
প্রকৃত সুখ লুকিয়ে আছে কোথায়?
বিজ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার আলোকেও যদি আমরা মানুষের ভালো থাকার মূল রহস্য অনুসন্ধান করি, তবে কয়েকটি প্রধান উপাদান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তৌকির আহমেদ

আজকের আধুনিক পুঁজিবাদী যুগে সুখকে যেন একটি বিক্রিযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা হয়েছে। চারপাশের রঙচঙে বিজ্ঞাপন আর সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন পর্দাগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে নিখুঁত জীবনের এক কৃত্রিম ছবি তুলে ধরে। পপ-সাইকোলজির নামে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘বিষাক্ত ইতিবাচকতা’ (Toxic Positivity), যা মানুষকে অবিরত একটি অবাস্তব বার্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়–তোমাকে যেকোনো মূল্যে সারাক্ষণ সুখী থাকতে হবে, আর তা যদি না পারো, তবে সমস্যাটা নিশ্চয়ই তোমার চিন্তাভাবনায়!
বিজ্ঞান বলছে, এই জোর করে সুখী হওয়ার তাগিদই মানুষকে আরও বেশি অসুখী করে তোলে। গবেষণায় একে বলা হয়েছে ‘প্যারাডক্স অব হ্যাপিনেস’। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আইরিস মাউস ও তার সহযোগীদের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সারাক্ষণ নিজেদের মেপে চলেন–আমি এখন কতটা সুখী হলাম–তারা নিজেদের জীবনের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কাল্পনিক আদর্শের তুলনা করে ক্রমাগত হতাশ হন।
সুখ হলো বনের প্রজাপতির মতো; আপনি যখন তাকে ধরার জন্য উন্মাদের মতো পেছনে ছুটবেন, সে উড়ে দূরে পালাবে। কিন্তু আপনি যখন আপনার কাজ, সম্পর্ক ও উদ্দেশ্যে মগ্ন থাকবেন, সে চুপটি করে এসে আপনার কাঁধে বসবে।
দর্শন ও আধুনিক সাইকোলজি কী বলে?
বিজ্ঞান আজ যা পরিসংখ্যান ও গবেষণাগারে প্রমাণ করছে, বিশ্বের প্রাচীন দার্শনিকেরা হাজার বছর আগেই তা নিজেদের অনুচিন্তায় অনুধাবন করেছিলেন।
অ্যারিস্টটল বলতেন, সুখ কোনো আবেগ বা বাহ্যিক সম্পদ নয়, এটি জীবন যাপনের পদ্ধতি। নৈতিকতা ও মেধার চর্চা করে নিজের পূর্ণ সম্ভাবনাকে বিকশিত করাই হলো সত্যিকারের ‘ইউডাইমোনিয়া’ বা অর্থপূর্ণ জীবন। সেনেকা, এপিকটেটাস এবং অরেলিয়াসের মতো স্টোইক দার্শনিকদের মতে, পৃথিবীর অধিকাংশ ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই (যেমন অন্যের মতামত বা আকস্মিক বিপদ), তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে কেবল নিজের চিন্তা, চরিত্র ও প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করাই হলো মানসিক শান্তির চাবিকাঠি। আধুনিক ‘কগনিটিভ বিহেভিয়েরাল থেরাপি’ সরাসরি এই স্টোইক দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
একইভাবে বৌদ্ধ দর্শনের মূল ভিত্তি হলো–অনিত্য বস্তু বা ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ও তৃষ্ণাই মানুষের দুঃখের প্রধান কারণ। আবেগকে না আঁকড়ে ধরে নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করাই মুক্তির পথ। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক চর্চা ‘মাইন্ডফুলনেস’ ও ‘একসেপ্টেন্স অ্যান্ড কমিটমেন্ট থেরাপি’ এই দর্শনের বৈজ্ঞানিক রূপায়ন।
ব্যক্তিগত দায়িত্ব নাকি সামাজিক অবকাঠামো?
