স্পঞ্জ তো চেনেন। স্পঞ্জের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো পানি বা তরল শুষে নিতে পারা। স্পঞ্জ নিয়ে কেন আলোচনা তাই না? ধরুন ঢাকা শহর এক বিশাল স্পঞ্জ। তাহলে এই যে একটু বৃষ্টিতেই শহর কি ডুবে যেত? না। বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরির আগেই সেই পানি শুষে নিত। শুনতে অদ্ভুত লাগছে জানি। কিন্তু স্পঞ্জ সিটি বা স্পঞ্জ শহরের আইডিয়াটা কিন্তু এমনই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই শহরগুলোকে এমনভাবে পরিকল্পনা ও নির্মাণ করা দরকার, যাতে সেগুলো বিশাল স্পঞ্জের মতো বৃষ্টির পানি শোষণ করে নিরাপদে সরিয়ে দিতে পারে। এমনটাই বলছেন গবেষকেরা।
২০২২ সালের মার্চে জার্মানির ডিজাইন অ্যান্ড কনসালটেন্সি ফার্ম আরুপ প্রথমবারের মতো একটি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাতটি বড় শহরকে তাদের স্পঞ্জ ক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছে। এখানে ‘স্পঞ্জ ক্ষমতা’ বলতে বোঝানো হয়েছে একটি শহরে এমন কতটা প্রাকৃতিক জায়গা রয়েছে, যেখানে বৃষ্টির পানি সহজে শোষিত হতে পারে।
স্পঞ্জ শহর কী?
ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম বলছে স্পঞ্জ শহর বলতে এমন নগর এলাকাকে বোঝানো হয়, যেখানে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক জায়গা থাকে–যেমন গাছপালা, হ্রদ, পার্ক কিংবা বৃষ্টির পানি শোষণ করতে সক্ষম অন্যান্য ব্যবস্থা। এসব ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি কমানো।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে এসব সমস্যা মোকাবিলার ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘প্রকৃতিনির্ভর সমাধান’।
এর মানে হলো, শুধু কঙ্ক্রিটের ড্রেন বা বাঁধের ওপর নির্ভর না করে শহরের গাছপালা, জলাধার, পার্ক ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকেও বৃষ্টির পানি নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করা।
এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন শহর নিজেদের স্পঞ্জ ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
চীনের সাংহাই, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক এবং যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ শহর এর উদাহরণ। এসব শহরে নগরের ভেতরে বাগান তৈরি, নদীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং গাছপালা ঘেরা ফুটপাত তৈরির মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উদ্দেশ্য একটাই বৃষ্টির পানি যতটা সম্ভব শহরের মাটিতে শোষণ, দ্রুত ও নিরাপদে পানি নিষ্কাশন এবং জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি কমানো।
স্পঞ্জ শহর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও তীব্রতা বাড়ছে। ফলে বিশ্বের অনেক শহরেই ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে নগরজীবনে বন্যার ক্ষয়ক্ষতিও।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল বা আইপিসিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে প্রায় ৭০ কোটি মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করছেন, যেখানে অতিবৃষ্টির ঘটনা বেড়েছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়লে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এর প্রভাব বিভিন্ন শহরে এরই মধ্যে দেখা গেছে। ২০১৬ সালে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে আকস্মিক বন্যায় রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়, গাছ উপড়ে পড়ে এবং ভবনগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার ২০২১ সালে ট্রপিক্যাল স্টর্ম এলসার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বন্যা দেখা দেয়। দুটি ঘটনাতেই মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকা ব্যাহত হয় এবং কয়েক ডজন মানুষ মারা যান। কয়েকদিন আগেই শ্রীলংকাতে স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে পানির কারণে। আর ঢাকায় কয়েকদিন আগেই রাস্তাঘাট ডুবে গিয়েছিল, এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাই বন্ধ করার দাবি উঠেছিল।
তবে স্পঞ্জ শহরের সুবিধা কিন্তু শুধু বন্যা মোকাবিলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এসব শহর নদী, সবুজ এলাকা ও মাটিতে বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। ফলে পানি দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার বদলে সংরক্ষিত থাকে। এতে খরার সময়ও শহরগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিস্থাপক হতে পারে।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো খরচ। জার্মানির নকশা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরুপ এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক গবেষণা অনুযায়ী, শহরের পানি শোষণের জন্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা কৃত্রিম ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি সাশ্রয়ী। একই সঙ্গে এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ২৮ শতাংশ বেশি কার্যকর।
এখন প্রশ্ন হলো একটা শহরের কতটা স্পঞ্জ ক্ষমতা আছে, সেটা কীভাবে মাপা হয়?
