
একেকটি ঘটনা একেকটি বেদনার গল্প
অপ্রতীমের মৃত্যুতে সমস্ত দেশ শোকে স্তব্ধ হলেও আমাদের রাজনীতিকদের চৈতন্ন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতাসীনেরা সবকিছু ঠিক আছে বলে জনগণকে সান্ত্বনা দেবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের ধরার বাহবাও নিতে চাইবে।
তৌকির আহমেদ

একই মহল্লার আলো-আঁধারি গলি ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা দুই বালকের গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। তাদের শৈশব কেটেছে একই চেনা ধূসর পথ ধরে। জীর্ণ স্কুলের একই ভাঙা বেঞ্চে বসে তারা পাশাপাশি বিদ্যা কুড়িয়েছে, মাথার ওপর ছিল একই রকম সামাজিক অনটন ও টানাপোড়েন। অথচ পনেরো বছর পর দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ছবি। একজন অন্ধকারের গলিতে হারিয়ে গিয়ে নাম লিখিয়েছে প্রভাবশালী অপরাধ চক্রের খাতায়; আর অন্যজন সমস্ত প্রতিকূলতার শৃঙ্খল ভেঙে নিজেকে গড়ে তুলেছে এক দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে।
পাশাপাশি বেড়ে ওঠা দুটি জীবনের এই বিপরীতমুখী যাত্রা কেবল কোনো গল্প নয়; এটি মানুষের ইতিহাসের অন্যতম নিগূঢ় ও প্রাচীন এক বিস্ময়। মানুষ কেন অপরাধের কঠিন পথে পা বাড়ায়? অপরাধের বীজ কি আমাদের রক্তের ভেতর, জিনের গহীনে সুপ্ত থাকে? নাকি সমাজ ও সময়ের নীরব কোনো চক্রান্তে একজন নিষ্পাপ মানুষ ধীরে ধীরে রূপ নেয় অপরাধীতে?
এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যুগে যুগে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব এবং সাম্প্রতিককালের স্নায়ুবিজ্ঞান। এটি কেবল বইয়ের পাতার তাত্ত্বিক তর্ক নয়; এই উত্তরের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে একটি রাষ্ট্রের আইনশাস্ত্র, বিচারালয়ের কাঠামো এবং শাস্তির নৈতিক ভিত্তি।
মানুষের প্রবৃত্তি ও দার্শনিক উত্তরাধিকার
মানুষের ভেতরের সত্তা কি জন্মসূত্রে হিংস্র ও স্বার্থপর, নাকি আমাদের ভেতরে জন্ম থেকেই থেকে যায় এক আদিম সহানুভূতি?
গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন, মানুষ স্বভাবতই এক সামাজিক জীব। তার নৈতিক বোধ গড়ে ওঠে নিত্যকার অভ্যাসে ও চর্চায়। কোনো মানুষ জন্ম থেকেই ভালো বা মন্দ নয়; সমাজ তাকে যেভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ দেয়, তা-ই নির্ধারিত করে তার চারিত্রিক মানচিত্র।
এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে সপ্তদশ শতকের ইংরেজ দার্শনিক থমাস হব্স মনে করতেন, রাষ্ট্র ও সমাজের অনুশাসন না থাকলে মানুষের অস্তিত্ব হতো নিঃসঙ্গ, নির্মম ও হিংস্র। হব্সের মতে, কঠোর নিয়ম না থাকলে মানুষ নিজের স্বার্থে যেকোনো অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। অর্থাৎ, সমাজ অপরাধ তৈরি করে না, বরং সমাজই মানুষকে সামলে রাখে।
অষ্টাদশ শতকে জঁ-জাক রুসো নিয়ে এলেন অন্য এক ভাবনা। রুসোর মতে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই নিষ্পাপ ও প্রেমময়। কিন্তু সমাজ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির লোভ এবং কৃত্রিম বৈষম্যই তাকে হিংসুটে করে তোলে। অর্থাৎ, সমাজই নিষ্পাপ মানুষকে অপরাধী বানিয়ে ছাড়ে।
অন্যদিকে ইমানুয়েল কান্ট জোর দিয়েছিলেন মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ ও বিবেকের ওপর। কান্টের মতে, চারপাশের অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক, সঠিক পথ বেছে নেওয়ার নৈতিক ক্ষমতা মানুষের ভেতরেই থাকে। ফলে চূড়ান্ত বিচারে অপরাধের দায় ব্যক্তির নিজের সিদ্ধান্তের ওপরই বর্তায়।
রক্তে কি অপরাধের বীজ থাকে?