আজকের ব্যবসায়ীবান্ধব স্ব-সহায়ক (Self-help) সংস্কৃতিতে প্রায়শই প্রচার করা হয়–‘সুখী হওয়া বা না হওয়া পুরোপুরি তোমার নিজের মানসিক পছন্দের ব্যাপার।’ এটি একটি চরম একপেশে ও বিপজ্জনক সামাজিক বিশ্লেষণ।
মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান নিশ্চিত করে যে, ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো মানুষের কল্যাণের সক্ষমতা নির্ধারণে সমান ভূমিকা রাখে। একজন মানুষ যখন সীমাহীন দারিদ্র্য, সামাজিক বর্ণবাদ, বৈষম্য, নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা বা রাজনৈতিক সহিংসতায় বসবাস করেন, তখন কেবল ‘ইতিবাচক চিন্তা’ করে সুখী হওয়া অমানবিক ও অসম্ভব প্রত্যাশা। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড বা আইসল্যান্ডের মতো নর্ডিক দেশগুলো যে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’-এ প্রায়ই শীর্ষে থাকে, তার মূল কারণ কেবল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি নয়; বরং তাদের শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা, মানসম্মত বিনামূল্যে চিকিৎসা, সামাজিক সমতা এবং অপরাধমুক্ত পরিবেশ।
অতএব, সুস্থ ও সুখী সমাজ গড়তে ব্যক্তিপর্যায়ের মানসিক চর্চার পাশাপাশি ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাও সমভাবে জরুরি।
কেন একটি ‘অর্থপূর্ণ জীবন’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
আমরা কি প্রতিটি মুহূর্তে কেবল আনন্দ বা সুখে থাকার জন্যই বেঁচে থাকি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের ভয়াবহ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী থাকার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাঙ্কল লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Man's Search for Meaning। ফ্রাঙ্কল লক্ষ্য করেছিলেন, অতিব মানবিক নির্যাতন ও অনাহারের মধ্যে কেবল তারাই টিকে থাকার মানসিক রসদ পেয়েছিলেন, যারা চরম কষ্টের মাঝেও বেঁচে থাকার একটি ‘অর্থ’ বা উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন–হতে পারে তা প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি, বা কোনো অসম্পূর্ণ বই শেষ করার তাগিদ। নিৎসে যেমনটি বলেছিলেন, “যার বেঁচে থাকার একটি ‘কেন’ জানা আছে, তিনি প্রায় যেকোনো ‘কীভাবে’ সহ্য করে নিতে পারেন।”
সুখী জীবন আর অর্থপূর্ণ জীবনের মধ্যে ফারাকটা সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গভীর। আমরা প্রায়ই এই দুটোকে একই দাঁড়িপাল্লায় মেপে ফেলি, অথচ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়–এদের লক্ষ্য ও অনুভূতির জগৎ অনেকটাই আলাদা।
মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমাইস্টার ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, সুখী জীবন প্রধানত বর্তমানকেন্দ্রিক। এখানে মানুষ বাঁচতে চায় প্রতি মুহূর্তের আনন্দ, ভালো লাগা আর তৃপ্তির ওপর ভর করে। এই ধরনের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটা মূলত পাওয়ার দিকেই ঝুঁকে থাকে–অর্থাৎ ‘গ্রহণে আনন্দ’। যেকোনো উপায়ে মানসিক চাপ, ঝামেলা কিংবা শারীরিক কষ্ট এড়িয়ে চলে আরাম ও প্রশান্তিতে দিন কাটানোই এর আসল উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, অর্থপূর্ণ জীবন কেবল আজকের দিনটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক সুসংহত মেলবন্ধন। এই পথের মানুষ আনন্দ খোঁজার চেয়ে জীবনের বড় কোনো ‘উদ্দেশ্য’ এবং ‘দায়বদ্ধতা’ পূরণে বেশি মন দেয়। এখানে আনন্দের সংজ্ঞাটা পাল্টে যায়–এটি কেবল নিজের জন্য পাওয়ার মধ্যে থাকে না, বরং অন্যের জন্য ‘দান এবং ত্যাগের’ মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। একটি গভীর ও মহান উদ্দেশ্যের খাতিরে প্রয়োজনে মানসিক চাপ, কষ্ট কিংবা সংগ্রামকে সানন্দে মেনে নেওয়ার মানসিকতা এই অর্থপূর্ণ জীবনের মূল ভিত্তি।
