টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ২৬ বছরেও বাংলাদেশ কেন সমীহজাগানিয়া দল হতে পারল না? উত্তর একটাই, অধারাবাহিকতা। ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে যা দরকার সবচেয়ে বেশি, সূচনালগ্ন থেকেই সেটা অনুপস্থিত। দারুণ একটা জয়ের পর সেটা উদযাপনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সেটা ধরে রাখা, বা অন্তত মোমেন্টামটা ধরে রাখা। কিন্তু অতীতের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচেও একই চিত্র বাংলাদেশের।
ভীষণ বাজে ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশকে হারতে হয়েছে দেড় দিনেই। প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার পরের ম্যাচে নিজেরাই স্রেফ উড়ে যাওয়া– এমন নজির গড়ার ক্ষেত্রে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভবত হতে পারে কেবল পাকিস্তান।
ম্যাকাই টেস্টে দুই দিনের মধ্যে হেরে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ দলকে তুলনামূলক কম সমালোচনার মধ্যে পড়তে হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, আগের টেস্টে ৯ উইকেটের ইতিহাস গড়া এক জয়। আর দ্বিতীয়ত, বেশ চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশন। দুই দিনে ৩০ উইকেটের পতনের কারণে কিছুটা হলেও ‘ছাড় পাচ্ছেন’ নাজমুল হোসেনরা।
তবে একই বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সের এত বৈপরীত্য বিস্ময়করই। ডারউইনে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ব্যাট করেছিল ১৩৮ ওভার, রান এসেছিল ৪২৬। আর ম্যাকাইতে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭২.৩ ওভারে যথাক্রমে স্কোর ছিল ৬৪ ও ৯৫। দুই ইনিংসেই ১০০-র নিচে অলআউট! যতই অধারাবাহিক হোক, বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এমন রেকর্ড ম্যাকাই টেস্টের আগে ছিল না।
যে দল প্রায় দুই দিন স্টার্ক, কামিন্স, হ্যাজলউড, লায়নদের বিপক্ষে সত্যিকারের টেস্ট ব্যাটিং করতে পারে, কেন এত দ্রুত তারা সেই পুরোনো দিনের মতো ভেঙে পড়বেন? কেন ম্যাচের প্রথম বল থেকেই ‘নার্ভাস’ ছিলেন ব্যাটসম্যানরা?
এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার পেসার জশ হ্যাজলউড ফক্স স্পোর্টসকে যা বলেছেন, সেটা একটা সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে। হ্যাজলউডের উত্তরে তার নিজের দলের এবং বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের টেকনিকের সমস্যাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। হ্যাজলউড বলেছেন, “আমার মনে হয় না ম্যাচটি দুই দিনের হওয়া উচিত ছিল বা এটা দুই দিনে শেষ হওয়ার মতো উইকেট। প্রথম দিনের সকালে অবশ্যই কিছুটা সিম মুভমেন্ট ছিল। বেশিরভাগ টেস্ট ম্যাচেই আপনি এমনটা আশা করবেন। কিন্তু বলের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার পর বোলিংয়ের দিক থেকে উইকেটে তেমন কিছুই ছিল না।”
সিরিজ ট্রফি হাতে দুই অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ও নাজমুল হোসেন। ছবি : ফেসবুক
বাংলাদেশের দুই ইনিংস বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট যে, অধিকাংশ উইকেটের জন্যই বোলারদের বিশেষ কিছু করতে হয়নি। নিজেরাই স্রেফ বাজে শট বাছাই করেছেন এবং ভুল সময়ে ভুল শট খেলার চেষ্টায় মূল্যবান উইকেট বিলিয়ে এসেছেন।
তানজিদ হাসান তামিম প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করলেও বাকি তিন ইনিংসে ভীষণ দৃষ্টিকটুভাবে আউট হয়েছেন। এই টেস্টে প্রথম ইনিংসে স্টার্কের প্রায় ওয়াইড লেংথের ডেলিভারিতে অহেতুক ব্যাট নামিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় ইনিংসে রয়েসয়ে খেলতে খেলতে হঠাৎই চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন কামিন্সের ওপর। তাতেই শেষ! ডিপে একজনই ফিল্ডার ছিলেন, আকাশে উড়িয়ে তার হাতেই ক্যাচ দিয়েছেন তানজিদ।
আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম করেছেন আরও বড় ক্ষতি। ক্রিকেটে একটা কথা আছে, ওপেনারদের কাজ শুধু ব্যাট করাই না, পরের ব্যাটসম্যানদের সাহসও জোগানো। তারা যদি প্রতিপক্ষের কঠিন আক্রমণের মধ্যেও টিকে যেতে পারেন, ভালো কিছু শট খেলতে পারেন, সেটা পরের ব্যাটসম্যানদের কিছুটা নির্ভার করে। ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের ‘বাজবলে’র রমরমার সময়ে ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার ডাকেট-ক্রলির উদাহরণটা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
কিন্তু সাদমান কী করলেন? প্রথম দিনের সকালে স্টার্কের করা প্রথম বলটি তিনি এতটাই জড়তা নিয়ে মোকাবেলা করেন যে, দেখে মনে হবে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন। অফ স্টাম্পে পিচ করে বেরিয়ে যাওয়া ডেলিভারিতে পড়িমরি ব্যাট চালিয়ে মারেন গোল্ডেন ডাক।
অভিজ্ঞ একজন ওপেনার এভাবে আউট হয়ে সাহসের বদলে যেন সতীর্থদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন। সেই ধারায় দলের অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুমিনুল তিনে নেমে দুই ইনিংসেই এলোমেলোভাবে ব্যাট চালিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে অনেক বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে আউট হয়েছেন বলেই হয়তো, দ্বিতীয় ইনিংসে বল ছেড়ে দেওয়ার দিকে মনোযোগী ছিলেন। ফলাফল? প্রথম বলেই বোল্ড। মুমিনুল লাইন পড়তেই পারেননি।
টানা ৩ ইনিংসে ডাক মেরে আউট লিটন দাস। ছবি : ফেসবুক
অধিনায়ক নাজমুল দ্বিতীয় ইনিংসে যেভাবে আউট হয়েছেন, ক্রিকেটের ভাষায় একে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ বলা হয়। চাপের মুখে দারুণ সব শটে ৩১ রান করে ফেলেছিলেন। দলের যখন তাকে সবচেয়ে প্রয়োজন, তখনই কিনা ‘ব্রেইনফেড মোমেন্টে’ নাথান লায়নের ফাঁদে পা দিয়ে সোজা লং-অফে ক্যাচ দিলেন নাজমুল। এর আগে প্রথম ইনিংসে স্টার্কের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েছিলেন। সেই ডেলিভারিটাতে কিছুটা এয়ার সুইং ছিল, তবে মোটেও ‘আনপ্লেয়েবল’ ছিল না সেটা।
তার মানে, টপ অর্ডারের চার ব্যাটারই আউট হয়েছেন নিজেদের ভুলে। সুইং, বাউন্স এসব মূল সমস্যা ছিল না।
বাদ থাকেন মুশফিকুর রহিম। প্রচণ্ড চাপের মুখে তিনি দ্বিতীয় ইনিংসে মাটি কামড়ে ব্যাট করে গেছেন একাই। ৮০ বল খেলে অপরাজিত থাকেন ২৯ রানে। তিনিও কিছুটা সংগ্রাম করেছেন, তবে টিকে থাকার তীব্র বাসনা ছিল বলেই লড়তে পেরেছেন।
দলের আরেক তারকা ব্যাটসম্যান লিটন দাস এই সিরিজ খেলেছেন দুই মাস মাঠের বাইরে থাকার পর। প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেননি। সঙ্গে যোগ হয় ভেতরে প্রবেশ করানো ডেলিভারিতে তার পুরোনো দুর্বলতা, যা অস্ট্রেলিয়া দল দারুণভাবেই কাজে লাগিয়েছে। তিন ইনিংসের একটিতেও লিটন রানের খাতাই খুলতে পারেননি।
ডারউইন টেস্টে অন্যদের রানবন্যার মধ্যেও লিটন ডাক মারেন স্টার্কের বলে। ম্যাকাইতেও একই হাল। স্টার্ক আক্রমণে আসা মানেই যেন লিটনের ক্রিজে মেয়াদ শেষ। দুই ইনিংসে মিলে ১৫ বল টিকেছেন, তবে দেখে মনে হয়েছে যেন প্রতি বলেই আউট হবেন।
ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছেন মিচেল স্টার্ক। ছবি : ফেসবুক
অর্থাৎ, স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের ১২টি উইকেটে তাদের ভুলই বোলারদের কাজটা সহজ করে দিয়েছে। তবে এটা সত্য, এই টেস্টে জিততে অস্ট্রেলিয়া মরিয়া ছিল। গ্যাবার পিচ কিউরেটরকে দিয়ে বানানো উইকেট যে আদর্শ অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশন দিতে যাচ্ছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। বাংলাদেশকে অস্বস্তিতে ফেলাটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য এবং এতে তারা শতভাগ সফল।
