সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনই উত্তাপ ছড়াল আইনসভায়। আজ বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্য ঘিরে সংসদে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলকে ‘তাচ্ছিল্য’ করেছেন-এমন অভিযোগে তীব্র আপত্তি জানান জামায়াতের ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সদস্যরা। তাদের আপত্তি, হইচই, হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট আইনসভা কার্যত অচলাবস্থায় ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করার কথা বললেও তাতে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বারবার চেষ্টা করে বিফল হন খোদ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ‘কিছুটা চিন্তিত’।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্ব চলার সময় এ ঘটনা ঘটে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, দিনে-দুপুরে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই ও রাহাজানি হচ্ছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা হচ্ছে। সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হলেও আসামিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তার।
মাসুদ বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে যাচ্ছেন, তাকে কেন্দ্র করে ‘ভুয়া’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। তিনি এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রথম এক মিনিট অমনোযোগী ছিলেন। প্রশ্নটি আবার করার অনুরোধ করেন।
পরে শফিকুল ইসলাম মাসুদ আবার প্রশ্নটি করেন।
আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। আজকে যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করেছি, এটি সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়।
জবাতে দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “শাহবাগে গিয়ে বক্তৃতা, আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা এক কথা নয়।” তার এ মন্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ ও হইচই শুরু করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে বলিনি। আমি তো আপনারা কথা বলার সময় কথা বলিনি! মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার শেল্টার চাচ্ছি।” এ সময় স্পিকার বিরোধীদলের সদস্যদের শান্ত হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার আহ্বান জানালেও হইচই চলতে থাকে।
একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ইয়েস, আই উইথড্র! ঠিক আছে?” হট্টগোলের মধ্যে কথা বলতে না পেরে এক পর্যায়ে বসে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, “এটা প্রশ্ন হলো না পল্টনের বক্তৃতা হলো, বুঝতে পারিনি।” হাসনাতের প্রশ্নের জবাবের সময় কয়েকজন মৃদু আপত্তি জানালেও শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাবের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান বিরোধী সদস্যরা।
একপর্যায়ে স্পিকারকে কয়েকবার বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, হয়েছে তো, অনেকক্ষণ বলেছেন। এখন আপনারা অনুগ্রহ করে বসুন। অনুগ্রহ করে নিজের আসনে বসুন।” কিন্তু বিরোধীদলের সদস্যরা কেউ স্পিকারের কথা না শুনে হইচই চালিয়ে যেতে থাকেন। স্পিকার তাদের উদ্দেশে বলেন, “এইভাবে ঢালাও না বলে মাইকে বললে তো সবাই শুনতে পায়। আপনাদের সুযোগ দেওয়া হবে। যখন সুযোগ পাবেন, মাইকে বলবেন।”
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “যেখানে আপনাদের বিরোধীদলের চিফ হুইপ দাঁড়িয়েছেন, সামনের সারির সদস্যরা দাঁড়িয়েছেন, তখন অনুগ্রহ করে পেছনের সারি থেকে বক্তব্য দেবেন না। আপনাদের নেতারা কী বলেন, সেটা শোনার চেষ্টা করবেন। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। প্রচুর সুযোগ আছে আপনাদের জন্য। এই সংসদে বক্তব্য দেওয়ার প্রচুর সুযোগ আছে।”
স্পিকার বলেন, “এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছেমতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, বসুন প্লিজ। অপেক্ষা করুন।” একপর্যায়ে স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি বিরোধী দলীয় নেতাকে সুযোগ দেবেন।
এরপরও হইচই চলতে থাকলে স্পিকার বলেন, “বসুন, প্লিজ অপেক্ষা করুন। আপনাদের স্পিকারের আসন থেকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে, অনুগ্রহ করে বসুন। আপনারা তো উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাবেন। শোনেন, আপনারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্তর শুনুন। তারপর যদি প্রয়োজন হয়, আপনারা বলতে পারবেন।”
একইসঙ্গে তিনি বলেন, “কিন্তু এই যে স্পিকারের কথা বলার সময় যে জোশটা আপনারা দেখাচ্ছেন, এটা সংসদীয় কাজ নয়। সংসদে সংসদের রীতিনীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আপনাদের কাছ থেকে আমি সহযোগিতা কামনা করছি।”