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ইতালীয় চিকিৎসক চেজারে লোমব্রোসো দাবি করেছিলেন, অপরাধীদের শারীরিক গঠন দেখে আলাদা করা যায়। আধুনিক বিজ্ঞান অবশ্য তার এই দাবিকে বর্ণবাদী ও ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও আধুনিক জিনতত্ত্ব স্পষ্ট জানিয়েছে- ‘অপরাধী জিন’ বলে একক কোনো জৈবিক উপাদানের অস্তিত্ব নেই।
তবে আধুনিক নিউরোসায়েন্স স্বীকার করে যে, মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম গঠন মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ এবং ‘অ্যামিগডালা’ নামক দুটি অঞ্চল আবেগ, রাগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মানুষের বিবেক ও যুক্তির কেন্দ্র। কোনো কারণে এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা অপরিপক্ক হলে মানুষের মধ্যে ঝোঁকের মাথায় হঠকারী কাজ করার প্রবণতা বাড়ে। অন্যদিকে, অ্যামিগডালা নিয়ন্ত্রণ করে ভয় ও সমানুভূতির অনুভূতি। এখানে ত্রুটি থাকলে মানুষ অন্যের যন্ত্রণা অনুভব করতে ব্যর্থ হয়।
তবে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেন, মস্তিষ্কের এই দুর্বলতা মানেই অপরাধের নিশ্চিত পরিণতি নয়। জৈবিক প্রবণতা কেবল একটি সম্ভাবনা তৈরি করে; সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করে চারপাশের পরিবেশের ওপর।
মনস্তত্ত্ব ও শৈশবের চেনা ক্ষত
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মানুষের মানস গড়ে ওঠে শৈশবের স্মৃতি দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং কায়সার পারমানেন্টের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু অবহেলা বা পারিবারিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে বড় হয়, তাদের মানসিক ভারসাম্য সহজ হতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার ‘সামাজিক শিক্ষা তত্ত্ব’ অনুযায়ী, মানুষ মূলত দেখে ও অনুকরণ করে শেখে। শৈশবে যদি কেউ দেখে যে সংঘাত ও জোর জবরদস্তির মাধ্যমেই নিজের দাবি আদায় করা যায়, তবে তার অবচেতন মনে সহিংসতাই সমস্যা সমাধানের স্বাভাবিক পথ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া সব শিশুই যে পথ হারায়, তা নয়। মনস্তত্ত্বের অন্যতম সুন্দর একটি ধারণা হলো ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা রেজিলিয়েন্স। দেখা গেছে, কঠিন শৈশবের মধ্যেও যদি কোনো শিশু একজন স্নেহশীল শিক্ষক, স্বজন বা শুভাকাঙ্ক্ষার পরশ পায়, তবে সে নিজের ভেতর ইতিবাচকতার আলো ধরে রাখতে পারে।
সমাজ যখন অপরাধের কারখানা
ব্যক্তিগত চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে সমাজবিজ্ঞান অপরাধকে দেখে ব্যবস্থার অসমতার প্রতিফলন হিসেবে। এডউইন সাদারল্যান্ডের ‘ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধ হলো- শেখা আচরণ। মানুষ যখন এমন কোনো সঙ্গ পায়, যেখানে আইন ভাঙাকে বীরত্ব মনে করা হয়, তখন সে-ও ধীরে ধীরে সেই পথ গ্রহণ করে। সাদারল্যান্ডের মতে, অপরাধ শেখার প্রক্রিয়ায় কেবল কারিগরি কৌশলই নয়, বরং অপরাধের প্রতি অনুকূল মনোভাব, উদ্দেশ্য ও যুক্তিও অন্তর্ভুক্ত।
আবার রবার্ট মার্টনের ‘চাপ তত্ত্ব’ বলে, সমাজ সবার সামনে সাফল্যের ঝকমকে আলো তুলে ধরে–বিত্ত ও ক্ষমতার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সবাইকে সেই লক্ষ্য অর্জনের সমান সুযোগ দেয় না। এই অসমতা যখন মানুষকে বঞ্চিত করে, তখন সেই গভীর হতাশা থেকেই অনেকে অপরাধের পথ বেছে নেয়। মার্টনের এই তত্ত্ব কাঠামোগত বৈষম্য এবং সংস্কৃতির সংঘাতকে অপরাধের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
বাংলাদেশের মতো বৈষম্যপীড়িত অর্থনীতি ও সমাজবাস্তবতায় এই তত্ত্বটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক জীবন উচ্চবিত্তের ভোগবাদী জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরে তরুণদের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছে, অন্যদিকে দেশের চরম কর্মসংস্থান সংকট, নিম্ন মজুরি ও সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব সিংহভাগ সাধারণ মানুষকে এক অন্ধকার দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। বৈধ উপায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথ রুদ্ধ দেখে কিংবা বেঁচে থাকার নূন্যতম রসদ জোগাতে না পেরে তরুণদের একটি অংশ গভীর মানসিক পীড়ন ও হতাশায় ভোগে। এই কাঠামোগত বঞ্চনা ও তীব্র ব্যবধানই অনেককে বাধ্য করে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, অনলাইন প্রতারণা বা মাদকের সিন্ডিকেটের মতো অবৈধ পথে পা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে। অর্থাৎ, যখন একটি সমাজ স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু উপায়ের সমান সুযোগ রুদ্ধ করে রাখে, তখন সেই সমাজ নিজেই অপরাধের কারখানা হয়ে ওঠে।
