ডারউইন টেস্টের প্রথম সকালটা ছিল স্বপ্নের। দ্বিতীয় টেস্টের আগের দিন রাতে তাই এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছেন, ভোরে উঠে বাংলাদেশের টেস্টটা দেখবেন বলে। তবে যারা একটু দেরিতে উঠেছেন, তাদের জন্য যেন সেটা এক দুঃস্বপ্নই ছিল। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামতে বাধ্য হওয়ার পর ১২ রানে ৫ উইকেট গেল বাংলাদেশের! সেখান থেকে ৩৯ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে টেনেটুনে মাত্র ৬৪ রানে গিয়ে ঠেকেছে বাংলাদেশ দলের স্কোর!
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অনেক দলেরই এভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ঘটনা রয়েছে। তাই এই অসহায় আত্মসমর্পণ বড় বিস্ময় নয়। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে আউটের ধরন এবং ব্যাটসম্যানদের সঠিক মাইন্ডসেটে থাকার বিষয়টি নিয়ে।
ব্যাটিংয়ে মেহেদি হাসান মিরাজ। ছবি: ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস দেখে হাসির ছলে বলতে পারেন, ৬৪ জেলার দেশে খেলোয়াড়রা যেন গুনে গুনে ৬৪ রানই করেছেন। জেলাপ্রতি এক রান করে বরাদ্দ! এমন ব্যাটিং প্রদর্শনীর পর কেউ এভাবে বললে প্রতিবাদ করারও খুব বেশি কিছু থাকবে না।
তবে ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম সকালে অন্তত প্রতিরোধ তো করা যেত! মিচেল স্টার্কের ঝড়ের সামনে একজন হলেও অন্তত চেষ্টা তো করতে পারতেন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার! ৩৬ বছর বয়সেও এই অজি পেসার নিজের দিনে সেরাদের সেরা। তবে আগের টেস্টে তার বিপক্ষে সাফল্য ধরা দিয়েছিল বলেই হয়তো আজ হতাশাটা বেশি।
যদিও ম্যাচের আগেই প্রধান কোচ ফিল সিমন্স সতর্ক করে বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, এর মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশকে প্রথম ম্যাচের চেয়েও ভালো করতে হবে। সকালের সেশনেই সত্যি হয়েছে সিমন্সের শঙ্কা– অস্ট্রেলিয়ার পেস অ্যাটাকের সামনে দিশেহারা বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ।
কিন্তু এখানে দায়টা কার বেশি? উইকেটই খেলার অসাধ্য করে তুলেছে স্টার্কদের বোলিংকে, নাকি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের শট সিলেকশনও দায়ী?
এই ম্যাচের আগে স্টার্ক ক্যারিয়ারে টেস্টের প্রথম বলেই উইকেট নিয়েছেন তিনবার। সেই তালিকায় আজ চতুর্থ সংযোজন সাদমান ইসলাম। যে ডেলিভারিতে সাদমান আউট হলেন, সেটা খুব যে বিপজ্জনক ছিল, তা-ও নয়। মিডল স্টাম্পে ফুল লেংথের বলটি বেরিয়ে যাচ্ছিল, সাদমান মিড উইকেটের দিকে খেলতে চাইলে ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় গালি অঞ্চলে থাকা ক্যামেরন গ্রিনের হাতে।
প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ব্যাট করেছিল ১৩৮ ওভার। টিকে থেকে, বোলারদের ক্লান্ত করে রান বের করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সেবার এই মিশনে সাফল্য মিললেও ম্যাকাইয়ের উইকেটের চাহিদা ছিল ইতিবাচক খেলা। অর্থাৎ, ভালো বলকে সম্মান করে সুযোগ পেলেই রান বের করতে হবে। সেটা সিঙ্গেলসে হোক বা চার-ছয় থেকে।
তার মানে এই নয় যে, কন্ডিশন পুরোপুরি পেসবান্ধব ছিল এবং এখানে ব্যাট করাই মুশকিল। প্রয়োজন ছিল, প্রথম ঘণ্টাটা সাবধানী ব্যাটিং করা এবং বিশেষ করে স্টার্ককে সুযোগ না দেওয়া।
কিন্তু প্রথম ওভারে ৩৬ বছর বয়সী স্টার্কের অমন ছন্দময় বোলিংয়ের পরও আড়ষ্ট ছিল টপ অর্ডার। প্রায় ওয়াইড ইয়র্কার লেংথের নিরীহ এক ডেলিভারিতে ‘খেলব না ছাড়ব’ দ্বিধায় থেকে শেষ মুহূর্তে ব্যাট নামান তানজিদ হাসান। ব্যাটের কানায় লেগে সোজা ক্যাচ তৃতীয় স্লিপে।
বাঁহাতি পেসারদের লেট সুইংয়ে নাজমুল হোসেন এবং লিটন দাসের দুর্বলতা যে আছে, সেটা ভালোভাবে নোট করেই নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম বলেই নাজমুলকে ফুলার লেংথ ডেলিভারি করেন স্টার্ক, যা ভেতরে প্রবেশ করে। লাইন মিস করেন নাজমুল, বল আঘাত হানে প্যাডে। আম্পায়ার্স কলে গোল্ডেন ডাক মারেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
