গণঅভ্যূত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। জনমনে আশা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার এলে আইনশৃঙ্খলার অবস্থার উন্নতি ঘটবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ওয়েবসাইটে দেওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই) মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৩৪টি– এর মধ্যে ৫০টি হয়েছে রাজধানীতে। ৪০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এদের মধ্যে ৩৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৩৫ জন। ধর্মীয় ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ৩২টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৩ জন। গুমের শিকার হয়েছেন একজন।
এ ছাড়াও ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম ডাটার তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ১৫০টি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৯৪ জন।
তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের সঙ্গে যে তুলনা টানা হচ্ছে, সে সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তথ্য কি বলছে?
গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আসকের অপরাধের পরিসংখ্যানবিষয়ক তথ্য বলছে, মব সহিংসতা হয়েছে ১০৯টি, এর মধ্য ঢাকাতে হয়েছে ৩৬টি। ২১০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এদের মধ্যে ১৪ জনেক ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৪৪০ শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটনায় ১৯০ শিশুকে হত্যা করা হয়।
তবে কোনো গুমের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ৩৯টি হামলার ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন। রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৩৫জন। ডিএমপির তথ্য মতে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ২০৫টি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ১৩৭ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের লোগো।
অর্থাৎ, আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখলে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে মব সহিংসতা, শিশু হত্যা, রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন বেড়ে গেছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে দেখতে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি যতটুকু আমরা আশা করেছিলাম, ততটুক হয় নাই। এখনো পুলিশের স্বাভাবিক যে কার্যক্রম, তা ফিরে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই মবের শিকার হচ্ছে। মানুষও তো পুলিশের প্রতি একটা সভ্য দেশে যে ধরনের আচরণ করা উচিত, তা করছে না। এর কারণ পুলিশের কিছু দুর্বলতা আছে। এমনও কথা উঠছে যে, এই সুযোগে দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তারা মামলা বাণিজ্য করছেন। এগুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পুলিশ রিফর্মের কথাও বলতে চাই, সেটারও কোনো অগ্রগতি হয়নি।”
ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা এখনো বিদ্যমান থাকা মব সহিংসতার পেছনে বড় কারণ। চরচাকে তিনি বলেন, “গত কয়েকদিনে তো দেখেছি, ঢাকা শহরসহ সারা দেশে মব ভায়োলেন্সের ভিকটিম অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ লোকজন হচ্ছে, যারা রাজনীতির সাথে কোনোভাবে জড়িত নয়। মবের যে ভিকটিম হচ্ছে, সন্ত্রাস দমন আইনে আবার তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সে যথাযথ জাস্টিস পাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই মব কঠোরভাবে দমন করতে হবে।”
চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এসবের জন্য বেকারত্বকে দায়ী করে ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, “অনেক সময় দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব একজন মানুষকে অপরাধীতে পরিণত করতে পারে। বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংগুলো তৈরি হচ্ছে, কারণ, তাদের সামনে জীবনে কোনো আশা নাই। বেকারত্ব দূর করার কথা সরকারকে ভাবতে হবে।”
র্যাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করতাম, দেয়ার ইজ আ স্ট্রং কাউন্টার-টেররিজম… এই ধরনের ফোর্স যা পৃথিবীর সব দেশে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে র্যাবের নামে যা হয়েছে—সেনাবাহিনী, আর্মি, নৌবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার, ভিডিপি সব নিয়ে যে একটা জগাখিচুড়ি বানানো হয়েছিল, আমি সব সময় এটার বিরুদ্ধে ছিলাম। র্যাবের নাম বদল হয়েছে, যেটার কোনো দরকার ছিল না। দরকার র্যাবের ওপর তদারকি সংস্থা, সেটাতেও অগ্রগতি হয়নি।”
মবের প্রতীকী ছবি। ছবি: চরচা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ফাহিন রহমান অঙ্কিতা অবশ্য মনে করেন, আগের তুলনায় আইন প্রয়োগের বিষয়টা জোরদার হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পার্থক্য না হওয়ার পেছনে জনগনের পুলিশের প্রতি আস্থা না থাকাকে কারণ বলে মনে করেন তিনি। “যার জন্য পুলিশ ফোর্স হোক বা অন্য সংস্থায় বড় গ্যাপ এখনো দেখতে পাচ্ছি। পুলিশের এখনো জব সিকিউরিটি থেকে শুরু করে পাবলিক ট্রাস্ট খুবই কম, তাদের হতাশা অনেক বেশি। যার জন্য অপরাধ যে দমন করবে, তার কোনো উন্নতি হয়নি। যার ফলে ধীরে ধীরে লং টার্ম আসলে অবনতির দিকেই আমরা এগোচ্ছি”– বলেন ফাহিন রহমান অঙ্কিতা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোতে সংস্কার ঠিকমতো হলে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে বলে মনে করেন ফাহিন রহমা অঙ্কিতা। চরচাকে তিনি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হয়নি। সমস্যাগুলো সমাধানে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গভর্নমেন্ট চেঞ্জ করার সাথে আসলে এতগুলো যে রিফর্ম কমিশন হয়েছে, সেই রিফর্ম কমিশনগুলোর যে রিপোর্ট হয়েছে, সেগুলোর এক্সিকিউশন বা ইমপ্লিমেন্টেশন কিন্তু এখনো করা সম্ভব হয়নি। তাই পার্থক্যটা আসলে দেখা যাবে যখন আমরা সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারি।”
মবের কারণ হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াকেই কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, “মব ভায়োলেন্স আসলে তখনই হয়, যখন আমরা মব ভায়োলেন্সকে নির্ধারণ করতে পারি না। মব করলেও সবাই পার পেয়ে যাচ্ছে। তখন এটা কমিয়ে আনা কঠিন হয়ে যায়। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভরসা করতে না পারাটাও মবের কারণ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকের বক্তব্য, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পুলিশ ফোর্সের উপর পাবলিকের ট্রাস্ট বাড়ানো। এবং আমাদের যেসব এক্সিস্টিং কেসগুলো আছে, সেই কেসগুলোকে প্রপারলি ইনভেস্টিগেট করা।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে দেশে বিনিয়োগের– বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের– সংকট হবে বলে মনে করেন ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, “বড় বড় ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা পড়ে আছে, দেওয়ার মতো লোক নাই। কারণ লোক ইনভেস্ট যে করবে, সেই সাহস তো তাদের নাই। এই অলস টাকা যে ব্যাংকে পড়ে আছে, যারা টাকা জমা রেখেছে, তাদের লাভসহ একদিন তো সেটা ফেরত দিতে হবে। কিন্তু এখন যদি লোন না নেয়, সেটা ব্যাংক কীভাবে ফেরত দেবে? তাই এটা বহুমুখী সমস্যা। আর এই সমস্যা আসছে নিরাপত্তার অভাবের কারণে।”
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির চরচাকে বলেন, “দেশে হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন কমাতে হলে শুধু অপরাধের পর শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না, অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্র ও সমাজ– দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কী কী করা উচিত, সে ব্যাপারে আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, “একজন নাগরিকের দৃষ্টিতে, এ সকল অপরাধের ক্ষেত্রে প্রতিকারের প্রথম দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ, দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব, অর্থ কিংবা ক্ষমতার কারণে কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তারও স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।”
তবে শুধু সরকারের ওপরই সব দায়িত্ব ঠেলে দিলে সমাধান আসবে না। সে কারণে সামাজিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী, “…অন্যদিকে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সহনশীলতা, সমতা ও মানবিক মর্যাদার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীলভাবে ঘটনা তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত নিরাপদ সমাজ গড়তে অপরাধের শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং সর্বোপরি প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।”