শ্রেণিশোষণ ও ব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতি
অপরাধের মূল শিকড় খুঁজতে গিয়ে কার্ল মার্ক্সের দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। মার্কসীয় বিচারে, অপরাধ কেবল কোনো ব্যক্তির মানসিক বিচ্যুতি নয়; বরং তা ধনবৈষম্য ও শোষণের ফল।
মার্ক্স তার বিখ্যাত কাঠ চোরের আইন বিতর্কে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রীয় আইন ধনিক শ্রেণির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আইন সব সময় সবার জন্য সমান আচরণ করে না। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ যখন বাঁচার তাগিদে ছোটখাটো চুরি করে, রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে ‘অপরাধী’ বানিয়ে দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি করে। কিন্তু সমাজের প্রভাবশালীরা যখন হাজার কোটি টাকা পাচার করে কিংবা পরিবেশ ধ্বংস করে, তখন তা ‘নীতিগত ত্রুটি’ বা ‘ব্যবসায়ীক কৌশল’- এর আড়ালে পড়ে যায়।
সামাজিক বঞ্চনা যখন মানুষকে নিজের শ্রম ও মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে, তখন সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন ছিঁড়ে যায়। এই কাঠামোগত শোষণই নিম্নবিত্তকে বাধ্য করে অপরাধে জড়াতে আর বিত্তবানকে ঠেলে দেয় ক্ষমতার লোভের দিকে।
পরিস্থিতির দাসত্ব ও সাধারণ মানুষের রূপান্তর
আমরা প্রায়ই অপরাধীদের সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ মনে করি। কিন্তু সামাজিক মনস্তত্ত্বের নানা পরীক্ষা দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতির চাপে পড়ে একজন অতি সাধারণ মানুষও সহিংস হয়ে উঠতে পারে। গবেষক ফিলিপ জিম্বার্ডো ও তার দল স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্টে প্রমাণ করেন, পরিস্থিতির চাপ এবং সামাজিক পরিবেশের প্রভাব একজন অতি সাধারণ, বিবেকবান মানুষকেও নিষ্ঠুর বা সহিংস করে তুলতে পারে।
যখন কোনো অন্ধ দলাদলি বা অন্ধ আনুগত্য মানুষের নিজস্ব বিবেককে গ্রাস করে, তখন সে একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারায়। আলবার্ট বান্দুরা একে বলেছেন ‘নৈতিক বিচ্ছিন্নতা’। মানুষ যখন অন্য কোনো পক্ষকে ‘অমানুষ’ ভাবতে শুরু করে কিংবা নিজের অন্যায়কে কোনো মহৎ আদর্শের দোহাই দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে, তখন অতি সাধারণ হাত দিয়েও নৃশংসতম অপরাধ ঘটে যেতে পারে।
অপরাধের নানা মুখ
সব অপরাধের নদী এক সাগরে মেশে না। ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করা মানুষ আর সাদা পোশাকের দুর্নীতিবাজ বা করপোরেট জালিয়াতি করা মানুষের ভেতরটা এক নয়।
একজন চোর যে কারণে চুরি করে, একজন খুনি যে কারণে হত্যা করে, কিংবা একজন ব্যাংক ডাকাত বা সাইবার অপরাধী যে কারণে অপরাধ করে, তার নেপথ্য কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সহিংস অপরাধের পেছনে সাধারণত কাজ করে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিশোধের স্পৃহা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা হুট করে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো।
অন্যদিকে, আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড ‘হোয়াইট-কলার ক্রাইম’ ধারণাটি সামনে আনেন। সাদারল্যান্ড দেখান, এসব করপোরেট জালিয়াতি ও সাদা পোশাকের অপরাধের নেপথ্যে কোনো আর্থিক অভাব কাজ করে না; বরং কাজ করে সীমাহীন লোভ, ক্ষমতার লালসা এবং সামাজিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ। এসব অপরাধীরা আবেগপ্রবণ হয়ে নয়, বরং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হিসাব-নিকাশ করে, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং ধরা না পড়ার কৌশল নিশ্চিত করে অপরাধ সংগঠিত করে।
পরিস্থিতির চাপ নাকি বিবেক?
