একসময় তরুণদের সমর্থনই বেশি ছিল তার পক্ষে। অথচ এখন সেই তরুণেরাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের দিক থেকে। তবে কি বিপদে পড়তে চলেছে মেলোনির সরকার?
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের প্রতি তরুণ ভোটারদের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা তার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তরুণদের জন্য সুযোগ বাড়াতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মেলোনি তেমন কোনো পদক্ষেপ নেননি। এর বিপরীতে তিনি আইনশৃঙ্খলা জোরদারের নামে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার অনেকগুলোই তরুণদের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সরকারের প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা ২০২৭ সালের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ওই নির্বাচনে মেলোনির ডানপন্থী জোট ও মধ্য-বামপন্থী বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
জনমত জরিপ সংস্থা ইউট্রেন্ডের প্রধান লোরেঞ্জো প্রেগলিয়াসকো রয়টার্সকে বলেন, “তরুণ ভোটাররা স্পষ্টভাবেই মধ্য-বামপন্থীদের দিকে ঝুঁকছেন।”
মেলোনির জোটে রয়েছে তার দল ব্রাদার্স অব ইতালি (এফডিআই), মাত্তেও সালভিনির লিগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির তুলনামূলক মধ্যপন্থী দল ফোরজা ইতালিয়া। প্রেগলিয়াসকো বলেন, ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে এই জোটের সমর্থন এখন ৩০ শতাংশেরও কম।
এর বিপরীতে একই বয়সী ভোটারদের মধ্যে বিরোধী জোটের সমর্থন প্রায় ৫০ শতাংশ। এই জোটে প্রধানত রয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডি), ফাইভ-স্টার মুভমেন্ট এবং লেফট-গ্রিন অ্যালায়েন্স (এভিএস)।
২০২৩ সালে মেলোনির জনপ্রিয়তা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল, তখন ইউট্রেন্ডের জরিপে দেখা গিয়েছিল, শুধু তার দলই তরুণদের মধ্যে এখনকার পুরো ক্ষমতাসীন জোটের সমান সমর্থন পেয়েছিল।
ইউরোপের অন্য দেশের মতো ইতালিতেও তরুণ ভোটারদের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। গত বছর মিলানের বোক্কোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়, জরিপ সংস্থা এসডব্লিউজির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরুষেরা ডানপন্থীদের দিকে বেশি ঝুঁকছেন এবং নারীরা বামপন্থীদের বেশি সমর্থন করছেন।
দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় মেলোনির এফডিআইয়ের সমর্থনে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে দলটির সমর্থন ১৫ শতাংশ, যেখানে নারীদের মধ্যে তা মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে ফাইভ-স্টার মুভমেন্টের সমর্থন ১৮ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের মধ্যে তা মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ।
তরুণদের সুযোগ বাড়াতে সংস্কারের অভাব
রোমের লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক লোরেঞ্জো দে সিও বলেন, সরকারের প্রতি তরুণদের বিরূপ মনোভাবের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক নীতিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা। তিনি বলেন, “মেলোনি কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সংস্কার করেননি। আপনি যদি বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হন, তাহলে এটি ঠিক আছে। কিন্তু যারা এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে কম সুরক্ষিত, তাদের জন্য—যার মধ্যে প্রায়ই তরুণরা পড়েন—এটি খুবই খারাপ।”
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দিতে মেলোনির কার্যালয় অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের কর্মসংস্থানের হার ২১ দেশের ইউরোজোনের মধ্যে ইতালিতেই সবচেয়ে কম। একই সঙ্গে এই জোটের প্রায় সব অংশীদার দেশের তুলনায় ইতালি শিক্ষাক্ষেত্রে কম বিনিয়োগ করে।
ব্যাংক অব ইতালির তথ্য অনুযায়ী, জার্মানিতে একজন তরুণ স্নাতক গড়ে একজন ইতালীয় সমবয়সী স্নাতকের চেয়ে ৮০ শতাংশ বেশি আয় করে। উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধানে প্রতি বছর কয়েক হাজার তরুণ ইতালীয়ও দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
