১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ার সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকার শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে চীনা রেস্তোরাঁ পর্যন্ত একটি স্বস্তিদায়ক মিথ ছড়িয়ে ছিল। বলা হতো, দেশটি এত বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভাসছে যে, আগামী ১৫০ বছর অনায়াসে আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব।
দেশের অফুরন্ত সম্পদ নিয়ে তখন এক ধরনের উচ্ছ্বাস ছিল; বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতি যেন স্থায়ীভাবে আমাদের অভাবের হাত থেকে সুরক্ষিত করে রেখেছে। কিন্তু সেই সময়ের প্রাথমিক গ্যাস আবিষ্কারের যুগে ধানমন্ডি ও বেইলি রোডের মতো শহুরে এলাকায় হাঁটতে গিয়ে এক উদ্বেগজনক আচরণগত বৈপরীত্য চোখে পড়ত, যার সঙ্গে ভূতত্ত্বের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সম্পর্ক ছিল পুরোপুরি মানুষের আচরণের সঙ্গে।
বিয়ে হয়ে যাওয়া বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে দেখতাম, বেশির ভাগ পরিবারের রান্নাঘরের চুলা ২৪ ঘণ্টাই জ্বলছে। ঘরজুড়ে অবিরাম নীল শিখার হিসহিস শব্দ। আমি অনেককেই এর কারণ জিজ্ঞেস করেছি। উত্তরে বেশ অবাক হয়েছিলাম। চুলার আগুন জ্বালিয়ে রাখাই তখন এক ধরনের প্রচলিত রীতি হয়ে উঠেছিআগুনরণ, আগুন নিভিয়ে দিলে পরে আবার জ্বালানোর জন্য আরেকটি দেশলাই কাঠি খরচ করতে হবে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৬০-এর দশক এবং বাংলাদেশের শুরুর সময়টিতে জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। ভারী শিল্প বলতে প্রায় কিছুই ছিল না, বিদ্যুৎব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত সীমিত।
সাধারণ গৃহস্থের কাছে একটি দেশলাইয়ের কাঠি ছিল এমন এক দৃশ্যমান খরচ, যা বাঁচানো জরুরি। অথচ পাইপ দিয়ে অদৃশ্যভাবে প্রবাহিত গ্যাসকে মনে করা হতো অফুরন্ত ও বিনা মূল্যের সম্পদ। অন্য অনেক বাড়িতে খোলা চুলার আগুনকে নিয়মিত কাপড় শুকানোর অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্ষাকালে কাপড় আগুনের ওপর দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। শুধু এই কারণে যে, এতে পরিবারের বাড়তি কোনো খরচ হবে না।
সরকার আবাসিক গ্যাসের প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী মিটার বসিয়ে বিল নেওয়ার বদলে নির্দিষ্ট মাসিক হারে গ্যাসের মূল্য নিত। ফলে মানুষ প্রাকৃতিক গ্যাসকে বাতাস বা সূর্যের আলোর মতোই বিবেচনা করতে শুরু করেছিল–অসীম ও অবিনাশী হিসেবে। এভাবেই এমন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছিল, যারা কেবল তাৎক্ষণিক স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবত; দেশের ভবিষ্যৎ কিংবা একদিন যে আমাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো ফুরিয়ে যাবে, সেই গাণিতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ উদাসীন।
আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস এখন দেশের ‘জীবনধারা’; দেশের অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে এটি ব্যবহৃত হয়। তৈরি পোশাক, ইস্পাত ও সিরামিকের মতো কয়েক শ কোটি ডলারের শিল্পও এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গাজীপুর ও নরসিংদীর মতো শিল্পাঞ্চলে এখন বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাক কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাসের জন্য হিমশিম খাচ্ছে। ফলে যন্ত্রপাতি বসে থাকছে, উৎপাদন লাইন সক্ষমতার সামান্য অংশে নেমে আসছে। ১৯৬০-এর দশকে কেউ যে মাত্রার জ্বালানি চাহিদা কল্পনাও করেনি, বিদ্যুতের ব্যবহার তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা এবং পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত বিশাল বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের মতো পুরনো ক্ষেত্রগুলো এখন বার্ধক্যে পৌঁছেছে। এগুলোর মজুত কমে আসছে এবং উৎপাদন বছরে শত শত মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে। সরবরাহ ও চাহিদার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান মেটাতে আগের সরকারগুলো দেশে নতুন করে অনুসন্ধান ও খননের বদলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তেল আমদানির পথ বেছে নিয়েছে।
বাংলাদেশ এখন একটি ভয়াবহ ‘আমদানি-ফাঁদে’ পড়েছে। সরবরাহ ও চাহিদার বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে আমাদের মূল্যবান, কষ্টার্জিত আমেরিকান ডলারের রিজার্ভ ব্যয় করতে হচ্ছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিদেশি এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অস্থির বৈশ্বিক বাজার, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে থাকা ভূরাজনৈতিক অভিঘাতের ওপর।
নিজস্ব জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারা কোনো দেশই অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তার দর-কষাকষির ক্ষমতার একটি বড় অংশ ধরে রাখতে পারে না।
অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো–২০১২ ও ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অর্জন। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সমুদ্রসীমা বিরোধে বাংলাদেশ জয়ী হয়ে বিশাল সমুদ্রসীমা লাভ করে। কিন্তু নীল অর্থনীতির সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ কার্যত কিছুই করেনি। অন্যদিকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরের নিজেদের জলসীমা জরিপ করেছে, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং এ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তারা দ্রুত আন্তর্জাতিক বড় কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গভীর সমুদ্রে খনন শুরু করে এবং বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি বিশাল গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে।
২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে গড়ে মাত্র একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে।
এই বিলম্বের কারণ ছিল অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় না হওয়া চুক্তির শর্ত এবং অন্তহীন বিলম্ব। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রের ব্লকগুলো প্রায় সম্পূর্ণ খালি ও অনাবিষ্কৃত পড়ে ছিল। দেশে নতুন করে খননও করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার গুরুতর ব্যর্থতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
দেশ যত বেশি শিল্পায়িত হয়েছে, সংকটও তত গভীর হয়েছে। এটি প্রকৃতির ব্যর্থতা নয়; বরং দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক অবহেলা ও দুর্বল কৌশলগত পরিকল্পনার সরাসরি ফল, যার পরিণতিতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও খনন হয়নি।
ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা, বাংলাদেশের ভূগর্ভে এবং সমুদ্রসীমার গভীরে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস আটকে আছে। সংকটের কারণ হলো–আমরা এসব সম্পদের অনুসন্ধান বন্ধ করে দিয়েছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম অনুসন্ধান করা হাইড্রোকার্বন অববাহিকাগুলোর একটি।
এখন আমরা যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করছি এবং সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি দেখছি, তখন আমাদের অবশেষে কঠিন সত্যটি মেনে নিতে হবে, দুর্বল ব্যবস্থাপনা বজায় রেখে আমরা টেকসই রাষ্ট্র দাবি করতে পারি না। প্রাকৃতিক সম্পদ গাণিতিকভাবে সীমিত, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ হতে হবে অসীম।
সরবরাহ ও চাহিদার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান পূরণ করতে সরকারগুলো ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তেল আমদানির পথে গেছে। ফলে একটি নাজুক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হওয়ায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমেছে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কোনো দেশ যখন তার সম্পদকে অব্যবস্থাপনার শিকার হতে দেয়, তখন তা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ঘাটতির সংকেত দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন করে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ অপচয়, নতুন শিল্পের বাড়তি চাহিদা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থা–এসব বিষয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে। কারণ তারা এমন দেশে বিনিয়োগে দ্বিধায় পড়ে, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত এবং কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বারবার ওঠানামা করে।
আমরা যখন বঙ্গোপসাগরের অনাবিষ্কৃত ব্লকগুলোর ওপর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে ছিলাম, তখন আঞ্চলিক প্রতিবেশীরা সক্রিয়ভাবে নিজেদের জলসীমা জরিপ, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
আন্তর্জাতিক অংশীদার, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি দেশ তার অভ্যন্তরীণ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কোনো দেশ যখন তার শত শত কোটি ডলারের সম্পদ আক্ষরিক অর্থেই অপচয় হতে দেয়, তখন তা আরও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার ইঙ্গিত দেয়।
জ্বালানি হলো ভূরাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি। ধীরগতির অগ্রগতির মানসিকতা থেকে সক্রিয় অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের দিকে সময়মতো যেতে না পারায় বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক জ্বালানি হাব হওয়ার সম্ভাবনা হারিয়েছে। সম্ভাব্য জ্বালানি রপ্তানিকারক থেকে আমরা পরিণত হয়েছি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে।
বর্তমান সরকার অবশেষে সেই নিষ্ক্রিয় অবস্থান থেকে সরে এসে ১০০টির বেশি নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের জন্য জোরালো কর্মসূচি শুরু করেছে, যাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন আবারও বাড়ানো যায়। ইতিমধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও গ্যাস অনুসন্ধানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তাই আশার জায়গা আছে। একই সঙ্গে আমাদের নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে এবং এ অঞ্চলের একটি জ্বালানি হাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত