আফগানিস্তানের ভেতরে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলাগুলো কেবল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) দমনের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে না। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে পাকিস্তানের চালানো একের পর এক বিমান হামলায় আফগানিস্তানে ব্যাপক বেসামরিক লোকজনের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ, যখন কাবুলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বিমান হামলা চালিয়ে ২৬৯ জন বেসামরিক মানুষকে হত্যা এবং ১২২ জনকে আহত করা হয়। জাতিসংঘের তথ্যে এটা উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের ২১ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই হামলার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি দাবি করে এবং একে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করার আহ্বান জানায়।
পাকিস্তান দাবি করে আসছে যে, তাদের এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো টিটিপি, যাদেরকে আফগান তালেবান আশ্রয় ও সহায়তা দিচ্ছে। যদিও আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে আখ্যা দিয়েছে। তবুও এই হামলাগুলোতে টিটিপির কোনো শীর্ষ নেতা বা প্রভাবশালী কমান্ডার নিহত হয়নি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, টিটিপি কি আসলেও দুই দেশের সংঘাতের আসল কারণ, না কি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ?
পাকিস্তানের ভেতরে জন্ম নেওয়া সংকট
টিটিপির উত্থান ও শেকড় মূলত পাকিস্তানের ভেতরেই প্রোথিত। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে সুফি মোহাম্মদ সোয়াত ও মালাকান্ড অঞ্চলে শরিয়াহ আইন চালুর দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেন, যা ছিল কোনো ধর্মীয় বিচারকের নেতৃত্বে পরিচালিত দেশে প্রথম সামরিক প্রচার। এর ১৩ বছর পর ২০০৭ সালে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের বাইতুল্লাহ মেহসুদ বিভিন্ন জঙ্গি উপদলকে একত্রিত করে টিটিপি গঠন করেন। সুফি মোহাম্মদের জামাতা মোল্লা ফজলুল্লাহ ২০১৩ সাল থেকে এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেন, যিনি ২০১৮ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, টিটিপির উৎপত্তির মূল ভিত্তিটি আফগানিস্তানে তালেবানের দ্বিতীয়বার আবির্ভাবের আগেই তৈরি হয়েছিল।
পাকিস্তানের হামলায় আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের দৃশ্য। ছবি: ইপিএ।
গত দুই দশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন প্রধান অভিযান পরিচালনা করেছে। তবুও টিটিপি কেবল তাদের নিজস্ব টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে বেঁচে থাকেনি, বরং এর মূল কারণ ছিল সামরিক বাহিনীর ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ জঙ্গিদের মধ্যে বৈষম্য করার নীতি। আফগানিস্তানের পূর্ববর্তী সরকারকে দুর্বল ও উৎখাত করার উদ্দেশ্যে কাবুলের বিরুদ্ধে কৌশলগত সহায়তা প্রদান করতে গিয়ে যে অবকাঠামো ও নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল, তার সরাসরি সুবিধা পেয়েছে টিটিপি।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এবং ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী বছর সোভিয়েত আক্রমণের পর, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের মূল মিত্র হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ দাউদ খানের সময় আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যাওয়া গুলবউদ্দিন হেকমতিয়ার এবং আহমদ শাহ মাসউদের মতো বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাকিস্তান আগেই আশ্রয় দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পাকিস্তান মুজাহিদীনদের মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় ডুরান্ড লাইনের আশপাশে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী চরমপন্থার মুখোমুখি হয়। হাজার হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়, জিহাদের প্রচারণামূলক সাহিত্য বিতরণ করা হয় এবং স্থানীয় যোদ্ধাদের আফগান মুজাহিদিনদের সাথে যোগ দিতে উৎসাহিত করা হয়। যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন আফগান সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। ৯/১১ হামলার পর তৎকালীন জেনারেল পারভেজ মোশাররফের নেতৃত্বে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ যোগ দিলেও গোপনে তারা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখে। ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের উপস্থিতি এই দ্বিচারিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ফলে অনেক বিশ্লেষকই প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তান কি সত্যি টিটিপিকে নির্মূল করতে চায়, না কি একে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এক নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ হিসেবে বজায় রাখতে চায়।
কৌশলগত গভীরতা থেকে কৌশলগত আধিপত্যের দিকে
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল আফগানিস্তানে ‘কৌশলগত গভীরতা’ অর্জন করা, যার অর্থ ছিল কাবুলে এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা করা যা ভারতের সাথে সংঘাতের সময় পাকিস্তানকে সামরিক সুবিধা দেবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই নীতি পরিবর্তিত হয়ে ‘কৌশলগত আধিপত্যে’ রূপ নিয়েছে, যেখানে আফগানিস্তানকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে না দেখে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বলয়ের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পূর্ব আফগানিস্তানে পাকিস্তানের ড্রোন হামলা।
