কল্পনা করুন, এক তরুণী টানা দু-তিন বছর দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নেওয়ার পর সরকারি চাকরির কঠিন পরীক্ষায় প্রথম হলেন। গেজেট প্রকাশের পর প্রথম কয়েক দিন, কিংবা প্রথম কয়েক সপ্তাহ তিনি ভাসলেন অপার আনন্দের বন্যায়। আত্মীয়স্বজনের প্রশংসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দনের জোয়ার, প্রিয়জনদের উচ্ছ্বাস–সব মিলিয়ে এক স্বপ্নের মতো পরিবেশ।
কিন্তু এর ঠিক পাঁচ বা ছয় মাস পর যদি তার জীবনকে দূর থেকে দেখা যায়? দেখা যাবে, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় তীব্র ট্রাফিকের সঙ্গে যুদ্ধ করে অফিসে যাওয়া, ফাইলপত্র সামলানো, সিনিয়রদের জবাবদিহি আর কাজের নানা রকম মানসিক চাপ তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রথম দিনগুলোতে কাজের যে অমলিন রোমাঞ্চ ছিল, তা কমে জায়গা করে নিয়েছে এক ধরনের দৈনন্দিন ছন্দ। এক গভীর রাতে বাড়ি ফিরে তিনিও মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করে বসেন–আমি কি সত্যিই সুখী, নাকি আমি শুধু একটি মাইলফলক অতিক্রম করেছি?
ঠিক একই গল্প দেখা যায়, কোনো বহুপ্রতীক্ষিত বাড়ি কেনা, জীবনের প্রিয় মানুষের সঙ্গে বাঁধনে বাঁধা পড়া, কিংবা স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। আমরা বছরের পর বছর এমন সব বস্তু ও অর্জনের পেছনে ছুটি, যা আমাদের চিরস্থায়ী আনন্দ দেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু অর্জিত হওয়ার পর দেখা যায়, সেই তীব্র অনুভূতি কিছুদিন পরই ম্লান হয়ে যায়।
কেন এমন হয়? মানুষ জন্মগতভাবেই কি চিরসুখী হওয়ার বদলে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু চাওয়ার জন্য তৈরি? সুখ কি কোনো স্থির অবস্থান, নাকি একটি চলন্ত প্রক্রিয়া? মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং দর্শনের সাম্প্রতিক গবেষণার আলোয় আসুন আমরা বোঝার চেষ্টা করি সুখের আসল সমীকরণ কী?
সুখ বলতে আসলে কী বোঝায়?
সাধারণ ভাষায় আমরা যাকে ‘সুখ’ বলি, তা হয়তো খুব সাদামাটা–বিকেলের লালচে রোদে বারান্দায় বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা, হঠাৎ রেডিওতে প্রিয় কোনো পুরনো গান বেজে ওঠা, কিংবা মেঘলা দিনে পছন্দের কোনো খাবারে প্রথম কামড়। আমাদের মনে হয়, এই তো সুখ! এমন এক-দুটি চমৎকার মুহূর্ত, যেখানে মনটা হালকা হয়ে যায়।
কিন্তু মনস্তত্ত্ববিদ আর স্নায়ুবিজ্ঞানীরা যখন এই ‘সুখ’ নামের অধরা অধ্যায়টি নিয়ে গবেষণা করতে বসলেন, তখন তারা দেখলেন–সুখ আসলে কোনো এক মুঠো আবেগ বা মুখের এক ঝলক হাসি মাত্র নয়। এটি মানুষের মন ও জীবনের এক গভীর এবং জটিল রসায়ন।
আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী এড ডায়নার সুখের এক চমৎকার নাম দিয়েছিলেন–‘ব্যক্তিনিষ্ঠ কল্যাণ’ (Subjective Well-being)। সহজ কথায়, বাইরে থেকে দেখতে আপনার জীবন যেমনই মনে হোক না কেন, আপনি নিজে মনের ভেতর থেকে নিজের জীবনকে কেমন অনুভব করছেন। ডায়নার বলেছেন, এই মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণ তিনটি ছোট নদী মিলে তৈরি হওয়া এক মোহনা। প্রথম নদীটি হলো দৈনন্দিন ইতিবাচক আবেগ–অর্থাৎ, আপনার প্রতিটি দিনে আনন্দ, উৎসাহ, ভালোবাসা কিংবা প্রশান্তি কতটুকু থাকছে। দ্বিতীয়টি হলো নেতিবাচক আবেগের অনুপস্থিতি–মানে বিষাদ, উদ্বেগ, রাগ বা অপরাধবোধের মেঘগুলো আপনার মনের আকাশে কত কম জমা হচ্ছে। আর তৃতীয়টি সবচেয়ে বড়–জীবন সন্তুষ্টি। এটি মুহূর্তের খেয়ালখুশি নয়। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যখন নিভৃতে নিজের পুরো জীবনটার কথা ভাববেন–নিজের প্রাপ্তি, ভুলত্রুটি, অর্জিত অবস্থান আর ভবিষ্যতের গতিপথ–তখন যদি বুকের ভেতর থেকে একটা ঠান্ডা প্রশান্তি আর তৃপ্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে, তবে সেটাই হলো জীবন সন্তুষ্টি।
