স্বাক্ষরতার হার বাড়ানো, স্কুল থেকে ঝরে পড়া কমানো এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা, মোজা ও ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা যাচাই করতে একটি পাইলট প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে।
গত ২৯ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে এক ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, “পাইলট প্রকল্পের আওতায় শুরুতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে এক সেট করে স্কুল ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ দেওয়া হবে। সক্ষমতা বাড়লে তা বছরে দুই সেটে উন্নীত করা হবে। শুরুতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষার্থীদেরও এর আওতায় আনা হবে।”
প্রকল্পে কি আছে?
পাইলট প্রকল্পের আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ করা হবে। প্রতিটি উপজেলার দুটি করে বিদ্যালয়কে এ প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে। মেয়েদের জন্য আকাশি রঙের ফ্রক বা টিউনিক এবং ছেলেদের জন্য হালকা নীল জামা ও গাঢ় নীল হাফ প্যান্ট দেওয়া হবে। এর সঙ্গে থাকবে জুতা, মোজা ও পাটের তৈরি ব্যাগ।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ছবি: সংগৃহীত
এই পাইলট প্রকল্পে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য পোশাক, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহ করবে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। পাইলট প্রকল্পে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষার্থীদেরও এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় থাকা ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫)’-এর আটটি কর্মসূচির একটি হলো স্কুল ড্রেস, ব্যাগ, জুতা ও মোজা প্রদান। পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ব্যয় করবে ৩৩ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে সাত হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা।
তবে ইউনিফর্ম, ব্যাগ, জুতা ও মোজা বিতরণ খাতে ঠিক কত টাকা ব্যয় হবে, তা প্রকল্পের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়নি। প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মনোয়ারা ইসরাত এ বিষয়ে চরচাকে বলেন, “আমরা এখনও কোনো দাম ঠিক করিনি। প্রকল্প শুরু হলে বুঝতে পারব ড্রেসপ্রতি কত টাকা ব্যয় হয়।”
মাধ্যমিকেও পোশাক-জুতা-ব্যাগ
একইভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকেও শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ দেওয়ার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘কমবাইন্ড স্টুডেন্টস ফ্যাসিলিটিস প্রোগ্রাম ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ নামের এ প্রকল্পটি মাউশি হাতে নিয়েছে। এর আওতায় পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের প্রতি বছরে ড্রেস, জুতা, মোজা ও ব্যাগের পাশাপাশি খাবার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। ছবি: বাসস
এছাড়া, শিক্ষার্থীদের বিশ্রামের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আলাদা দুটি কমন রুম, স্বাস্থ্য উপকরণ এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাবে অনগ্রসর শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন সংযোজনের প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির বিষয়ে চরচাকে নিশ্চিত করেছে মাউশি। প্রস্তাবিত প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫০২ কোটি টাকা। তবে মাউশির এ প্রকল্পের ব্যয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি কেবল প্রস্তাবিত ব্যয়। প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই এ খাতে প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন।
টিফিন বা মিড ডে মিল নিয়ে বিতর্ক
এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড ডে মিলের খাবারের তালিকায় রয়েছে- বনরুটি, বিস্কুট, কলা, সেদ্ধ ডিম ও দুধ। এই মিড ডে মিল নিয়ে এরই মধ্যে কিছু বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যেমন, গত ১৮ মে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ নরসিংদী শহরের বাসাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে মিড ডে মিলে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার দেওয়ার বিষয়টি দেখতে পান। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ বনরুটিতে গন্ধ সন্দেহজনক হওয়ায় দুটি স্যাম্পল ঢাকার ল্যাবে টেস্টের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। গত ১ জুলাই মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলে ‘পচা’ ডিম পাওয়ার খবর মেলে।
তবে সরকারের স্কুল ড্রেস ও মিড ডে মিলের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান। তার মতে, প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী অভুক্ত অবস্থায় স্কুলে আসে। তাদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া গেলে এবং তারা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি বাড়তে পারে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান। আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অলরেডি আপনারা পত্রপত্রিকায় দেখেছেন, অনেক জায়গায় খাবারের মান খুব খারাপ।”
শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে, নাকি সরকারি ব্যয়?
স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে সরকারের এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, কোনো আগাম গবেষণা বা প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফলের তুলনায় সরকারের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম মনে করেন, শুধু স্কুল ড্রেস পেলেই শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যাবে এমন প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কার্যকর কারিকুলাম, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম চরচাকে বলেন, “বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের যে পোশাক দেওয়া হবে, তা জনগণের ট্যাক্সের টাকা। এই টাকা খরচ করার আগে সরকারকে বুঝতে হবে, এই সিদ্ধান্ত কতটা কাজে দেবে। প্রথমত, দেশে কোনো দুর্ভিক্ষ কিংবা সংকট চলছে না যে খাদ্য, বস্ত্রের ব্যবস্থা সরকারি খাত থেকে করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব শিক্ষার্থীর পরিবার অসচ্ছল নয়। জনগণের করের টাকা, যার সামর্থ্য আছে তার পেছনে খরচ করা স্মার্ট পাবলিক পলিসি হতে পারে না।”
তিনি বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এ খাতে লুটপাটের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। বাজারে বিভিন্ন দামের স্কুল ড্রেসের কাপড় পাওয়া যায়। একেবারে কম দামের পলিস্টারের কাপড়ও পাওয়া যায়। এসব কাপড় গায়ে দিলে আরামের বদলে অস্বস্তি হতে পারে। বাংলাদেশের ঠিকাদারদের লাভ করার যে মানসিকতা, তাতে দেখা যেতে পারে নিম্নমানের কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে শুধু ঠিকাদারের মুনাফাই নিশ্চিত হবে। বাচ্চারা আর সেই পোশাক পরবে না।”
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন মনে করেন, সামর্থ্য, আরাম ও রুচির সঙ্গে সম্পর্ক আছে পোশাকের। কোনো অভিভাবকের সরকারি সরবরাহ করা পোশাক পছন্দ না হলে তিনি সন্তানের জন্য নিজের পছন্দের পোশাক তৈরি করে দিতে পারেন। এতে সরকারের দেওয়া পোশাকের অপচয় হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন, “এসবের পরিবর্তে আধুনিক শ্রেণিকক্ষের কথা ভাবলে, বরং বেশি ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।”
ইউনিফর্মের বরাদ্দের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ফজলুর রহমান। তার মতে, এ খাতে যেন অপচয় না হয়, সরকারকে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এই অধ্যাপক বলেন, “যদি বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার গরিব শিশু ভালো ড্রেস পরে স্কুলে আসতে পারে, সেটি ভালো হবে। কিন্তু কোনোভাবেই আমাদের মতো দরিদ্র দেশের টাকা অন্যদের হাতে গিয়ে যাতে নষ্ট না হয়। আমাদের দেশে সবসময় বড় সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন। অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ আমরা নিই, কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে দুর্নীতির কারণে তা ব্যর্থ হয়ে যায়।”
বিশ্লেষকেরা তাই বলছেন, শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে পোশাক, জুতা, ব্যাগ কিংবা খাবার সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার মান, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট, দারিদ্র্য, সামাজিক সচেতনতা এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সমাধানে গুরুত্ব না দিলে শুধু উপকরণ বিতরণ করে স্কুলে উপস্থিতি বা ঝরে পড়ার হার কতটা কমানো যাবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।