ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার আকার বাড়ল।
বঙ্গভবনে শপথ নেওয়া নতুন ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন করে এরইমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রকাশ করা হয় সরকারি গেজেট।
নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পর শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন।
ড. আবদুল মঈন খান। ফাইল ছবি
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ড. আবদুল মঈন খান সামলাবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়
নরসিংদী-২ (পলাশ) আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন তিনি।
১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরনগরদী গ্রামে তার জন্ম। বাবা আবদুল মোমেন খান ও মা খোরশেদা বেগম। তার বাবা আবদুল মোমেন খান জিয়াউর রহমানের সরকারের খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। পারিবারিকভাবেই রাজনীতির সঙ্গে তার পরিচয় ও সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।
১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৬ সাল পর্যন্ত নরসিংদী-২ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন মঈন খান। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথমে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং পরে বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে তিনি আবার সংসদে ফিরেছেন। নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে জনগণের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়েও আলোচনায় আসেন তিনি।
এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। ফাইল ছবি
প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত
জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ। একই সঙ্গে তিনি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি। এর আগে জামালপুর জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০২৩ সালে তাকে বিএনপির কোষাধ্যক্ষ পদে মনোনীত করা হয়।
১৯৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে তার জন্ম। রাজনৈতিক জীবনের শুরু আশির দশকে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত জামালপুর-১ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে জয়ী হয়ে আবার সংসদে ফেরেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক (বিবিএ) এবং ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন মিল্লাত। রাজনীতির পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
সাচিং প্রু জেরী। ফাইল ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সাচিং প্রু জেরী
বান্দরবান-৩০০ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন সাচিং প্রু জেরী। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং দলটির বান্দরবান জেলা শাখার আহ্বায়ক।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাচিং প্রু জেরীর সংসদীয় রাজনীতিতে এর আগেও অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবার বান্দরবান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে আবার সংসদে ফিরেছেন তিনি।
১৯৫৩ সালের ১৫ জানুয়ারি বান্দরবান পৌরসভার ক্যাংভিটা এলাকায় তার জন্ম। তিনি বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সদস্য। তার বাবা অং শৈ প্রু চৌধুরী ছিলেন বোমাং সার্কেলের রাজা এবং তিনিও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাচিং প্রু জেরীর মামি মা ম্যা চিংও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান আসনে সাচিং প্রু জেরী ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির প্রার্থী এস এম সুজাউদ্দিন পান ২৬ হাজার ১৬২ ভোট।
আন্দালিভ রহমান পার্থ। ফাইল ছবি
নতুন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি—বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোলা-১ (সদর) আসন থেকে তিনি জয়ী হন।
এর আগে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পার্থ। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৪ হাজার ৪৬২ ভোট পেয়ে জয়ী হন; তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নজরুল ইসলাম পান ৭৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।
১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকায় তার জন্ম। বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জু ছিলেন রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী। তিনি ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের সময় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রও ছিলেন। ২০০০ সালে নাজিউর রহমান মঞ্জু বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) প্রতিষ্ঠা করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিকবিষয়ক) হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন হুমায়ুন কবির। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে কাজ করেছেন হুমায়ুন কবির। লন্ডনের মেয়রের দপ্তরে ‘স্ট্র্যাটেজি অ্যাডভাইজার’ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি লিউইশাম এক্সিকিউটিভ মেয়রের কার্যালয়ে কেবিনেট উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ এবং ইউনিভার্সিটি অব লিডস থেকে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
হুমায়ুন কবিরের জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের হাবশপুর গ্রামে। লন্ডনে অবস্থানকালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। ফাইল ছবি
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। ২০০৬ সালের উপনির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তার বাবা আবদুল মোত্তালিব আকন্দ ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ছেলে শামীম কায়সার লিংকন সংসদ সদস্য হন।
১৯৮০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তার জন্ম। বাবা আবদুল মোত্তালিব আকন্দ এবং মা আফরোজা আনার বিলকিস।
শিক্ষাজীবনে তিনি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৯৫ সালে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেন। প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উচ্চশিক্ষারও তথ্য পাওয়া যায়।
২০০৬ সালের উপনির্বাচনের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার গাইবান্ধা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হন এবং জয়ী হয়ে সংসদে ফেরেন। নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়েছেন।