ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে উড়তে সক্ষম। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম নজরদারি চালানোর পাশাপাশি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলা চালাতে বিশেষভাবে পারদর্শী।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বহরে ১৮৫টি রিপার ড্রোন ছিল। এর মধ্যে ১৬৫টি ড্রোন মার্কিন বিমান বাহিনীর অধীনে এবং অবশিষ্ট ২০টি মার্কিন মেরিন কোরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছিল। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান এই ড্রোনের প্রতিটি নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের মতো।
এত বিপুল অঙ্কের সামরিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ও গুলি করে নামানোর খবর ইরানি টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে ইরানি সামরিক বাহিনী দাবি করে যে, তারা আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় একাধিক এমকিউ-৯ ড্রোন ভুপাতিত করেছে এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটির হ্যাঙ্গারে পার্ক করে রাখা অবস্থাতেও বেশ কিছু ড্রোন সফলভাবে ধ্বংস করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যানুযায়ী, গত ৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখন একটি সাময়িক বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়, তখন পর্যন্ত মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রাথমিক তথ্যে প্রকাশ পেয়েছিল যে ইরানি বাহিনীর হাতে প্রায় দুই ডজন বা ২৪টির মতো রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত ৪৫টি ড্রোনের এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্দেশ করে যে, প্রাথমিক অনুমানগুলো প্রকৃতপক্ষে বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির প্রায় অর্ধেক ছিল।
২০০৭ সালে মার্কিন বিমান বাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনগুলো পরবর্তীতে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তান, সোমালিয়া, ইয়েমেন এবং অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ও গোপন ড্রোন হামলায় এই ড্রোনের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত ৪৫টি ড্রোনের এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্দেশ করে যে, প্রাথমিক অনুমানগুলো প্রকৃতপক্ষে বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির প্রায় অর্ধেক ছিল। ছবি: রয়টার্স
বিশেষ করে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বহুল আলোচিত ড্রোন দিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক হত্যাকাণ্ডের কর্মসূচির মূল প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই এমকিউ-৯ রিপার। দীর্ঘদিন ধরে এই রিপার ড্রোনকে আকাশসীমায় অপরাজিত ও স্পর্শাতীত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, ২০১৭ সালে সেই ধারণার অবসান ঘটে যখন ইয়েমেনের হুথি বাহিনী একটি সোভিয়েত আমলের পুরনো বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রথমবারের মতো একটি রিপার ড্রোন গুলি করে নামাতে সক্ষম হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে ইয়েমেনসহ অন্যান্য সংঘাতে রিপার ড্রোন ধ্বংস হওয়ার ধারাবাহিক ঘটনা ঘটতে থাকে। ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানো শুরু করে, ততদিনে রিপার ড্রোনকে আধুনিক বা শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পন্ন যেকোনো সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত পুরোনো, অপ্রাসঙ্গিক এবং অকার্যকর একটি সরঞ্জাম হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তবে এত বড় ধরনের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং বিশাল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এই রিপার ড্রোনের উপযুক্ত বা বিকল্প কোনো তাৎক্ষণিক স্থলাভিষিক্ত ড্রোন প্রযুক্তি নেই। এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো ড্রোনটির প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জেনারেল অ্যাটোমিক্স ২০২০ সালেই এমকিউ-৯ ড্রোনের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল।
তৈরি হওয়া এই শূন্যতা মোকাবেলায় মার্কিন সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি স্থগিত হয়ে যাওয়া এমকিউ-৯ ড্রোনের উৎপাদন পুনরায় চালু করার জোর সুপারিশ করেছে। অপরদিকে, গত জুন মাসে সিনেটের এক শুনানিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ডেভিড ট্যাবর নিশ্চিত করেছেন যে, পেন্টাগন তাদের মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে পূর্বে বিক্রি করা যত বেশি সম্ভব এমকিউ-৯এ ড্রোন পুনঃক্রয় বা ফেরত নেওয়ার কৌশলগত পথ ও উপায়গুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, ইরানের সাথে সংঘটিত এই যুদ্ধ কেবল ড্রোন বহরকেই খালি করেনি, বরং মার্কিন সামরিক বাহিনীর আরও একাধিক অত্যাধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থার চরম ঘাটতি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২৮ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মোট মজুতের অর্ধেকেরও বেশি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, প্রায় ৮০ শতাংশ থাড বিমান বিধ্বংসী অ্যান্টি-এয়ার মিসাইল এবং তাদের সংরক্ষিত টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ফেলেছে।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনী কোনো প্রকারের মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে পড়েছে বলে জনসম্মুখে করা দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবুও তিনি যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত ‘জরুরি প্রয়োজন’ মেটাতে এবং সামরিক রসদ পুনর্গঠনের জন্য কংগ্রেসের কাছে ৮৭.৬ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট চেয়েছেন। ট্রাম্পের চাওয়া এই বিপুল পরিমাণের বিশেষ বাজেটের মধ্যেই প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার কেবল যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ ক্রয়ের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে ওয়াশিংটন পোস্টের এই খবরের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইরানের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মার্কিন ড্রোনের কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক অস্ত্রাগারের ওপর চরম আর্থিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করেছে।