ইউট্রেন্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মেলোনি সরকারের অনুমোদনের হার মাত্র ২৫ শতাংশ, যেখানে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা ৩৫ শতাংশ।
মেলোনি তার নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরের অবশিষ্ট তরুণ ভোটারদের নিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চি ফেব্রুয়ারিতে গড়ে তোলা কট্টর ডানপন্থী বিরোধী দল ন্যাশনাল ফিউচার ইতিমধ্যে জনমত জরিপে প্রায় ৭ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছে।
জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দলটির সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থন মধ্যবয়সী পুরুষদের মধ্যে। তবে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবাপন্ন শহুরে তরুণদের মধ্যেও ভান্নাচ্চির উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। তাদের কাছে তার এমন প্রতিশ্রুতি জনপ্রিয় যে, হাজার হাজার অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রেগলিয়াসকো বলেন, “ক্ষমতাসীন দলগুলোর তুলনায় ভান্নাচ্চি তরুণ ভোটারদের মধ্যে নিঃসন্দেহে ভালো অবস্থানে আছেন।”
আইনশৃঙ্খলা জোরদারে কঠোর পদক্ষেপ
সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক পদক্ষেপে বন্দি থেকে অভিবাসী পর্যন্ত বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রভাবিত হয়েছে। তবে তরুণেরাই প্রায়ই এসব পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে পড়েছে।
চার বছর আগে মেলোনির প্রথম আইনগত ডিক্রিতে রেভ পার্টির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পর সরকার পরবর্তী সময়ে তথাকথিত ‘লাইট’ ক্যানাবিস উৎপাদন, বিক্ষোভ, অবৈধভাবে ভবন দখল এবং কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে দেশব্যাপী ‘নো মেলোনি ডে’ নামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। তারা নিরাপত্তা আইন, শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানো এবং গাজায় ইসরায়েলের প্রতি মেলোনির সমর্থনের প্রতিবাদ করেন।
সরকারের সর্বশেষ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো, গত মাসে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার নিয়ম পরিবর্তনের জন্য একটি বিল উত্থাপন করা।
১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ অপরাধ করলে তাকে পুরোপুরি দায়ী হিসেবে বিবেচনা করা হবে, যদি না প্রমাণিত হয় যে সে নিজের কাজের পরিণতি বুঝতে পারেনি। এটি বর্তমান ব্যবস্থার বিপরীত, যেখানে একজন বিচারককে প্রমাণ করতে হয় যে ওই কিশোর তার কাজের পরিণতি বুঝতে পেরেছিল।
বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অ্যান্টিগোনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের একটি ডিক্রিতে কিশোরদের অপরাধের শাস্তি কঠোর করার পর কিশোর কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, কিশোরদের অপরাধের জন্য পুরোপুরি দায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারের আরেকটি পদক্ষেপের অধীনে স্কুলে তাদের বাবা-মায়ের লিখিত অনুমতি ছাড়া যৌনশিক্ষা দেওয়া যাবে না।
গণভোটে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা
তরুণদের আকৃষ্ট করতে মেলোনির ব্যর্থতা এতদিন অনেকটা আড়ালেই ছিল, কারণ তরুণদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি সাধারণত কম।
সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে ভোট দিয়ে সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে ৩৫ বছরের কম বয়সী অনেকেই ভোট না দেওয়ার পথ বেছে নেন।
তবে মার্চে মেলোনির সমর্থিত বিচারব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে হঠাৎ এই প্রবণতার পরিবর্তন দেখা যায়।
৩৫ বছরের কম বয়সীদের প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোট দেয় এবং তাদের ৬০ শতাংশ সংস্কারটির বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এর বিপরীতে, সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯ শতাংশ এবং তাদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ ‘না’ ভোট দেয়।
রোমের লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক লোরেঞ্জো দে সিও তাই বলছেন, “গণভোট দেখিয়ে দিয়েছে, তরুণেরা ব্যাপকভাবে ভোট দিলে তাদের কী ধরনের প্রভাব থাকতে পারে। পরবর্তী নির্বাচনে তারা নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।”