ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এখন এই পাঁচ ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহকের হিসাব নতুন ব্যাংকের আওতায় এসেছে। কিন্তু পুরোনো অ্যাকাউন্ট, চেক বই, ডিপিএস-এফডিআর, শাখা ও গ্রাহকের তথ্য কীভাবে একটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে একীভূত হচ্ছে-এ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ জন্য ধাপে ধাপে হিসাব স্থানান্তর, নতুন হিসাব নম্বর তৈরি, পুরনো চেক বই ব্যবহারের সুযোগ এবং ব্যাংকের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একীভূত করার কাজ চলছে।
গত ১৬ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের জন্য আগামী ১ তারিখ থেকে আমানত ফেরত বা নির্দিষ্ট সীমার টাকা লেনদেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সাধারণ গ্রাহকরা তাদের জমা রাখা অর্থ ধাপে ধাপে তোলার সুযোগ পাবেন, যা দৈনন্দিন আর্থিক চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে।
আর্থিক সংকটে থাকা এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে। এসব ব্যাংককে ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় রয়েছে সারা দেশে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৯৭৫টি এটিএম বুথ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ওই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। যা তাদের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে যুক্ত হওয়ার কথা। নতুন ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও দৈনিক বা মাসিক সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটা করা হয়েছে যাতে একসাথে অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয় এবং তারল্য স্বাভাবিক থাকে। প্রথম দিকে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। গ্রাহকদের ব্যাংক শাখায় গিয়ে বা নির্ধারিত ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করার এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার পর প্রশ্ন উঠছে, ব্যাংকগুলোর পাঁচ রকম অ্যাকাউন্ট, চেক বইসহ সমস্ত নথি কীভাবে মার্জ করা হবে?
আতিকুল ইসলাম নামের একজন গ্রাহক চরচাকে বলেন, “আমার অ্যাকাউন্ট আছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। এখন নতুন চালু হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে কীভাবে আমার অ্যাকাউন্ট নিয়ে আসা হবে, পুরনো চেক বই দিয়ে টাকা তুলতে পারব কি না, আগের ডিপিএসের কী হবে এসব বিষয়ে আমি চিন্তিত। আর চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। এই পর্যন্ত সরকার একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছে যে এবার টাকা তুলতে পারব। কিন্তু বারবার ব্যাংক গিয়ে ফেরত এসেছি।”
মোবাররক হোসেন নামের আরেকজন গ্রাহকও একই রকম কথা বলছেন। তিনি চরচাকে বলেন, “সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে আমার অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা আছে। আমি বর্তমানে খুব সংকটে আছি। এখনো টাকা তুলতে পারছি না। বারবার ব্যাংক গিয়ে ফেরত আসছি। তাই এখন সরকারের এসব আশার বাণী শুনে ভালো লাগছে না। নতুন ব্যাংকে আমাদের অ্যাকাউন্টের কী হবে, সেটাও বুঝছি না।”
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিষয়ে গ্রাহকদের নিশ্চয়তা দিয়ে বলছে, ব্যাংক মার্জে গ্রাহকদের কোনো সমস্যা হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: বাসস
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “ইতোমধ্যেই প্রযুক্তিগত সিস্টেম ডেভলপমেন্ট শেষ পর্যায়ে রয়েছে। গ্রাহককে যেন কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত জটিলতায় না পড়তে হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাংক পরিবর্তনটি যতটা সম্ভব সহজে করা সম্ভব, সেটা করা হচ্ছে। আগের ব্যাংকগুলোর তথ্য ও অ্যাকাউন্ট নিরাপদে স্থানান্তর করাই এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। আশা করি, কোনো সমস্যা হবে না।”
পুরোনো ব্যাংকের হিসাব যাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহককে আবার নতুন করে হিসাব খুলতে হচ্ছে না। আগে যে ব্যাংকে সঞ্চয়ী, চলতি বা অন্য কোনো ধরনের হিসাব ছিল, সেই হিসাবের তথ্য নতুন ব্যাংকের ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। এই স্থানান্তরের সঙ্গে গ্রাহকের নামে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন হিসাব নম্বরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে।
সহজভাবে বললে, একজন গ্রাহকের পুরনো ব্যাংকে যে হিসাব ছিল, সেটি বন্ধ করে নতুন ব্যাংকে গিয়ে আবার হিসাব খোলার প্রয়োজন হচ্ছে না। বরং পুরনো হিসাবের তথ্য ও জমা থাকা অর্থ নতুন ব্যাংকের হিসাব ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হচ্ছে।