একটি শহর কতটা স্পঞ্জের মতো; অর্থাৎ, বৃষ্টির পানি কতটা শোষণ ও ধরে রাখতে পারে, তা জানতে আরুপের গবেষকেরা কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করেছেন।
গবেষকেরা সাতটি বড় শহরের কতটা এলাকা নীল ও সবুজ অবকাঠামো দিয়ে আচ্ছাদিত, তা বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ঘাস, গাছপালা, পুকুর ও হ্রদ। পাশাপাশি শহরের কতটা এলাকা ‘ধূসর অবকাঠামো’ দিয়ে তৈরি, সেটিও দেখা হয়েছে। ধূসর অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে কঙ্ক্রিট, পাকা রাস্তা ও ভবন।
শুধু ওপরের অংশ দেখেই অবশ্য হিসাব করা হয়নি। শহরের মাটির ধরন ও গঠনও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। কারণ, মাটি কতটা পানি ধরে রাখতে পারে, সেটিও শহরের স্পঞ্জ ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্বের অনেক শহরেই ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স
এ ছাড়া শহরে কতটা গাছপালা রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গাছপালা পানি ধরে রাখতে এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত গড়িয়ে যাওয়া বা ‘রানঅফ’ কমাতে সাহায্য করে।
এই হিসাব করতে গবেষকেরা স্যাটেলাইটের ছবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করেছেন।
আরুপ জানিয়েছে, হাতে মানচিত্র তৈরিতে যে সময় লাগে, তাদের এআই-ভিত্তিক ডিজিটাল ম্যাপিং টুল টেরেইন ব্যবহার করে একটি শহরের ল্যান্ডস্কেপের মানচিত্র তৈরিতে তার চেয়ে ৮০ শতাংশ কম সময় লাগে।
স্পঞ্জ ক্ষমতা মেপে গবেষকেরা আসলে কী পেলেন–এবার আসি সেই আলাপে।
গবেষণায় সাতটি শহরের স্পঞ্জ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো নিউইয়র্ক, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, মুম্বাই, অকল্যান্ড, সাংহাই ও নাইরোবি। প্রশ্ন হলো, কোন শহর সবচেয়ে বেশি স্পঞ্জের মতো পানি শোষণ করতে পারে?
প্রতিটি শহরকে ১ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে একটি স্পঞ্জ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এই তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। শহরটির স্পঞ্জ ক্ষমতা ৩৫ শতাংশ। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে অকল্যান্ডের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, অসংখ্য গলফ কোর্স, সবুজ পার্ক এবং তুলনামূলক বড় আবাসিক বাগান।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নাইরোবি, ৩৪ শতাংশ নিয়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও তীব্রতা বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স
এরপর তৃতীয় অবস্থানে যৌথভাবে রয়েছে নিউইয়র্ক, মুম্বাই ও সিঙ্গাপুর। তিন শহরেরই স্পঞ্জ ক্ষমতা ৩০ শতাংশ।
২৮ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে সাংহাই।
আর তালিকার একেবারে শেষে লন্ডন। শহরটির স্পঞ্জ ক্ষমতা মাত্র ২২ শতাংশ। গবেষকদের হিসাবে, শহরটিতে কঙ্ক্রিটের পরিমাণ বেশি এবং মাটির পানি শোষণক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়াই এর অন্যতম কারণ।
এখন প্রশ্ন হলো–কোনো শহর কীভাবে স্পঞ্জ শহর হয়?
এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনে ভূমিধসের পর ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গাছ লাগানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় তৈরি করা হচ্ছে একটি রিং ফরেস্ট বা বেষ্টনী বন। এর লক্ষ্য একদিকে শহরের বাতাস পরিষ্কার রাখা, অন্যদিকে শহরের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকানো।
ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের মতো প্রযুক্তি শহরগুলোকে তাদের হাতে থাকা জায়গাগুলো কীভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়, তা দ্রুত বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
কোথায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে, কোথায় পুকুর তৈরি করা সম্ভব, কিংবা শহরের ভেতরে কোথায় বাগান করা যেতে পারে এসবের পাশাপাশি কোনো জায়গা যথাযথভাবে ব্যবহার না করলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটিও এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব।