আপনি যদি বিরোধী দলের কাউকে জিজ্ঞেস করেন, বিএনপি সরকার কেমন দেশ চালাচ্ছে, নিশ্চিতভাবে তিনি বলবেন, “খুব খারাপ। সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি। জনজীবনে সংকট আরও ঘনীভুত হয়েছে।”
আর যদি সরকার সমর্থক কারও কাছে একই প্রশ্ন করেন, তিনি বলবেন, “খুবই ভালো। গত ৬ মাসে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, গত ৫৫ বছরেও তা হয়নি।”
যে দেশে কোনো বিষয়েই দুই ব্যক্তি একমত হতে পারেন না সে দেশে এ রকম পরস্পরবিরোধী মত পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের বিশ্লেষণের আগে, একটা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। চলমান জ্বালানি সংকট তথা বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের জন্য যে জনগণ কষ্ট পাচ্ছে সে জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে বিরোধী দলের কাছে ৩-৬ মাসের মধ্যে জ্বালানি সংকট সমাধানে কোনো পরিকল্পনা থাকলে সেটিও গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
অতীতে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, তারা সমস্ত ব্যর্থতার দায় বরাবর অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেটি করেননি। দায় স্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সহযোগিতা চাওয়ার পাশাপাশি তীর্যক মন্তব্যও করেছেন। তার ভাষায়, “বিরোধী দলের বন্ধুরা ক্ষমতায় থাকতে তৃতীয় টার্মিনাল বসানোর কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। বিরোধী দলের বন্ধুদের হটকারিতার জন্য হামের টিকা কেনা বন্ধ ছিল এবং এবারে হামের প্রকোপে ৯ শতাধিক শিশু মারা গেছে।”
এই দায় তারা কীভাবে এড়াবেন?
এবারে দেখা যাক বিএনপি সরকারের ১৮০দিনের (৬ মাস) কর্মসূচি কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, আর কতটা হয়নি। তাদের প্রথম প্রতিশ্রতি ছিল
• বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা। এক্ষেত্রে তারা কিছুটা হলেও সফলতা দেখিয়েছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে পেরেছে; যদিও এখনো তা ‘বিপৎসীমার’ ওপরে আছে। অন্যদিকে সরকার দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটা অধরাই রয়ে গেছে।
• সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি (বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওয়াদাও পূরণ করতে পারেনি কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থার কারণে। কিন্তু আইনশৃ্ঙ্খলার ক্ষেত্রে সেটা খাটে না। এ জন্য সরকারকে যতটা কঠোর হওয়া দরকার তা হতে পারেনি। একশ্রেণির দলীয় নেতা–কর্মীদের বেপরোয়া আচরণের কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি।
• ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী (যার মধ্যে ৮০% নারী) এবং ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলেও কবে নাগাদ শেষ হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালিসিস সেন্টার স্থাপনের কাজেও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন স্থানে হাসপাতালের আসন সংখ্যা বাড়ানো ভালো উদ্যোগ বলেই মনে করি।
• কৃষক কার্ড: পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে প্রাথমিকভাবে ২২ হাজার কৃষকের মাঝে কৃষক কার্ড চালুর প্রকল্প এবং পর্যায়ক্রমে দেশের ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন, এই পর্যায়ক্রমটা কবে শেষ হবে। যেই এলাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে, সেই এলাকার কৃষকেরা বঞ্চিতই থাকবেন। ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে দেশব্যাপী খাল খননের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে সরকার। কিন্তু সেই খালে পানি আসার নিশ্চয়তা কতটা আছে, সেই প্রশ্নও উঠবে।
• শূন্য পদে নিয়োগের জন্য বড় আকারে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার (প্রথম ধাপে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার ৮৭৯ জনসহ মোট ৫ লাখ কর্মী নিয়োগের কথা বলেছে তারা। এটা কতদিনে শেষ হবে?