সহজ কথায়, সুখী জীবন মানুষকে মুহূর্তের স্বস্তি ও আনন্দ দেয়, আর অর্থপূর্ণ জীবন মানুষকে দুঃখ-কষ্টের মাঝেও বুক চিতিয়ে বেঁচে থাকার প্রেরণা ও আত্মিক সার্থকতা দেয়।
ক্ষণস্থায়ী সুখকে স্থায়ী কল্যাণে রূপান্তরের পথ
যদিও সুখী হওয়া কোনো চিরস্থায়ী গন্তব্য নয়, তবুও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কল্যাণ বাড়াতে পারি।
যেমন–প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো ঘটনাগুলোর কথা খেয়াল রাখা এবং তা ডায়েরিতে লিখে রাখা (Gratitude Practice) মস্তিষ্কের মনোযোগকে নেতিবাচকতা থেকে ইতিবাচকতার দিকে ঘোরাতে সাহায্য করে। অতীতে ঘটে যাওয়া অনুশোচনা কিংবা ভবিষ্যৎ উদ্বেগে দিন না কাটিয়ে ‘বর্তমান মুহূর্তে’ মনকে স্থির রাখার অনুশীলন করা দরকার। সপ্তাহে অন্তত কয়েক ঘণ্টা প্রিয়জন বা বন্ধুদের কোনো প্রকার যন্ত্রের (ডিভাইস) ডিস্ট্র্যাকশন ছাড়া গুণগত সময় দেওয়া উচিত।
পাশাপাশি অন্যকে সাহায্য করা, নিঃস্বার্থ কাজ করা বা স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত থাকা আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করে। দৈনিক অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা করা, ৭-৮ ঘণ্টা মানসম্পন্ন ঘুম নিশ্চিত করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অলীক দুনিয়ার সঙ্গে নিজের দৈনন্দিন বাস্তবতার তুলনা বন্ধ করা অত্যন্ত কার্যকর অভ্যাস।
সুখের সন্ধানে: চূড়ান্ত বার্তা
আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম একটি প্রশ্ন নিয়ে–মানুষের জীবনের সত্যিকারের ভালো থাকার রহস্য কী?
বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শন আমাদের স্পষ্ট করে জানায় যে, সুখ কোনো স্থবির অবস্থা নয় যে, আপনি একদিন সেখানে পৌঁছাবেন আর চিরকালের জন্য মুক্ত হয়ে যাবেন। মানসিক স্বাস্থ্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডে হাসিমুখে ‘সুখী’ থাকা নয়। বরং জীবনের আসল সার্থকতা হলো–সুখ, আনন্দ, দুঃখ, ব্যর্থতা, একাকিত্ব এবং ভালোবাসার সমস্ত বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে একটি অর্থপূর্ণ, স্থিতিস্থাপক ও গভীরভাবে সংযুক্ত জীবন গড়ে তোলা।
যে জীবন সবসময় আনন্দময় নয়, যে জীবনে কঠিন দায়িত্ব ও দুঃখের কালো মেঘ আসে–সেই জীবনও হতে পারে অনন্য সুন্দর, সার্থক ও এক অতুলনীয়, মূল্যবান ভালো জীবন।

প্রকৃত সুখ লুকিয়ে আছে কোথায়?
বিজ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার আলোকেও যদি আমরা মানুষের ভালো থাকার মূল রহস্য অনুসন্ধান করি, তবে কয়েকটি প্রধান উপাদান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিএনপির ৬ মাসে যেখানে বাংলাদেশ
বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মাথায় এসে জনগণের বৃহত্তর অংশ যে হতাশ হয়ে পড়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন জনজীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছিল না, তখন তারা এই বলে আশায় বুক বেঁধেছিল যে নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি বদলাবে।

জন্মাষ্টমী হোক কৃষ্ণজীবন অনুধ্যানের দিন
আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জন্মগ্রহণকারী অনিন্দ্যসুন্দর, অমিত বলশালী এবং সর্বগুণসম্পন্ন কৃষ্ণকে ঘিরে গল্পকথা-কিংবদন্তীর শেষ নেই। কৃষ্ণ যেহেতু অপরাজেয়, অপরাজিত, বিশুদ্ধ পুণ্যময়, প্রীতিময়, দয়াময়, অনুষ্ঠেয় কাজে সদা তৎপর- ধর্মাত্মা, বেদজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, ধর্মজ্ঞ, নিরহংকার, যোগযুক্ত, তপস্বী-

১ কোটি ১০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে–তবু রেমিট্যান্সে এত পিছিয়ে কেন?
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি সংখ্যার সাফল্য হিসেবে দেখে এসেছি। আর তা হলো–কতজন মানুষ বিদেশে গেলেন। কিন্তু সময় এসেছে প্রশ্নটি উল্টো করে করার। কতজন গেলেন নয়, তারা কত মূল্য সৃষ্টি করলেন?