টসও ছিল বড় ফ্যাক্টর। বাংলাদেশ যদি আগে বোলিং পেত, কে জানে, ৬৪ না হলেও, হয়তো ১০০ রানের আশেপাশেই গুটিয়ে যেতে পারত অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস! তার প্রমাণ প্রথম দিনের দুপুর ও বিকালের সেশনে শরীফুলের আগুন ঝরানো বোলিং। তিনি এবং অন্য পেসাররা যদি সকালে বল করার সুযোগ পেতেন, নিশ্চিতভাবেই নাচিয়ে ছাড়তেন হেড-স্মিথদের।
তার মানে আবার এটাও নয় যে, ৬৪ রানে অলআউট হওয়াটা ঠিক ছিল বাংলাদেশের জন্য। কন্ডিশন একটু ভিন্ন হলে, কিছুটা বাউন্স আর সিম মুভমেন্ট থাকলেই যদি এভাবে আত্মসমর্পণ করেন ব্যাটসম্যানরা, তাহলে বিদেশের মাটিতে নিয়মিত জেতার আশার বেলুনটা ফেটে যেতে খুব বেশি সময় তো লাগে না।
ম্যাকাই টেস্টে দুই ইনিংসেই ব্যর্থ মুমিনুল হক ও তানজিদ হাসান। ছবি : ফেসবুক
এই কারণেই অধিনায়ক নাজমুল এই ধরনের উইকেটে বেশি বেশি খেলার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, “প্রথম টেস্টের পর আমাদের ধারাবাহিক ক্রিকেট খেলা উচিত ছিল। আমরা যদি ভবিষ্যতে এমন কন্ডিশনে আরও বেশি বেশি খেলার সুযোগ পাই, তাহলে সেটা আমাদের উন্নতিতে অনেক সাহায্য করবে। আমরা চাই না আবার ২৩ বছর পর এখানে এসে দুইটা টেস্ট খেলতে। এত লম্বা সময় পর এখানে এসে খেলা মোটেও সহজ নয়। আমরা যদি প্রতি বছর এমন কন্ডিশনে খেলার সুযোগ পাই, তাহলে আমাদের টেস্ট ক্রিকেট আরও উন্নত হবে।”
পাশাপাশি বাংলাদেশের ভুলে যাওয়ার মতো এক ম্যাচের প্রেক্ষাপটে এটাও মাথায় রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্রমশ ‘দুই দিনের টেস্টে’র সংখ্যা বাড়ছে– তা প্রতিপক্ষ যে দলই হোক না কেন! অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সর্বশেষ ২০টি টেস্টের মধ্যে ৪টিই দুই দিনে শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৩টিই গত ১২ মাসে– এ সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে কোথাও কোনো টেস্ট দুই দিনে শেষ হয়নি। গত মৌসুমের অ্যাশেজে পার্থে ও মেলবোর্ন টেস্টও শেষ হয় দ্বিতীয় দিনেই।
অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়াতেও তাই কামিন্সদের জয় ছাপিয়ে সমালোচনা হচ্ছে এমন কন্ডিশনের, যা ম্যাচকে তিন দিনে যাওয়ার সুযোগই দেয় না। তাই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতেই পারেন, প্রথমবার এমন কন্ডিশনে খেলার চাপেই তারা ভেঙে পড়েছেন।
ম্যাকাই বিপর্যয়ের পরও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা তাই এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতেই পারেন। সামনেই আছে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। তার আগে এই তেতো অভিজ্ঞতা তাদের জন্য হতে পারে সতর্কবার্তা।
আর দল হিসেবে বাংলাদেশ এই টেস্ট এবং গোটা সিরিজ নিয়ে গর্বিত হতেই পারে। কে ভেবেছিল, বাংলাদেশ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে গিয়ে সিরিজ ড্র করে ফেলবে? সম্ভবত কেউই না। তাই সিরিজের শেষটা ভীষণ বাজে হলেও ডারউইন রূপকথায় এর প্রভাব পড়বে না।
৪৮ রানে ৭ উইকেট নিয়েছেন শরীফুল ইসলাম। ছবি : ফেসবুক
এই সিরিজের আরেক প্রাপ্তি পেসারদের নতুন করে বিশ্বমঞ্চে তাক লাগানো পারফরম্যান্স। নাহিদ রানাকে ছাড়াই হাসান মাহমুদ, শরীফুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ এবং ইবাদত হোসেনরা যেভাবে লড়ে গেছেন, তা দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে আরও ভালো কিছুরই আশা যোগাবে।
এ ছাড়া এই সিরিজ বাংলাদেশকে একটা সুখবরও দিয়েছে। আইসিসি টেস্ট র্যাংকিংয়ে প্রথমবারের মতো ছয় নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এর আগে সেরা অবস্থান ছিল সাত নম্বর, সেটাও এসেছিল এই বছরই।
তাই অস্ট্রেলিয়া সফরটা বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচকের চেয়ে ইতিবাচকই বেশি। ব্যাটিংয়ের ভুলগুলো থেকে যদি নাজমুল-লিটনরা শিক্ষা নেন, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও দেখা মিলতে পারে চমকের।