বিরোধী দলের হইচইয়ের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করেন। তখন স্পিকার তাকে তার (স্পিকার) দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। বিরোধী দলের সদস্যরা তখনো দাঁড়িয়ে হইচই করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। তাদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, “আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধী দলের নেতাকে দেব।”
হট্টগোলের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, কোথায় ছিনতাই হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হয়নি—এগুলো ঢালাও না বলে সুনির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করতে হবে। সে জন্য তিনি বলেছেন, এটা জাতীয় সংসদ।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে সুযোগ দেন স্পিকার। বক্তব্যের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “আমাকে আগে সুযোগ দিলে ওনার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কথাটা শুনতে পেতাম।” এ সময় সরকারি দলের সদস্যদের অনেকে বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে কথা বলতে থাকেন।
তখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “বক্তব্য কি আপনি দেবেন, না আমি দেব? আপনি দেন।”
স্পিকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “এটা অশুভ। আমার বক্তব্যের সময় যদি এভাবে কমেন্টস করা হয়, তাহলে আমার এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।”
তখন স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, “আমি সম্মানিত সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, আজকে নতুন করে তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন নাই। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন সবাইকে। উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “এমনকি তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সেই দুঃসাহস এখানে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন, ওখানে যার পছন্দ গিয়ে ভর্তি হবে ওনার লেকচার শুনবে। আমার সঙ্গীরা তো মনে করে, আমি নিজেও মনে করি যে এইটা কালচারাল না, এইটা পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম। এটা হওয়া উচিত না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ এবং তার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান জামায়াত শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “এইটুকু করা হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে থাকবে। না হলে অপমান নিয়ে এখানে বসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”
‘সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত’
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদে জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন করার জন্য সবাই কাজ করছেন। কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ করা না হলে সংসদ কার্যকর থাকে না।
স্পিকার বলেন, “আমি গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, ক্রমেই কিছু কিছু সদস্যের মধ্যে আমি অসহিষ্ণুতা লক্ষ করছি। জাতীয় সংসদ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এখানে প্রত্যেকেরই কথা বলার স্বাধীনতা আছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পরীক্ষা করে অসংসদীয় কিছু থাকলে এক্সপাঞ্জ করা হবে জানিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কিন্তু কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করবেন না। আপনারা যে কয়জন আছেন, তার দ্বিগুণ–তিন গুণ এ পাশে (সরকারি দলে) আছে। সুতরাং শব্দ করে এর বাণীকে স্তব্ধ করা যাবে না। আমাকে সংসদ পরিচালনা করতে দিন।”
পরে বিরোধীদলীয় নেতা স্পিকারের বক্তব্যের জবাবে বলেন, “আজকের বিষয়টা একবারে স্পষ্ট। এটা তো আর পরীক্ষা করে দেখার কোনো বিষয় নেই। শেষের দিকে কনক্লুশনে গিয়ে একটু বললেন যে এই দিকের চাইতে ওই দিকে তিন গুণ আছেন। এটা তো ভালো লাগল না। আমি এই সংসদকে কোনো গুণে বিভক্ত করার পক্ষে নই। আমরা প্রথম দিক থেকে বলেছি, ভালো কাজে আমরা সবাই এক হব। একসঙ্গে কাজ করব। অন্যায় কিছু হলে আমরা প্রতিবাদ করব।”
পরে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। আজকে যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করেছি, এটি সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়। অনেক কষ্টের পর গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। এই গণতন্ত্র যাতে বহাল থাকে, সে জন্য সংসদের প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব এখানে রয়েছে।”