• ৫ লাখ কর্মী নিয়োগ করতে তো আরও ৫ লাখ কর্মী অবসরে যাবেন। মূল কথা হলো সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ সমুদ্র গোষ্পদতুল্য হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে অন্তত ৩ কোটি কর্মক্ষম নারী পুরুষ বেকার আছেন এবং প্রতি বছর আরও ২৪ থেকে ২৫ লাখ তরুণ নতুন করে কর্মবাজারে প্রবেশ করছে।
লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান করা যাবে তখনই যখন নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। নতুন বিনিয়োগ আসবে। এই মুহূর্ত চালু কারখানাই বন্ধ রাখতে হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে।
• এর বাইরে সরকারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে আছে: শিক্ষার্থী ভিসা ঋণ: ভাষা শিখতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা (বিশেষ করে জাপানে গমনেচ্ছুদের জন্য প্রসেস সহজ করা)। ক্রীড়া ভাতা: জাতীয় ক্রীড়াবিদদের বেতনের কাঠামোর আওতায় এনে ‘স্পোর্টস অ্যালাউন্স’ চালু করা; প্রথম ধাপে ১২৯ জন আন্তর্জাতিকভাবে সফল অ্যাথলেটকে এই সুবিধা প্রদান।
• ফ্রিল্যান্সিং ও পেপাল হাই-টেক পার্ক, সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর আধুনিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাংলাদেশে দ্রুত পেপাল সেবা চালুর জন্য কার্যকর কমিটি গঠন। এসব কর্মসূচিও চলমান আছে।
• পরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা আনার কথা বলা হয়েছে। যানজট নিরসন: ট্রাফিক জট নিরসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল কিছুটা কাজেও এসেছে। কিন্তু কমিউটার ট্রেন সার্ভিস বাড়ানো ও সমন্বিত বাস সেবা শুরু করা যায়নি। এ ছাড়া গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, হত্যা ও নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের উল্লিখিত কর্মসূচির কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘না ধরা, না ছোঁয়া’ স্তরে আছে। পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেমে আছে নানা কারণে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বেঁধে যায় এবং জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। বলা যায়, সরকার শুরুতেই হোঁচট খায়। তেলের পাম্পে গাড়ির লম্বা লাইন। সম্প্রতি তেলের জায়গা দখল করেছে গ্যাস। বাসা বাড়িতে তীব্র সংকটের পাশাপাশি পাম্পস্টেশনগুলোতে গ্যাস মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বাসা বাড়িতেও মানুষ প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ ছিল কর্মসংস্থানের অভাব। মেধাবীরা ভালো পরীক্ষা দিয়েও চাকরি পেতেন না কোটা থাকার কারণে। কিন্তু গত দুই বছরে নতুন কর্মসংস্থান না হওয়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। শহরাঞ্চলে আইনশৃঙখলার অবনতির অন্যতম কারণ বেকারত্ব। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ আরও নতুন যেসব কার্ড চালু করেছে, তার সুফল জনগণ পেতে শুরু করেছে, যদিও কোথাও কোথাও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা এখনো পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। তবে ট্রাফিক সিগনালে এ আই ব্যবহারের কারণে যানজট কিছুটা কমেছে।
বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্র্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফর, বাংলাদেশে বিনিয়োগে মার্কিন ব্যবসায়ীদের আগ্রহ সরকারের সাফল্য হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে মস্ত বড় ফাঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে, তারা বলেছে ৩ লাখ নেবে। এর আগেও কথা দিয়ে রাখেনি মিয়ানমার। অন্তর্বতী সরকারের আমলে সই করা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন দূর না হলে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান আরও কঠিন হবে।
সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে ভয়ভীতি কমলেও স্বস্তির আবহ ফিরে এসেছে বলা যাবে না। আইনি, অ–আইনি অনেক বাধা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বাধা সাংবাদিকদের চাকরি ও বেতনভাতার অনিশ্চয়তা। আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অলীক কল্পনা মাত্র।
ছয় মাস বয়সী বিএনপি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিরোধীদের আস্থায় নিয়ে আসা। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা ৩১ দফার অধিকাংশ বাস্তবায়ন ও সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা বললেও বিরোধী দল কোনোভাবে তার সঙ্গে একমত হতে পারছে না। গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে তাদের অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে। ধারণা করা হয়, সরকার বিরোধী দলকে আস্থায় না আনতে পারলে সংঘাতের রাজনীতির পুনাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকারের ছয় মাসকে সমালোচকেরা গ্লাসের অর্ধেক খালি ও সমর্থকেরা অর্ধেক পূর্ণ হিসেবে দেখতে চাইবে। এখন সরকারের দায়িত্ব হবে খালি অংশটুকু পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায় পূর্ণ অংশ কমতে থাকবে এবং খালি অংশ বাড়তে থাকবে।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা