ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক ড্যানেল ডি. বোটম্যানের দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে ক্যানসারের চিকিৎসায় মেসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ ভ্যাকসিনের অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং সেই সাথে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই শিক্ষাবিদের মতে, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে চিকিৎসাবিজ্ঞান যত দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, জনসাধারণের বিভ্রান্তি এবং ভ্রান্ত ধারণার কারণে সেই উদ্ভাবনের আসল সুফল অর্জনে বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে মডার্না ও মার্ক কর্তৃক ঘোষিত মেলানোমা নামক মারাত্মক ত্বকের ক্যান্সারের চিকিৎসায় তাদের যৌথভাবে তৈরি এমআরএনএ ভ্যাকসিন ‘ইনটিসমেরান অটোজিন’ ও ইমিউনোথেরাপি ওষুধ কিট্রুডার সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সাফল্যকে ভিত্তি করে লেখক এই বিশ্লেষণ করেছেন। বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অপপ্রচারের কারণে রোগীরা কীভাবে একটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সেটাই এই নিবন্ধের মূল উপজীব্য বিষয়।
ড্যানেল ডি. বোটম্যানের নিবন্ধ অনুসারে, বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ মূলত কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন প্রথম এমআরএনএ প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হলেও গবেষকরা বিগত কয়েক দশক ধরে এটি নিয়ে গভীর গবেষণা চালিয়ে আসছেন। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মস্তিষ্ক, স্তন, ফুসফুস, প্রোস্টেট এবং মেলানোমাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় ১২০টিরও বেশি প্রতিশ্রুতিশীল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়েছে। এই প্রযুক্তি যেভাবে কাজ করে তা অত্যন্ত আধুনিক ও সুনির্দিষ্ট। এমআরএনএ ভ্যাকসিন সরাসরি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কোষের ভেতরে নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা পাঠায়, যার ফলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম সেই নির্দিষ্ট প্রোটিন বা ক্যানসার কোষ চিহ্নিত করতে শেখে এবং সুস্থ কোষের কোনো ক্ষতি না করেই লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালায়।
বোটম্যান গ্লিওব্লাস্টোমার মতো আগ্রাসী ব্রেন টিউমারের উদাহরণ টেনে দেখিয়েছেন, কীভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পার্সোনালাইজড এমআরএনএ ভ্যাকসিন রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তিগত সাফল্য তখনই সার্থক হবে যখন রোগীরা এটি গ্রহণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগ্রহী হবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী অগ্রগতির পাশাপাশি অনলাইনে একটি ভয়াবহ মিথ্যা ছড়াতে শুরু করেছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘টার্বো ক্যানসার’ আখ্যান। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক বোটম্যান উল্লেখ করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যান্টি-ভ্যাকসিন প্রচারকারীরা ভিত্তিহীনভাবে দাবি করতে শুরু করে যে কোভিড-১৯ এমআরএনএ ভ্যাকসিন নেওয়ার ফলে মানুষের শরীরে অত্যন্ত দ্রুত ও আগ্রাসীভাবে ক্যানসারের বিকাশ ঘটছে।
২০২২ সালের শেষের দিকে এটি মূলধারার গণমাধ্যমে আলোচনায় আসে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লেখক ও তার গবেষণা দল ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত পরিচালিত সোশ্যাল লিসেনিং স্টাডিতে দেখেছেন কীভাবে অজস্র পোস্ট, আবেগময় ব্যক্তিগত গল্প, পশুদের ওপর করা গবেষণার ভুল ব্যাখ্যা, এবং বিভ্রান্তিকর বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করে ভ্যাকসিন সম্পর্কে ভয় সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের একজন বিতর্কিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ রাজ পরিবারের সদস্যদের ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পেছনে কোভিড ভ্যাকসিনকে দায়ী করে চরম বিতর্কের জন্ম দেন।
যদিও বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে করা একাধিক গবেষণা স্পষ্ট করেছে যে ভ্যাকসিনের সাথে ক্যানসারের কোনো সম্পর্ক নেই। তাও অপপ্রচার থেমে থাকেনি।
জনস্বাস্থ্য যোগাযোগের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে গবেষকরা একটি ‘ইনফোডেমিক’ বা তথ্য-মহামারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বোটম্যানের মতে, ভুয়া খবর যখন বারবার মানুষের চোখে পড়ে এবং আবেগময় গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যের চেয়ে অপপ্রচারই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে থাকে। বিশেষ করে এইচপিভি বা মানুষের প্যাপিলোমাভাইরাস ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা টেনে বোটম্যান দেখিয়েছেন যে, অনলাইনের নিরাপত্তা ভয়, কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কীভাবে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
ক্যানসার চিকিৎসায় যখন অপপ্রচারের প্রভাবে রোগীরা প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বদলে ভিত্তিহীন অলৌকিক চিকিৎসার দিকে ঝুঁকে পড়েন, তখন তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকেরা ইতিমধ্যে দৈনন্দিন সেবা প্রদানের সময় রোগীদের মনে এই সব ভুয়া খবরের নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করছেন, যা আধুনিক চিকিৎসার প্রসারে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ড্যানেল ডি. বোটম্যান জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেবল ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই ক্যানসারের মতো ব্যাধি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে পারবে না; তার সাথে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও জনসচেতনতার যোগসূত্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং এমআরএনএ প্রযুক্তি যখন নতুন এক যুগে পদার্পণ করছে, তখন বিভ্রান্তিকর তথ্য দূর করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসকদের আগাম ও স্বচ্ছ যোগাযোগের কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
চিকিৎসকদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে তারা রোগীদের দ্বিধা কাটিয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে পারেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণার অর্জিত জ্ঞান যদি ভিত্তিহীন অপপ্রচারের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, তবে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় মাইলফলকগুলোও মানবতার কল্যাণে ব্যর্থ হতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধুই গবেষণাগারের আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করছে না, বরং মানুষের আস্থা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঠিক বোঝাপড়ার ওপর সমানভাবে নির্ভর করছে।