পাঁচ বছর আগে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি কিন্তু বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেননি। চাইলে আফগানিস্তানের ত্রুটিপূর্ণ হলেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে রক্ষা করতে পারত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তারা তা করেনি।
কারণ, তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গিয়ে সাধারণ মানুষ অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পও আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা ঠিক করে দিয়েছিলেন। পরে বাইডেন পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করেন।
মার্কিন সেনারা চলে যাবে–এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আফগানিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বুঝতে শুরু করে যে শেষ পর্যন্ত কারা যুদ্ধে জিততে পারে। অনেক নেতাই তখন পক্ষ বদল করেন। সরকারি সেনারাও নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকেন। ফলে আফগান সরকার খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে।
এরপর প্রায় কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান ক্ষমতা দখল করে নেয়। নতুন শাসকদের ভয়ে অনেক সাধারণ মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। তাদেরই কয়েকজন পালিয়ে যাওয়ার সময় একটি মার্কিন বিমানের চাকার সঙ্গে ঝুলে পড়েছিলেন। বিমানটি উড়ে যাওয়ার পর তারা নিচে পড়ে মারা যান।
তালেবান শব্দের অর্থ ‘ধর্মীয় ছাত্র’। তারা প্রথমবার ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। এরপর ইসলামপন্থী ও প্রাচীন আমলের কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়। মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সমকামীদের পাথর ছুড়ে হত্যার মতো কঠোর শাস্তিও দেওয়া হতো।
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিজের অনুগত একটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করেছেন। ছবি: রয়টার্স
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে ছিনতাই করা বিমান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদাকে তালেবান আশ্রয় দিয়েছিল। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এরপর তালেবান যোদ্ধারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। বিচারক, পুলিশ এবং সরকারের সঙ্গে কাজ করছে–এমন সন্দেহ করা ব্যক্তিদের তারা হত্যা করতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেন, তখন দেশ গড়ার দুই দশকের মার্কিন চেষ্টা চরম ব্যর্থতা ও অপমানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপে অন্য দেশগুলোও তখন বুঝে নেয়, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের পাশে কতটা সময় পর্যন্ত থাকবে। এর ছয় মাস পরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে হামলা চালান। এই ঘটনার পাঁচ বছর পেরিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই আফগানিস্তানকে ভুলে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি ভুল। আফগানিস্তানকে উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে দেশটি আবারও বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে আফগান জনগণের দুর্ভোগও আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দেশটি চীন বা রাশিয়ার প্রভাব বলয়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে।
সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টের এক সংবাদদাতা আফগানিস্তানের ভেতরে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করেছেন। তার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালেবান এখন দেশটির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ ছাড়া দেশটিতে মোটামুটি শান্ত পরিস্থিতি রয়েছে। তবে এই শান্তি খুবই কঠিন ও অন্ধকার বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশটিতে গান নিষিদ্ধ। রাস্তায় সশস্ত্র তালেবান সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ। তালেবানের ‘সৎকাজ ও অসৎকাজ প্রতিরোধ’ পুলিশ বিভিন্ন কারণে মানুষকে মারধর করে। যেমন–কোনো পুরুষের দাড়ি যথেষ্ট বড় না হলে তাকেও শাস্তি দেওয়া হয়।
নারীদের কর্মস্থলে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ নিষিদ্ধ। মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনাও বন্ধ। এখন বাল্যবিবাহের সুযোগ থাকায় অনেক মেয়েকে স্কুল থেকে সরাসরি বিয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
এসব কারণে আফগানদের জীবন কতটা দরিদ্র, অসুস্থ ও কষ্টকর হয়ে উঠেছে, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। কারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা তালেবানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, অধিকাংশ আফগানই আরও স্বাধীন জীবন চান। এমনকি তালেবানের অনেক সদস্যও বছরের পর বছর বিদেশে থাকার পর এখন আর মনে করেন না যে মেয়েরা পড়াশোনা করলে বড় কোনো বিপদ হবে। কিন্তু তালেবানের কট্টরপন্থীরা কঠোরভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিজের অনুগত একটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি লাভজনক খনি ব্যবসার চুক্তিও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। তালেবানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী নেতারা তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী নন, আবার অনেকেই ভয়ে কিছু বলতে পারেন না। যারা তাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের কয়েকজনকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তালেবান সরকারকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে। তারা তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, বিদেশে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ আটকে দিয়েছে এবং তালেবান কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু এতে তেমন কোনো ফল হয়নি। পশ্চিমা কূটনীতিক ও বিনিয়োগকারীরা দূরে থাকলেও তা নিয়ে তালেবানের কট্টরপন্থীরা খুব একটা চিন্তা করে না। পুরনো সরকারের সম্পদ ফিরে পাওয়ার জন্যও তারা নিজেদের মতাদর্শ বদলাবে না। তাই পশ্চিমা দেশগুলোর এখন নতুন কৌশল নেওয়া দরকার বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এর জন্য প্রথমে কিছু কঠিন বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। প্রথমত, তালেবান সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা দেশগুলো যদি তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ না করে, তাহলে অন্য দেশগুলো করবে।
