নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে গত বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, প্রায় ১২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে এই বিপর্যয়ের সূচনা হয়ে থাকতে পারে। বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তবে হিমবাহটি কেন ধসে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।এই বিপর্যয়ের কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। নেপালের বিশেষজ্ঞরা সেটিকেও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুই দেশের কর্তৃপক্ষই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩০০-এর বেশি পর্যটক ও যাত্রী।
স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ধ্বংসের চিত্র
বিপর্যয়ের আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। প্ল্যানেট ল্যাবসের সেই ছবিতে দেখা গেছে, আগে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ এখন বাদামি ধ্বংসাবশেষ ও পলিতে চাপা পড়ে গেছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত বলেন, হিমবাহের সামনের দিকের একটি বড় অংশ ধসে পড়েছিল-এটি নিশ্চিত। এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।
কানাডার ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও এই ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তুষার গলে যাওয়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আগের দিন উপত্যকার কয়েকটি হিমবাহ বরফে ঢাকা ছিল। কিন্তু পরদিন সেগুলোর বেশিরভাগই খোলা বরফে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য এখনো না পেলেও তার ধারণা, ওই এলাকায় তাপমাত্রা সম্ভবত বেশি ছিল।
শুগার আরও বলেন, বুধবার সকালের প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইটচিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে প্রায় ১২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে।
তবে নির্মাণকাজও এই ঘটনায় কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, শুগার তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও ভবিষ্যতে তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন নিখোঁজ। ছবি: রয়টার্স
জলবায়ু পরিবর্তনের আশঙ্কা
নেপালের তুষারে ঢাকা পাহাড়গুলো গত ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে বলে ৩ বছর আগে জানিয়েছিল জাতিসংঘ।
ওই বছর সংস্থাটি আরও জানিয়েছিল, নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় গত দশকে ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুত গলেছে। কার্বন নিঃসরণে বিশ্বের অন্যতম বড় দুই দেশ ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখে রয়েছে।
তবে এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
‘বরফ-পাথরের ধস’ থেকেই বন্যা?
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নেপালের পার্বত্য জেলা রাসুয়া। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এই জেলায় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের একটি প্রবেশপথ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে ‘হিমবাহ-সম্পৃক্ত বন্যা’ তৈরি হয়।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই এলাকার ভূমিকম্প একটি তুষারধস ঘটিয়ে বন্যার সূত্রপাত করতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল বলেছেন, ভূমিকম্পটিই বিপর্যয়ের কারণ কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইটচিত্র পর্যালোচনা করা পোখরেল বলেন, নেপালের অংশে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
নদীতে কয়েক মিনিটেই বাড়ল পানি
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্র জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার মতো দুর্যোগের সংখ্যা এবং তীব্রতা বাড়ছে। পানি, ভূমি ও বায়ুতে দ্রুত পরিবর্তন পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
সংস্থাটি বুধবার জানায়, আকস্মিক বন্যার শক্তিশালী পানির স্রোত পলি ও বড় বড় পাথর সঙ্গে নিয়ে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নেমে আসে।
নদীর আরও নিচের দিকে গালছী এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পাহাড়ের ওপর হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়া, তার সঙ্গে পাথর ও পলি নেমে আসা এবং মুহূর্তের মধ্যে নদীতে বিপুল পানির স্রোত- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই ভয়াবহ বিপর্যয়। এখন উদ্ধারকাজের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা খুঁজে দেখছেন, ঠিক কী কারণে হিমবাহের ওই অংশ ভেঙে পড়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়।