যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির বাজারে চলতি বছর একটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে থাকা চীনের বাজার দ্রুত কমছে। কিন্তু এই সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিসংখ্যান বলছে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি নতুন ক্রয়াদেশ পাচ্ছে। এগুলো আগে চীনের ছিল। ইউএস অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটেক্সা) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির তথ্যে দেখা যায়, এই সময়ে চীন থেকে আমদানি কমেছে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, চীনের ছুটে যাওয়া ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসেনি।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের রপ্তানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ চীনের ক্রয়াদেশগুলো এই দেশগুলোতে চলে গেছে। একই সময়ে ভারতের রপ্তানিও কমেছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ এই সময়ে ভারতও চীনের ছুটে যাওয়া ক্রয়াদেশ ধরতে পারেনি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চীনের ছুটে যাওয়া ক্রয়াদেশে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ভিয়েতনাম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এছাড়াও গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বড় অংশ ভিয়েতনামে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে কম্বোডিয়াও দ্রুত নিজেদের অবস্থান সংহত করছে। দেশটিতে মজুরি তুলনামূলক কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো পোশাক উৎপাদনের জন্য কম্বোডিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধিই প্রমাণ করে চীনের ছুটে যাওয়া ক্রয়াদেশের একটি বড় অংশ এখন কম্বোডিয়ায় যাচ্ছে।
একই সময়ে ইন্দোনেশিয়াও কিছুটা সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে। বিশেষ করে স্পোর্টসওয়্যার, অ্যাথলেটিক পোশাক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য বিশেষায়িত পোশাক উৎপাদনে দেশটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
কেন সুবিধা নিতে পারছে না বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও সাম্প্রতিক এই পরিবর্তনের পুরো সুবিধা নিতে পারেনি। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, চীন থেকে ক্রয়াদেশ কমলে তার বড় অংশ বাংলাদেশে আসবে। বাস্তবে তা হয়নি।
এই খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে জ্বালানি সংকট। অনেক কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সমস্যাও উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফলে বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক আলোচনায় জানা যায়, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি তীব্র রূপ ধারণ করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানার পরিচালনা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মোট চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার কারখানাগুলোতে মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে শিল্প কারখানাসহ সব খাতে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘ লিড টাইম। বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন খুব দ্রুত পণ্য চান। কিন্তু কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন এবং রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে বাংলাদেশের যে সময় লাগে, তা এখনো প্রতিযোগী অনেক দেশের তুলনায় বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যজট, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহনসংক্রান্ত নানা জটিলতাও সময়মতো পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা এবং ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যা।
উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “চলমান জ্বালানি সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। সরকার জানিয়েছে, দ্রুত পরিস্থিতির সমাধান হবে। এ সংকটে আর্থিক ক্ষতি তো হয়েছেই। তবে তার চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা যেন ক্ষুণ্ন না হয়।”
এসব সমস্যার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বিশ্ব পোশাক বাজারে এখন দ্রুত বাড়ছে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক, স্পোর্টসওয়্যার ও ফ্যাশন পণ্যের চাহিদা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ কারখানা এখনো কটননির্ভর বেসিক পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। তাই উচ্চমূল্যের অনেক ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, চীন কিংবা অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে।
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ক্রয় কৌশলেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক প্রতিষ্ঠান ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল অনুসরণ করত। অর্থাৎ, চীনের পাশাপাশি একটি বিকল্প দেশে উৎপাদন ব্যবস্থা রাখত। কিন্তু এখন সেই কৌশল বদলে ‘চায়না প্লাস মেনি’ ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ, একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে একই ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত কিংবা মেক্সিকোসহ একাধিক দেশে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কোনো একটি দেশে উৎপাদন ব্যাহত হলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে না।
বিজিএমই–এর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্টের এএমডি মহিউদ্দিন রুবেল চরচাকে বলেন, “জ্বালানি সংকট আমাদের আগেও ছিল, এখনো আছে। এটা নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমানে সংকটটা একটু বেড়েছে। সরকার হয়তো কিছুদিনের মধ্যে ঠিক করে ফেলবে। আমরা চাইব, সরকার যেন ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে কাজ করে, যাতে আর এমন সংকট না হয়।”
তবে চীনের হারানো ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছে না কেন, এর কারণ হিসেবে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশ সাধারণত ট্রাডিশনাল কটনবেজড পোশাক তৈরি করে। আর চীন এগিয়ে ম্যানমেইড ফাইবারে। তাই চীনের ছুটে যাওয়া ক্রয়াদেশ আমাদের দেশে আসছে না। সেগুলো চলে যাচ্ছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায়। কারণ, এই দেশ দুটি ম্যানমেইড ফাইবারে তৈরি পোশাক উৎপাদনে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।”
বাংলাদেশের এখনো সুযোগ আছে?
এই খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীনের বাজারের অংশ কমে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এখনো একটি বড় সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, লিড টাইম কমানো, ব্যাংকিং ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা এবং উচ্চমূল্যের ম্যানমেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। তা না হলে, চীনের ছেড়ে দেওয়া বাজারের বড় অংশ ভবিষ্যতেও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যাবে।
পোশাক ছেড়ে আরও বড় শিল্পে চোখ চীনের?
বিশ্বের শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে চীন এখন আরও উচ্চমূল্যের শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যান, উন্নত প্রযুক্তি পণ্য ও উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছে দেশটি।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাই মাসে চীনের মোট রপ্তানি ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির বেশির ভাগই এসেছে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য থেকে। বছরের প্রথম সাত মাসে সেমিকন্ডাক্টরের রপ্তানি অর্থমূল্যের হিসাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং সামগ্রিক উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।
এর বিপরীতে খেলনা ও সিরামিকের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন খাতে রপ্তানি কমেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) অবকাঠামো নির্মাণের বৈশ্বিক চাহিদা চীনের নতুন রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। তাই কম দামি পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেশি দামি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ করছে বেইজিং।