পুরোনো চেক বই দিয়েই টাকা তোলার সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, হিসাব সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তর হলেও গ্রাহকদের হাতে থাকা পুরনো চেক বই তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হচ্ছে না। স্থানান্তর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পুরনো ব্যাংকের চেক বই ব্যবহার করে টাকা তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে। শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, পুরনো চেক বই দিয়ে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা যাবে। তবে সম্প্রতি জানা গেছে, পুরনো চেক বই দিয়ে গ্রাহক যত ইচ্ছা তত টাকা তুলতে পারবেন।
পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেক বই দেওয়ার মাধ্যমে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা পরিবর্তন করার কথা রয়েছে। তাই ধীরে ধীরে পুরনো পাঁচ ব্যাংকের চেক বইয়ের পরিবর্তে নতুন ব্যাংকের চেক বই চালু হবে।
হিসাব সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তর হলেও গ্রাহকেরা পুরনো চেক বই দিয়ে টাকা তুলতে পারবেন। ছবি: সংগৃহীত
ডিপিএস ও এফডিআরের কী হবে
পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের বড় একটি অংশের অর্থ রয়েছে ডিপিএস, এফডিআরসহ বিভিন্ন মেয়াদি আমানত হিসাবে। এসব হিসাবও একীভূত প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া কাঠামো অনুযায়ী, পুরনো ব্যাংকের এসব আমানত নতুন ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ গ্রাহকের ডিপিএস বা এফডিআর হারিয়ে যাচ্ছে না বা একীভূত হওয়ার কারণে নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে না।
তবে এসব আমানত থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের মতো অবাধ সুযোগ রাখা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ব্যবস্থায় মেয়াদপূর্তির পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে টাকা তোলার সুযোগ এবং বাকি অর্থ নির্ধারিত নিয়মে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমানতের ওপর মুনাফা পাওয়ার বিষয়টিও নতুন ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামোর আওতায় এসেছে।
২০২৬ সাল থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের জন্য সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ মুনাফার হার নির্ধারণের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থাৎ একজন গ্রাহকের পুরনো ব্যাংকে থাকা ডিপিএস বা এফডিআর নতুন ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে যাওয়ার কারণে বাতিল হয়ে যাচ্ছে না। বরং হিসাবের তথ্য ও অর্থ নতুন ব্যাংকের ব্যবস্থায় নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়মে সেটি পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুরনো শাখাগুলো কীভাবে মার্জ করবে
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো একীভূত করার বিষয়টিও ধাপে ধাপে করা হচ্ছে। আগে একই এলাকায় পাঁচ ব্যাংকের আলাদা আলাদা শাখা ছিল । কিন্তু নতুন একটি ব্যাংক গঠনের পর একই এলাকায় একই ধরনের একাধিক শাখা রাখার প্রয়োজন থাকে না। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্কও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র আরও জানায়, একই এলাকায় একাধিক শাখা থাকলে সেগুলো ধাপে ধাপে একীভূত করে প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর শাখা রাখা হবে। এর অর্থ হলো, কোনো গ্রাহকের পুরনো শাখা ভবিষ্যতে বন্ধ বা অন্য শাখার সঙ্গে একীভূত হতে পারে। তবে এর ফলে গ্রাহকের হিসাব বন্ধ হয়ে যাবে না। হিসাবটি নতুন ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে থাকবে এবং গ্রাহককে নির্ধারিত শাখা থেকে ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এখানে মূল বিষয় হলো-শাখা একীভূত হওয়া আর গ্রাহকের হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। শাখা পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু গ্রাহকের আমানত ও হিসাব নতুন ব্যাংকের ব্যবস্থায় বহাল থাকবে।
পাঁচটি ব্যাংক আলাদা আলাদাভাবে পরিচালিত হওয়ায় তাদের ব্যাংকিং প্রযুক্তি ও কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার এক রকম ছিল না। তাই শুধু পাঁচটি ব্যাংকের নাম এক করে একটি নতুন নাম দেওয়াই একীভূতকরণের পুরো কাজ নয়। গ্রাহকের হিসাব, আমানত, ঋণ, লেনদেনের ইতিহাস, ডিপিএস, এফডিআর, চেক এবং অন্যান্য তথ্যকে একটি সমন্বিত ব্যাংকিং সিস্টেমে নিয়ে আসাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাকে একীভূত করার কাজও এই প্রক্রিয়ার অংশ। তাই পাঁচ ব্যাংকের আলাদা ইনফরমেশন সিস্টেমকে শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হবে।