অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত অ্যাশেজের দুটি টেস্টের মতো ম্যাকাই টেস্টের উইকেটও আলোচিত হয়েছে। মাত্র দুই দিনেই টেস্টটি শেষ হলেও ম্যাচ রেফারি এটিকে ‘খুব ভালো’ রেটিং দিয়েছেন। পুরোনো প্রশ্নটা তাই আবারও চলেই আসছে, আইসিসি কি পিচ রেটিংয়ে সবার জন্য একই নীতি মানছে?
এর উত্তরটা অবশ্য আগেই অন্যভাবে দিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রায় দেড় দিনে শেষ হয়ে যাওয়া এই ম্যাচকে কেউ যেন ভুলে না যান। যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় স্পিন উইকেটে এমন কিছু হলে বাড়তি সমালোচনা যেন না ধেয়ে আসে।
তবে বাস্তবতা খোদ আইসিসির তরফ থেকেই তো বছরের পর বছর ধরে ভিন্ন। বাংলাদেশ বা ভারতের মাটিতে অতিরিক্ত টার্নিং উইকেটে খেলা হলেই ‘পুওর’ রেটিং দেওয়া হয়। কিন্তু ইংল্যান্ড, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় গতিময়, বাউন্সি বা শতভাগ বোলিং-সহায়ক উইকেট প্রস্তুত করা হলেও সেটা নিয়ে হইচই সেভাবে হয় না বললেই চলে।
ম্যাকাই টেস্ট শেষ হয়েছে প্রায় দেড় দিনের মধ্যেই। ছবি : ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া
মিরপুরের উইকেটের আচরণ গত দুই বছরে অনেকটাই বদলে গেছে। তবুও এখনো এটিকে ‘ধানক্ষেত’ তকমা দেওয়া হয়। মূল কারণ একটা লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশের এখানে র্যাংক টার্নার বানিয়ে ম্যাচ জেতার মরিয়া চেষ্টা। ফলে প্রথম দিন থেকেই পেসাররা হয়ে যেতেন দর্শক আর দুই প্রান্ত থেকেই চলত সাঁড়াশি স্পিন আক্রমণ।
ভারত এবং পাকিস্তানের কিছু ভেন্যুতেও দেখা মেলে স্পিন-বিষে নীল হওয়া এমন উইকেটের। ব্যাটসম্যানদের প্রথম ঘণ্টা থেকেই দিতে হয় স্পিনের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা। ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলো তাই দক্ষিণ এশিয়া সফরে এসে স্পিন সামলাতে হিমশিম খেলেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। সাবেক ক্রিকেটার বা বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের উইকেটে ব্যাট ও বলের ভারসাম্য থাকে না।
আইসিসিও তাতে সায় দিয়ে ডিমেরিটস পয়েন্ট দিয়ে দেয়। অথচ ২০২২ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া যে ধরনের উইকেট বানিয়ে আসছে, সেটা নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য নেই। আরও বিশেষ করে গত ১২ মাসের মধ্যে ম্যাকাইসহ অস্ট্রেলিয়ায় তিনটি টেস্ট শেষ হয়েছে দুই দিনে, যা নিয়ে দেশটির মিডিয়াতেও নেতিবাচক আলোচনা চলছে। কিন্তু আইসিসির কাছে বরাবরই উইকেটের আচরণ খুব স্বাভাবিক লেগেছে। কেন, তার ক্রিকেটীয় যুক্তি আজও মেলেনি।
২০২৫-২৬ অ্যাশেজের দুই দিনে শেষ হওয়া ব্রিসবেন ও পার্থের একটি টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জিতলেও অন্যটিতে জিতেছিল ইংল্যান্ড। পেসারদের দাপটে দুই দলের ব্যাটসম্যানরা রীতিমতো হাঁসফাঁস করেছেন। মেরেকেটে খেলে দুই দলের যারা বেশি রান করতে পারবে, তারাই জিতবে। তাই এটা স্পষ্ট, স্রেফ বোলারদের স্কিল দিয়ে একটা সিরিজের দুটি ম্যাচ এভাবে দুই দিনে শেষ হতে পারে না।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উইকেটকিপার ব্র্যাড হ্যাডিন কায়ো স্পোর্টসের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “ব্যাটিংয়ের ভঙ্গুর অবস্থা আড়াল করতেই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এমন উইকেট বানাচ্ছে, যেখানে ম্যাচ তিন দিনেও যাবে না। ম্যাচ জেতাই যেখানে শেষ কথা, সেখানে কিছু বলার থাকে না। কিন্তু এভাবে আর কত? দুই দিনের ম্যাচ পৃথিবীর কোনো দেশেই টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ভালো বিজ্ঞাপন নয়।”
মাত্র ৪৮ রানে ৭ উইকেট নেন শরীফুল ইসলাম। ছবি : ফেসবুক
অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ানরাও বিরক্ত তাদের এই ফর্মুলায় টেস্ট জেতার চেষ্টায়। স্পোর্টিং উইকেট দিয়ে ডারউইনে হেরে অস্ট্রেলিয়া একরকম মরিয়া হয়েই ম্যাকাইতে প্রায় গ্যাবার মতো বাউন্সি উইকেট বানায় স্বাগতিকরা। এমন কন্ডিশনে প্রথমবার খেলা বাংলাদেশ দুই ইনিংসে করতে পারে যথাক্রমে ৬৪ ও ৯৫।
তবে একমাত্র ইনিংসে চেনা কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়া করতে পারে মাত্র ২১০ রান। সেটাও টেনেটুনে। শরীফুল ইসলাম একাই নেন ৭ উইকেট। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, প্রতি বলেই উইকেট পেয়ে যাবেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারের দুর্বলতা এখানেই প্রকট হয়ে ওঠে।
একটা দেশের বোর্ড নিজেদের সুবিধামতো উইকেট প্রস্তুত করতেই পারে। সমস্যা হলো, বাংলাদেশ বা ভারত একই কাজ করলে চারদিক থেকে সমালোচিত হতে হয়। স্পিন উইকেট বানিয়ে জিতলেই সমস্যা, তখন আর কেউ ইংলিশ বা অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের স্পিন টেকনিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। কিন্তু গতিময় বাউন্সি উইকেট বানিয়ে জিতলে বলা হয়, উপমহাদেশের ব্যাটসম্যানরা পেস বোলিংয়ে দুর্বল।
এর একটা সমাধান দিতে পারত আইসিসি, যদি তারা এমন দুই-তিন দিনে শেষ হয়ে যাওয়া উইকেটের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকত। কিন্তু তাদের কাছে ম্যাকাইয়ের উইকেট খুব ভালো বলেই বিবেচিত হওয়ার অর্থ, আগামীতেও এভাবে দুই দিনের টেস্ট খেলেও পার পেয়ে যাবে অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো।
নাজমুলের আক্ষেপ তাই বিশ্ব ক্রিকেটেরই এক কঠিন বাস্তবতা। আপাতত তাই নিজেদের পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে স্কিল বাড়ানোই একমাত্র সমাধান, যা অনুসরণ করে সফলতা পাচ্ছে ভারত। বাংলাদেশও কি হাঁটবে সেই পথে?