আফগানদের জীবন কতটা দরিদ্র, অসুস্থ ও কষ্টকর হয়ে উঠেছে, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। ছবি: রয়টার্স
রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীন, ভারত, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও খনি ও বাণিজ্যের মতো বিভিন্ন বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে কাজ করছে।
তালেবানের কারণে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কেও নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কারণ পাকিস্তান আশঙ্কা করছে, দিল্লি ও কাবুলের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে ভারত ও আফগানিস্তান–দুই দেশের মাঝখানে পাকিস্তান চাপের মধ্যে পড়ে যাবে।
দ্য ইকোনমিস্টের তথ্য বলছে, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও এখন কিছুটা বাস্তববাদী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো বলছে, তালেবান সরকারকে গ্রহণ করা যায় না। তবে জুন মাসে তারা ব্রাসেলসে তালেবান কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে আফগান অভিবাসী ও যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন বাতিল হয়েছে, তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে আলোচনা হয়।
তাছাড়া আরও কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নীরবে তালেবানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যও বিনিময় করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানের সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে যোগাযোগ রাখা যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। তবে সুইজারল্যান্ডে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এখনই ছাড়ার সময় হয়নি। কারণ এই অর্থ তালেবান নেতা ও তার সরকারকে শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হতে পারে।
তবে মানবিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার নীতি পশ্চিমা দেশগুলোর বন্ধ করা উচিত। ২০২২ সালের পর আফগানিস্তানে এই সহায়তা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন এই সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কাজ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা দেশটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দুর্ভিক্ষ, অস্থিরতা বা ত্রাণসামগ্রী চুরি হওয়ার মতো বড় সমস্যা আগেভাগে জানাতে পারে।
বিশ্লেষকদের পরামর্শ, দ্বিতীয় পদক্ষেপ হতে পারে নিষেধাজ্ঞার নিয়ম পরিবর্তন করা। বহু বছর আগে সন্ত্রাসী হিসেবে যেসব তালেবান নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন আফগানিস্তানের মন্ত্রী। এর ফলে উল্টো আফগানিস্তানের পুরো অর্থনীতি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগও কমে গেছে।
পশ্চিমা কোম্পানিগুলো আফগানিস্তানে কোনো ধরনের ব্যবসা করতে ভয় পায়। কারণ, এতে তারা সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী আইন ভঙ্গ করার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব নিয়ম কিছুটা পরিবর্তন করা গেলে আফগানিস্তানের অর্থনীতি বাড়তে পারে। এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ব্যাপক বেকারত্বও ধীরে ধীরে কমতে পারে। আর এতে ভবিষ্যতে দেশটির স্থিতিশীলতা কিছুটা বাড়তে পারে।
কাবুলে কূটনৈতিক যোগাযোগ
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আরও বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ হতে পারে তালেবান সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া। তবে এর অর্থ এই নয় যে তালেবানের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা হচ্ছে। ভালো ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোও অনেক সময় এমন সরকারকে স্বীকৃতি দেয়, যাদের তারা পছন্দ করে না।
তালেবান শাসকদের ভয়ে অনেক সাধারণ মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। ছবি: রয়টার্স
এর অর্থ হলো, বাস্তবতা মেনে নেওয়া যে আগামী বহু বছর আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবানই থাকতে পারে।
তালেবানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না রাখাকে চাপ দেওয়ার কার্যকর উপায় বলা কঠিন। কারণ তালেবান মনে করে না যে পশ্চিমা বা অমুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি তাদের ক্ষমতার বৈধতার জন্য জরুরি।
তবে কাবুলে দূতাবাস থাকলে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথও তৈরি হবে। সময়ের সঙ্গে এই যোগাযোগ তালেবানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী নেতাদের আরও প্রভাবশালী হতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা এও মনে করেন, এই কঠোর তালেবান সরকারের পরিবর্তন মূলত তাদের নিজেদের ভেতর থেকেই আসতে হবে। আর সেই পরিবর্তন হতে কয়েক দশকও লাগতে পারে। তারপরও সতর্কভাবে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের এখন তালেবানের সঙ্গে কথা বলার সময় এসেছে। পছন্দ না হলেও বাস্তবতার কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।