দুটি চার মেরে অন্যপ্রান্তে মুমিনুল হক যা-ও কিছুটা রান বের করছিলেন, সেটাও থামিয়ে দেন স্টার্ক। প্রায় তানজিদের আউটের পুনরাবৃত্তিই ছিল সেখানে। ওয়াইড ইয়র্কার লেংথে ফেলা বল ছেড়ে না দিয়ে কী ভেবে যেন মুমিনুলও ব্যাট নামিয়ে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেন। যথারীতি আবারও স্লিপে ক্যাচ নেন গ্রিন।
তানজিদ ও মুমিনুলের প্রায় একই ভুল করাটা বলে দেয়, উইকেটের আচরণ তাদের আউটে ভূমিকা রাখেনি। টেস্ট ইতিহাসের দশম সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়া স্টার্ক যখন পুরো ছন্দে থাকেন, তখন ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে তার লড়াইটা হয়ে যায় ‘সাইকোলজিক্যাল’। এই কারণেই ২০১৫ বিশ্বকাপের ফাইনালে সম্ভাব্য বিপদ জেনেও স্টার্ককে প্রথম ওভারে উড়িয়ে মারতে গিয়ে বোল্ড হয়েছিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।
টস করছেন দুই অধিনায়ক। ছবি: ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া
তানজিদ আর মুমিনুলের বল ছেড়ে দেওয়ার বদলে ব্যাট নামানোও ছিল তেমনই ঘটনা, যেখানে স্টার্ক তাদের বাধ্য করেছেন ভুল করতে। অন্যদিকে সাদমান ও নাজমুল ভুল শট খেলে উইকেট বিলিয়েছেন।
প্রথম চারজনের অমন ব্যর্থতাকেও যেন হার মানান লিটন দাস। স্টার্কের বাউন্সারে তাল সামলাতে না পেরে শূন্য রানে ক্যাচ দিয়েও জীবন পান বিউ ওয়েবস্টারের হাস্যকর ভুলে। এর রেশ না কাটতেই আউট লিটন, পরের বলেই! ফুলার লেংথের ভেতরে প্রবেশ করানো ডেলিভারিকে স্কয়ার লেগে খেলার চেষ্টা করেন লিটন। বল সরাসরি প্যাডে আঘাত করে।
টানা দুই বলে লিটনের ‘আউট’ হওয়াটা তার মনঃসংযোগের ঘাটতি তুলে ধরে। আগের বলে বেঁচে যাওয়ার পরও তিনি শট বাছাইয়ে সচেতন হতে পারেননি। ১২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধসে পড়ে ব্যাটিং অর্ডার, যা থেকে আর উদ্ধার পায়নি বাংলাদেশ।
এই পাঁচজন প্রথম ঘণ্টায় স্টার্কের তোপের সামনে পড়লেও মাটি কামড়ে ক্রিজে ছিলেন মুশফিকুর রহিম। তবে ৪১ বলে ৫ রান করার পর প্যাট কামিন্সের ইনসুইঙ্গার মুশফিকের ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক গলে ঢুকে যায় স্টাম্পে। মুশফিকের এই রোগ অবশ্য পুরনো, ব্যাট-প্যাডের ফাঁকটা সামলাতে ক্যারিয়ারের শুরুর মতো শেষের দিকে এসেও বেশ ঝামেলায় পড়ছেন!
এরপর লেইট মিডল আর লেইট অর্ডারের বাকি চার উইকেট নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করাটা অর্থহীনই। বরং তারাই যা একটু ‘ব্যাটিং’ করেছেন। দলের ইনিংসে যে চারটা দুই অঙ্কের স্কোর ছিল, সেটা শেষ পাঁচ ব্যাটসম্যানের কাছ থেকেই এসেছে! না হলে বাংলাদেশের স্কোর ৫০-ও পেরোত কি না সন্দেহ।
তবে মামুলি স্কোরে বাংলাদেশ অলআউট হওয়ার পরও দিন শেষে স্বস্তি– অস্ট্রেলিয়া খুব বেশিদূর যেতে পারেনি। ১০১ রানের লিড নিলেও অস্ট্রেলিয়া হারিয়েছে ৮ উইকেট। শরীফুল একাই নিয়েছেন ৬ উইকেট।
একদিনে ১৮ উইকেটের পতন দেখে মনে হতেই পারে, উইকেটে হয়তো জুজু ছিল খুব। তবে বাস্তবে তা ছিল না। স্টার্কের মতো শরীফুলও দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। সঙ্গে মিলেছে অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনের প্রথম দিনের পেস-বাউন্স। বাংলাদেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়া তুলনামূলক ইতিবাচক ব্যাটিং করেছে বলেই তারা এগিয়ে আছে।
উইকেট উদযাপন করছেন শরীফুল ইসলাম। ছবি: ফেসবুক
অন্যদিকে ওভারপ্রতি মাত্র ১.৮৮ রান তোলা বাংলাদেশ দল স্টার্ক-কামিন্সদের সুযোগ করে দিয়েছে চাপে ফেলার। ডারউইনের ফর্মুলা ম্যাকাইতে যে কাজে দেবে না, তার আভাস আগেই মিলেছিল। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়ে যাওয়ায় নেমেছে ব্যাটিং ধস।
তবে ম্যাচ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ক্রমেই ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো দিকে যাওয়া উইকেটে দ্বিতীয় ইনিংসে যদি নাজমুল-মুমিনুলরা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে ৬৪ রানের বিপর্যয়কে স্রেফ দুর্ঘটনা বলে দেওয়া যাবে। বাংলাদেশ কি সেই চ্যালেঞ্জটা নিতে পারবে?