১৯৯৮ সালে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ৯০তম জন্মদিনে আধুনিক সময়ে তার পছন্দের দুই ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার ও শেন ওয়ার্নকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরে দ্য গার্ডিয়ান-কে সেখানে কিংবদন্তির সঙ্গে আলোচনার একটি অংশ নিয়ে শচীন বলেছিলেন, তিনি ব্র্যাডম্যানকে প্রশ্ন করেন, “স্যার ডন, আপনি যদি এই সময়ে খেলতেন, তাহলে আপনার গড় কত হতো?” নির্লিপ্ত গলায় তিনি বলেন, “সম্ভবত ৭০।” শচীন কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন, “৭০ কেন? আপনার আসল গড় তো ৯৯।” ব্র্যাডম্যানের উত্তর ছিল, “আরে, একটা ৯০ বছর বয়সী মানুষের জন্য ৭০ গড়ও তো খারাপ না!”
তর্কাতীতভাবে ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে কেন এখনো ব্র্যাডম্যানের নামটাই আপনার চোখে ভেসে উঠবে, সেটা তিনি নিজেই এভাবে বলে দিয়েছেন। একজন ক্রিকেটারের নিজের সামর্থ্যে সর্বোচ্চ বিশ্বাস থাকলে আর ব্যাটিংকে ভীষণ সহজ বানিয়ে ফেললেই কেবল এভাবে ভাবা সম্ভব। ব্যাটিং আর ব্র্যাডম্যান এই কারণেই সমার্থক হয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়।
১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট জন্ম নিয়েছিলেন স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান। ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাটসম্যানদের একজন তিনি। মাত্র ৫২ টেস্টে ৯৯.৯৪ গড়ে ২৯ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৬ হাজার ৯৯৬ রান। ব্যাট হাতে অসাধারণ সব কীর্তির বাইরেও অস্ট্রেলিয়ার এই কিংবদন্তিকে ঘিরে রয়েছে মজার সব ঘটনা।
চরচার আজকের আয়োজনে তুলে ধরা হলো মাঠে ও মাঠের বাইরে ব্র্যাডম্যানের এমন পাঁচটি ঘটনা–
সাধারণ জুতা পরেই ৪৬ রান
১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের দুই দিন আগে স্থানীয় দল ব্রোকেন হিলের বিপক্ষে নেমেছিলেন ব্র্যাডম্যান। দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে শুরুতে তাকে রাখা হলেও একজনের চোটে একাদশে জায়গা পান। উল্লেখ্য, সেই ম্যাচটি ছিল কঙ্ক্রিটের উইকেটে।
ক্রিজে গিয়ে ব্র্যাডম্যান পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন, তার বুটের স্পাইক পিছলে যাচ্ছিল। মানিয়ে নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সাধারণ জুতা পরেই ব্যাট করতে নেমে যান। যে কঙ্ক্রিটের ওপর দাঁড়ানোই ছিল প্রায় অসম্ভব কাজ, সেখানেই ব্র্যাডম্যান অবিশ্বাস্যভাবে করে ফেলেন ৪৬ রান!
১৮ মিনিটে সেঞ্চুরি
টেস্টে ৯৯.৯৪ গড় নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ছবি : অস্ট্রেলিয়ান ফটোগ্রাফি
৯৯.৯৬ গড় থাকার পরও প্রায়ই ব্র্যাডম্যান আধুনিক যুগে কেমন করতেন বা কত ভালো হতে পারতেন, তা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। তবে ইতিহাস বলছে, পাওয়ার হিটিংয়ের এই সময়েও সম্ভবত তিনি রাজত্ব করতে পারতেন।
১৯৩১ সালের মধ্যে ব্র্যাডম্যান বড় তারকা হয়ে গেছেন। ব্ল্যাকহিথের হয়ে লিথগোর বিপক্ষে একটি ম্যাচে খেলছিলেন, যে দলে ছিলেন অফস্পিনার বিল ব্ল্যাক। তিনি সেই বোলার, যিনি সেই বছর ব্র্যাডম্যানকে একবার আউট করেছিলেন। তাকে আউট করা সেই বলটি পরে সংরক্ষণ করা হয় এবং ম্যাচের আগে ব্র্যাডম্যানকে দেখানো হয়। কিন্তু এটা তার মনেই ছিল না।
তাই বিল ব্ল্যাক বোলিংয়ে আসলে তিনি উইকেটকিপারের কাছে জানতে চান বোলারের ব্যাপারে। উইকেটকিপার তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “এই লোকটার কথা মনে নেই তোমার? কয়েক সপ্তাহ আগে সে তোমাকে আউট করেছিল। আর তখন থেকেই এটা নিয়ে খুব বড়াই করছে।”
ব্র্যাডম্যান এর জবাব দেন ব্যাট দিয়ে। সেই যুগে ওভার হতো ৮ বলে। পরের তিন ওভারেই তিনি পা রাখেন সেঞ্চুরিতে। মাত্র ১৮ মিনিট আর ২২ বলে করেন শতক। এর মধ্যে বিল ব্ল্যাক দুই ওভারে ৬২ রান দেন। ব্র্যাডম্যান তাকে এতটাই পেটান যে, বাধ্য হয়ে অধিনায়কের কাছে তাকে বোলিং থেকে সরিয়ে নেওয়ার আবেদন করেন।
