কবি নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই কেউ কেউ বলা শুরু করেছিলেন, নজরুল সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সিফিলিস হলো একটি সংক্রামক যৌনবাহিত রোগ। ‘ট্রেপোনেমা প্যালিডাম’ নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এই রোগ হয়। নজরুলের সিফিলিস ছিল–এই আলাপটি আরও জোরালো করে তোলেন কলকাতার লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. গিরীন্দ্রশেখর বসু ও ডা. সেনগুপ্ত। ১৯৪২ সালের অক্টোবরে অসুস্থ কবি নজরুলকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এই দুই চিকিৎসক কবির শরীরে নিউরো সিফিলিস ডায়াগনোসিস করে চিকিৎসা দিয়েছিলেন। ফলে অনেকে ধরেই নেয়, কবির যদি সিফিলিস না থাকত, তাহলে সেই রোগের চিকিৎসা দেওয়া হলো কেন?
একটু পেছনে ফিরে যাই, ১৯৩০ সালে কবি তার পুত্র বুলবুলকে হারান। এই ঘটনায় তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান। লন্ডনের সেন্ট্রাল মিডলসেক্স হাসপাতালের জেরিঅ্যাট্রিক্স বিভাগের দীর্ঘদিনের পরামর্শক ড. মুহাম্মদ নূরুল হকের মতে, এই ঘটনার পর থেকেই কবি হ্যালুসিনেট করা শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে কবি তার মৃত ছেলেকে জীবিত দেখেছেন বলে দাবি করেন। কয়েক বছর পর তিনি আল্লাহর সাক্ষাৎ পাওয়ার কথাও জানান। এর মধ্যেই শুরু হয় আর্থিক অনটন। ১৯৩৯ সাল থেকে তার আর্থিক সংকট তীব্র হতে শুরু করে।
কবি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাকে তার আশপাশের লোকজন ঠকাচ্ছে। সবাইকেই তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন। ১৯৪২ সালের জুলাইয়ে তিনি হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন তখন থেকেই দেখা দিতে থাকে। অসংলগ্ন কথাবার্তা, খিটখিটে মেজাজ, কখনো কখনো মারমুখী আচরণও করতেন। ডা. মুহাম্মদ নূরুল হক তার ‘নজরুলের কী রোগ হয়েছিল?’ শিরোনামের প্রবন্ধে লিখেছেন, কবির এই অবস্থাকে ‘সাইকোসিস বলা যেতে পারে।
কবি নজরুল ১৯৪২ সালের জুলাইয়ে বন্ধু জুলফিকার হায়দারকে লেখা এক চিঠিতে জানান, তার ব্লাড প্রেশার লো, মাথায় যন্ত্রণা, হাতকাঁপা, জিভের আড়ষ্টতা দেখা দিয়েছে। তখনই তাকে ভর্তি করা হয়েছিল লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালে। সেখানে সিফিলিস রোগের চিকিৎসা হিসেবে কবিকে আরসেনিক দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। তাতে কবির অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায় বলে দাবি ড. নূরুল হকের।
১৯৫২ সালে কবিকে নেওয়া হয় রাঁচির মানসিক হাসপাতালে। কোনো উন্নতি না হওয়ায় ১৯৫৩ সালের মে মাসে তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার লন্ডন ক্লিনিক হাসপাতালে তার চিকিৎসা শুরু হয়। ব্রিটিশ চিকিৎসকরা জানান, বিদ্রোহী কবি আলজেইমার ডিমেনশিয়ার মতো মস্তিষ্ক শুকিয়ে যাওয়ার রোগে আক্রান্ত। সেখান থেকে কবিকে নেওয়া হয় অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান, কবির রোগের নাম ‘পিক্স ডিজিজ’। আরও জানিয়ে দেওয়া হয়, এই রোগ ভালো হওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই।
১৯৬৬ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ডা. দ্বিজন্দ্রকুমার রায় কবির দেখভাল করেছেন। তিনি বলেছিলেন, কবি যে রোগে আক্রান্ত, সেই রোগ একেবারে নতুন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এই রোগের কারণ বের করতে পারেনি। এখন ড. হকসহ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নজরুল ‘ডিমেনশিয়া অব লিউয়ি বডিস’ বা ‘ডিএলবি’ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। লিউয়ি বডিস হলো এক ধরনের অস্বাভাবিক প্রোটিন, যা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে জমে যায়। এর ফলে রোগীর ভয়, উদ্বেগ, বিষাদ, মূত্রত্যাগে সমস্যা, হাতকাঁপা, দিবাস্বপ্ন, স্মরণশক্তি লোপ ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়।
যা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তখন অনেকে মনে করতেন, কবি সিফিলিসে ভুগছিলেন। লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালের ডা. গিরীন্দ্রশেখর বসু ও ডা. সেনগুপ্তের মতো চিকিৎসকের মতো বিধান রায়ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, কবির সিফিলিস হয়েছে। কবি নজরুলের জীবনীকার গোলাম মুরশিদের ধারণা, এই চিকিৎসক সে অনুযায়ী চিকিৎসাও করেছিলেন। ফল হলো উল্টো, কবি বিড়বিড় করতেন, তাও বন্ধ হয়ে যায়।
নজরুলের সিফিলিস হয়েছে এই ধারণা কোথা থেকে এল? কবির দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসক ডা. ডি কে রায় জানিয়েছিলেন, অনেকে ধরেই নিয়েছিল, যেহেতু কবি সৈনিকের পেশায় ছিলেন সেহেতু সিফিলিস রোগ থেকেই তার ‘জেনারেল প্যারালাইসিস অব ইনসেন্স’ হয়ে থাকতে পারে।
ডা. রায় ১৯৯৯ সালে স্টেটসম্যান পত্রিকায় লিখেছেন, “কারও মনে করা ঠিক হবে না যে, তিনি (কবি) কখনো সিফিলিসে ভুগেছেন। তাঁর প্রি-সেনাইল ডিমেনশিয়া হয়েছিল।” এই আহ্বানে খুব একটা কাজ হয়েছিল বলে মনে হয় না। সিফিলিস হয়েছে–কথাটি প্রচার হয়ে যাওয়ার পর অনেক ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী কবির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন, যে কবি তার সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই বাঙালির জন্য। অসুস্থতাকে সঙ্গী করেই ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গোলাম মুরশিদের মতে, কবির অসুস্থতার কারণ নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তার সমাধান আর হয়নি। হবেও না। এখনো এ নিয়ে কথা হয়। আমার ব্যক্তিগত মত, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, কবির সিফিলিস ছিল, তাতে সমস্যাটা কোথায়? মানুষের কি এই রোগ হতে পারে না? এই রোগ হলে কি কারও মূল্য কমে যায়? এই রোগ হলে লোকটি খারাপ, এই রোগ না হলে লোকটি পূজনীয়–এ কেমন দৃষ্টিভঙ্গি?
সহায়ক গ্রন্থ:
১. কবি নজরুলের অসুস্থতা: তর্ক-বিতর্ক ও দলিলপত্র, ইসরাইল খান সম্পাদিত
২. বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল-জীবনী, গোলাম মুরশিদ
৩. আবদুল মান্নান সৈয়দ রচনাবলি (৫ম খণ্ড)রে’