বিজ্ঞান যদি মস্তিষ্কের গঠনকে সামনে আনে, সমাজবিজ্ঞান যদি দারিদ্র্যকে দায়ী করে, আর মনস্তত্ত্ব যদি শৈশবের ক্ষত তুলে ধরে- তবে কি মানুষের নিজস্ব কোনো দায় থাকে না?
এখানেই অপরাধবিজ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধন। কোনো ঘটনার সামাজিক বা জৈবিক কারণ বোঝা আর সেই অপরাধকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। পরিবেশ মানুষকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে পুরোপুরি কেড়ে নেয় না। পরিস্থিতি যত জটিলই হোক, চূড়ান্ত মুহূর্তে সিদ্ধান্তের দায় মানুষকেই নিতে হয়।
শাস্তির কারাগার নাকি শুধরে নেওয়ার আলো?
মানুষ কেন অপরাধ করে- এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেয় অপরাধীর সাথে সমাজ কী আচরণ করবে।
আমরা যদি ধরে নিই অপরাধী জন্মগতভাবেই নষ্ট, তবে সমাজ কেবল তাকে খাঁচায় বন্দি করে রাখতে চাইবে। তবে ইতিহাস বলে, কেবল কঠোর শাস্তি দিয়ে অপরাধ কমানো যায়নি।
অন্যদিকে, আমরা যদি বুঝি যে সামাজিক বঞ্চনা, পারিবারিক সংকট ও অবহেলাই মানুষকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়, তবে সমাধানের উপায় বদলে যায়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার বিচারব্যবস্থা শাস্তি দেওয়ার চেয়ে মানুষকে মানসিক আলো ও শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেয়। ফলে সেখানে অপরাধের হারও কম।
শেষের কথা
অপরাধী কি জন্মায়, নাকি সমাজ তাকে তৈরি করে- এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একরৈখিক ফ্রেমে বাঁধা সম্ভব নয়। কোনো মানুষ কেবল ‘অপরাধী জিন’ নিয়ে জন্মায় না, আবার কেবল সমাজের চাপে সবাই অপরাধী হয়ে যায় না।
জৈবিক বৈশিষ্ট্য যদি হয় একটি বন্দুক, তবে সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি হলো তার ট্রিগার। ট্রিগার না চাপলে বন্দুক যেমন নিজে থেকে চলে না, তেমনি উপযুক্ত মানবিক পরিবেশ পেলে প্রতিকূলতার ভেতরে বড় হওয়া মানুষও আলো ছড়াতে পারে। অপরাধ ঘটার পর শাস্তির খড়্গ তুলে দেওয়ার চেয়ে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সমাজের সেই অন্ধকার গলিগুলোতে আলো জ্বালানো, যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষ তার পথ হারিয়ে ফেলে।

একেকটি ঘটনা একেকটি বেদনার গল্প
অপ্রতীমের মৃত্যুতে সমস্ত দেশ শোকে স্তব্ধ হলেও আমাদের রাজনীতিকদের চৈতন্ন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতাসীনেরা সবকিছু ঠিক আছে বলে জনগণকে সান্ত্বনা দেবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের ধরার বাহবাও নিতে চাইবে।

চিকিৎসকের দেওয়া টেস্ট রিপোর্ট দেখতেও আবার ফি!
প্রথম পরামর্শে চিকিৎসক নিজেই যদি রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা দেন এবং সেই পরীক্ষার রিপোর্ট না দেখা পর্যন্ত তার ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই রিপোর্ট দেখা কি নতুন পরামর্শ, নাকি আগের ‘পরামর্শের পরিপূর্ণতা’?

ইরানের উত্থান ঠেকানোর উপায় নেই
চীনের বিপ্লবোত্তর ইতিহাস বিশ্বের জন্য অত্যন্ত শিক্ষাগ্রহণের মতো একটি বিষয়। এটি আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করে বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থায়ন ও কূটনীতির মূলধারায় পুনর্বাসিত হতে পারে এবং নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারে।

শিক্ষা দিবস: ৬৪ বছর পরও কেন বৈষম্যের পাঠ শেষ হলো না?
১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশের তৎকালীন ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমেছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে রেখে। সেটি হলো, শিক্ষা কি রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার, নাকি সামর্থ্যবান মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পণ্য? পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক ও শিক্ষা সংকোচনমূলক নীতির বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন মোস্তফা