সেই ইনিংসে ব্ল্যাকহিথের ৩৫৭ রানের মধ্যে ব্র্যাডম্যান একাই করেন ২৫৬ রান, যা তিনি সাজান ২৯টি চার ও ১৪টি ছক্কায়।
৬৮ বছর বয়সে প্যাড-গ্লাভস ছাড়া ব্যাটিং
সময়টা ১৯৭৭-৭৮। জেফ থমসন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের মাঝে এতটাই আতঙ্ক তৈরি করে ফেলেছিলেন যে, অনেকেই তার বিপক্ষে ব্যাটিংই করতে চাইতেন না। নেটে এমনকি তার সতীর্থরাও না।
তবে তার প্রায় ৩০ বছর আগে ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ব্র্যাডম্যানের জন্য বিষয়টি ছিল খুব সহজ। তাই ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর চলাকালীন ব্র্যাডম্যান ঠিক করলেন, তিনি থমসনের বিপক্ষে ব্যাট করবেন।
৭৮ বছর বয়সে প্যাড-গ্লাভস ছাড়াই ব্যাট করছেন ডন ব্র্যাডম্যান। ছবি : ফেসবুক
কাছ থেকে সেই ঘটনা দেখা ভারত দলের তৎকালীন অধিনায়ক বিষান সিং বেদি পরে এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “সেদিন আমরা যা দেখেছিলাম, সেটা ছিল স্রেফ জাদু। তার পায়ে প্যাড ছিল না, হাতে কোনো গ্লাভস ছিল না, এমনকি কোনো বক্সও ছিল না। থমসন লেগ ও মিডলের দিকে একটা বল করল, আর ব্র্যাডম্যান অনায়াসে সেটা অন-ড্রাইভ করে দিলেন।”
এরপর থমসনকে উল্লেখ করে ব্র্যাডম্যান বলেছিলেন, “আমার জন্য মিড-অনে একটা ফিল্ডার রাখার শিক্ষা এবার তোমার হলো তো!”
থমসন পরে ইএসপিএনক্রিকইনফোকে সাক্ষাৎকারে ঘটনাটি স্মরণ করেছিলেন, “সত্যি বলতে আমি তাকে শুধু লেগ স্পিন করছিলাম। তবে পেস বোলিংয়ে দুজন তরুণকে দিয়ে তাকে আউট করার চেষ্টা করছিলাম। কোনো প্যাড নেই, কিছুই নেই! তবুও ৬৮ বছর বয়সী একজন মানুষ টার্ফ উইকেটে তাদের বেদম পেটাল। অথচ এই লোকটা ২০ বছর ব্যাটই করেনি। আমি ভেতরে গিয়ে দলের অন্যদের বলেছিলাম, ‘এই লোকটা আগামীকাল আমাদের সঙ্গে খেলছে না কেন?’”
ব্র্যাডম্যানকে দেখতে জেলে মহাত্মা গান্ধীর ছেলে
একদিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতে চলছিল স্বাধীনতার লড়াই, অন্যদিকে ক্রিকেট মাঠে ব্র্যাডম্যান ইংলিশদের নাস্তানাবুদ করে চলেছেন। ফলে ভারতীয়দের কাছে ব্র্যাডম্যান খুব প্রিয় ছিলেন। সেই দলে ছিলেন গান্ধীর কনিষ্ঠ ছেলে দেবদাস, যিনি আবার একনিষ্ঠ ক্রিকেটপ্রেমীও।
১৯৪৮ সালে হিন্দুস্তান টাইমস-এর ম্যানেজিং এডিটর হিসেবে কর্মরত দেবদাস একটি বৈঠকে অংশ নিতে অবস্থান করছিলেন ইংল্যান্ডে। একই সময়ে ব্র্যাডম্যান খেলছিলেন তার শেষ সিরিজ।
দেবদাসের কাছে তাই মনে হয়েছিল, ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং দেখার এটাই শেষ সুযোগ। তাই একটি সৌজন্য পাস জোগাড় করে তিনি নটিংহামে পৌঁছালেন টেস্ট ম্যাচ দেখতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন, শহরের সব হোটেলে থাকার জায়গা পূর্ণ।
কিন্তু ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং তো দেখতেই হবে। তাই উপায়ান্তর না পেয়ে নটিংহামে জেলখানার ওয়ার্ডেনকে রাজি করিয়ে কাউন্টি জেলে একটি বিছানা জোগাড় করেন তিনি। সেখানেই রাত কাটিয়ে টেস্ট দেখতে যান। তার এই কষ্ট বিফলে যায়নি। সেই ম্যাচে ব্র্যাডম্যান করেন ১৩৮ রান।
ব্যাটিং দেখতে দেখতে দর্শকরাও ক্লান্ত
ব্র্যাডম্যান তার ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় পার করেন ধারাবাহিকভাবে রান করে। ফলে প্রতিপক্ষ দল তো বটেই, দর্শকদের জন্যও এটা বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠত। ১৯৩৪ সালেই যেমন। ওরচেস্টারশায়ারের বিপক্ষে সেবার তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন ব্র্যাডম্যান। এর মধ্যে ২০৬ রানের একটি ইনিংস খেলার পথে বিরক্ত দর্শক চিৎকার করে নাকি বলেছিলেন, “দয়া করে তাকে ৩০০ করতে দিন, তারপর বলুন আউট হতে!”
এর চার বছর আগে নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুইন্সল্যান্ডের ম্যাচে অপরাজিত ৪৫২ রান করেছিলেন, যা ছিল তখনকার সময়ের সর্বোচ্চ প্রথম শ্রেণির স্কোর। জানা যায়, বিরক্ত হয়ে কুইন্সল্যান্ডের এক নারী সমর্থক নাকি বলেছিলেন, “অন্য কাউকে কি একবার ব্যাট করতে দেওয়া যায় না? এই লোকটার ব্যাটিং দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি!”