সম্প্রতি আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি আসিফ দুররানির একটি বক্তব্যে এই মানসিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, পাকিস্তানের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আফগান তালেবানের ভারতের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা একটি ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার সামিল। অথচ ভারতের সাথে আফগানিস্তানের সাধারণ কূটনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে পাকিস্তানের জন্য হুমকি, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি।
ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তান ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব এবং কাশ্মীর ইস্যুতে সব সময় নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছিল। এমনকি ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধেও কাবুল কোনো পক্ষ নেয়নি। তবুও পাকিস্তান আশা করে যে, আফগানিস্তানও ভারতকে তাদের মতো নিরাপত্তা হুমকির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে এবং দিল্লির সাথে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখবে।
মধ্য এশীয় মাত্রার রাজনীতি
আফরাসিয়াব খট্টকের মতো রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তান মূলত মধ্য এশিয়ায় রাশিয়া ও চীনের প্রভাব কমানোর পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। তার মতে, পাকিস্তান কেবল তালেবানকে ক্ষমতায় আনতেই সাহায্য করেনি, বরং তারা আশা করেছিল যে এই উগ্রবাদ পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ার দিকে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষ মধ্য এশীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইসলামাবাদের সাথে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
খট্টকের মতে, পাকিস্তান টিটিপিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আফগানিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং এই অঞ্চলে পুনরায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার পথ খুঁজছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন যে, চীনের ভৌগোলিক অবস্থানের কাছাকাছি হওয়ার কারণে ওয়াশিংটন বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধার করতে চায়। এর কিছুদিন পরেই আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেকেই মনে করছেন, পাকিস্তান এমন একটি সন্ত্রাসবিরোধী তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে চায় যা দিয়ে তারা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে।
পশতু এবং বালুচ জাতীয়তাবাদ দমনের চক্রান্ত
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান সরকারের কাছে আফগান তালেবান বা টিটিপির চেয়েও বড় হুমকি হল পশতু ও বালুচ জাতীয়তাবাদ। খট্টক যুক্তি দেন যে, টিটিপির উপস্থিতি খাইবার পাখতুনখোয়ায় পশতু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়, যার কারণে রাজ্যটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোকে টিটিপির নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা উপজাতীয় প্রবীণ, পশতু জাতীয়তাবাদী এবং সরকারের নীতি সমালোচকদের চিহ্নিত করে হত্যা করার জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করেছে। হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে প্রায় ১,২০০ উপজাতীয় প্রবীণকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের ক্ষোভ সমাধানের বদলে পাকিস্তান তাদেরকে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
একই দমনমূলক নীতি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া, বাণিজ্য আটকে দেওয়া, আফগান শরণার্থীদের জোর করে বের করে দেওয়া এবং বিমান হামলার মতো কঠোর সিদ্ধান্তগুলো পরিস্থিতি সুসংহত করার বদলে দুই দেশের মানুষের সম্পর্ককে আরও বিষিয়ে তুলেছে। ২৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইনে বেড়া দেওয়ার ফলে সীমান্ত অঞ্চলের উপজাতীয় সামাজিক বন্ধন ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের নিজের ঘর মেরামত জরুরি
ডুরান্ড লাইনের উপজাতীয় অঞ্চলগুলো ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে একটি বাফার জোন হিসেবে কাজ করত, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানের অংশ হয়। ২০১৮ সালে খাইবার পাখতুনখোয়ার সাথে একীভূত হওয়ার আগে এই অঞ্চলগুলো আধা স্বায়ত্তশাসিত ছিল। কিন্তু কয়েক দশকের সামরিক অভিযান স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের তীব্র ক্ষোভ জন্মেছে।
বর্তমানে উপজাতীয় এলাকা এবং বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আফগান প্রজাতন্ত্রের শেষ বছরগুলোর মতো রূপ নিচ্ছে, যেখানে গ্রামীণ এলাকাগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে আর সরকারি কর্তৃত্ব কেবল শহরগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
টিটিপি এখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলো থেকেই তাদের অপারেশন চালাতে সক্ষম। তাই বহিরাগত শক্তিকে দোষারোপ না করে পাকিস্তানের উচিত তাদের ব্যর্থ সামরিক কৌশল ত্যাগ করা এবং রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট দূর করা। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক পদক্ষেপ কেবল ওই অঞ্চলে চরমপন্থীদের শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যই চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।
জারদশত শামস: সাবেক আফগান কূটনীতিক
(এই লেখাটি আল জাজিরার সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)