কিন্তু জীবনের গোলকধাঁধায় এখানেই কি গল্প শেষ? মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যান এবং অন্যান্য গবেষকেরা বললেন, না! সুখের নদীটি আসলে দুই ধারায় বিভক্ত। একটি ধারাকে বলা হয় ‘হেডোনিক সুখ’ বা ক্ষণিক আনন্দের পথ। এটি হলো ইন্দ্রিয়জাত তৃপ্তি–সুস্বাদু খাবার খাওয়া, একটা ভালো সিনেমা দেখে ফেলা কিংবা সাময়িক দুঃখ-কষ্ট এড়িয়ে চলা। অন্য ধারাটির নাম ‘ইউডাইমোনিক সুখ’। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ‘ইউডাইমোনিয়া’ ভাবনা থেকে এর জন্ম। এই পথ কেবল অন্ধের মতো ক্ষণিকের আনন্দের পেছনে ছোটে না, বরং এটি গুরুত্ব দেয় জীবনের গভীর অর্থ খোঁজাকে। নিজের ভেতরের মেধা ও সম্ভাবনাকে বিকশিত করা, একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে এগিয়ে যাওয়া এবং নীতি ও সৎ পথের চর্চা করার ভেতরে যে এক অনাবিল শান্তি, সেটাই হলো ইউডাইমোনিক সুখ।
এই অর্থপূর্ণ জীবনের ধারণাটিকে আরও গুছিয়ে উপস্থাপন করলেন মনোবিজ্ঞানী ক্যারল রাইফ। তার মতে, নিজের জীবনের গন্তব্য নিজের হাতে রাখা সুখের প্রথম চাবি। চারপাশের সবাই বা সমাজ হয়তো প্রতিনিয়ত শিখিয়ে দিতে চায় কীভাবে হাঁটা উচিত, কোন স্বপ্নের পেছনে ছোটা উচিত। কিন্তু সেই সব বহিরাগত গোলমালের মাঝে দাঁড়িয়েও যিনি নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে চিনতে পারেন, সমাজের অদৃশ্য চাপে নতিস্বীকার না করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন–তিনিই লাভ করেন আসল সুখ।
তবে কেবল নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না, জীবনে অনাহূত ঝড়ঝাপটাও আসে। কখনো প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা, কখনো ক্যারিয়ারের বিপর্যয়, আবার কখনো চারপাশের বৈরী পরিবেশ। এমন পরিস্থিতিতে যিনি ভেঙে না পড়ে বুদ্ধিমত্তা আর ধৈর্য দিয়ে পরিস্থিতিকে সামলে নেন, পরিবেশকে নিজের অনুকূলে বা অন্তত সহনশীল করে তোলেন–তিনি অর্জন করেন পরিবেশগত দক্ষতার অমূল্য রত্ন।
আর এই বেঁচে থাকার প্রতিটি দিনই আসলে এক একটি পাঠশালা। বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় বাড়ে না; আসল বৃদ্ধি ঘটে মনের গভীরে। প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন কিছু শেখা, নিজের ভুলগুলো থেকে জ্ঞান আহরণ করা এবং দিন শেষে মানসিকভাবে আরও কিছুটা পরিপক্ক হওয়া–এই ভেতরের বিকাশই মানুষকে প্রতিদিন নতুন রূপ দেয়, নতুন করে বাঁচার আশা দেখায়।
কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষ একা চলতে পারে না। পথচলতি হাজারও ভিড়ের মাঝে কিছু এমন মুখ প্রয়োজন, যেখানে কোনো মুখোশ পরতে হয় না। যে ভালোবাসার বন্ধনে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো ভীতি নেই–নিজের খাঁটি বিশ্বাস আর বুকের গহীনের গোপনতম অনুভূতিগুলো যেখানে নিসংকোচে মেলে ধরা যায়। এই সম্পর্কের উষ্ণতাই তো শীতের রাতে আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে।
পাশাপাশি প্রতিটি আত্মাই খুঁজে ফেরে তার পৃথিবীতে আসার একটি গভীর কারণ। সারাদিনের চাকা ঘোরার পর যে মানুষটি জানে সে কেন সকালে ঘুম থেকে উঠেছিল, যার জীবনের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও দিকনির্দেশনা রয়েছে–তার কাছে বেঁচে থাকা আর বোঝা মনে হয় না। সেই জীবনের অর্থই তাকে প্রতিদিন নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে।
আর এই সবকিছুর মূলে যে আলোটি জ্বলতে হয়, তা হলো নিজেকে ক্ষমা করা ও ভালোবাসা। অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ভুল, শরীরের কোনো ক্ষতের চিহ্ন কিংবা নিজের হাজারটা সীমাবদ্ধতা–এসবকে দূরে ঠেলে না দিয়ে, সবকিছুসহ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা। নিজের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরাই আত্ম-গ্রহণযোগ্যতা, তথা প্রকৃত সুখ। দিনশেষে, মুখে সারাক্ষণ এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে রাখার নাম সুখ নয়। নিজের মনের সাথে একটি গভীর, শান্ত আর অর্থপূর্ণ বোঝাপড়ায় পৌঁছানোর নামই হলো জীবনের আসল সার্থকতা।
আগামীকাল পড়ুন: মানুষের মস্তিষ্ক সুখ তৈরি করে কীভাবে?