চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা ও ব্যাপক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে দেশের সাতটি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চট্টগ্রাম বিভাগে। এই সাতটি জেলা হলো খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। জুলাইয়ের শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টি, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় নিম্নচাপ এবং তীব্র পাহাড়ি ঢলের কারণে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে।
বন্যা ও ভূমিধসে ৩৬ হাজার ৫৫০ জন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ১ হাজার ৭২২টি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠতে বাধ্য হন। এ দুর্যোগে ৫৯ জনের মৃত্যু এবং ২৯৩ জন আহত হন। গ্লোবাল শেল্টার ক্লাস্টারের (জিএসসি) গত ২৩ আগস্ট প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ফ্লাডস এন্ড ল্যান্ডস্লাইড ২০২৬’ শীর্ষক এক রিপোর্টে এসব তথ্য জানানো হয়।
জিএসসি একটি ইন্টার-এজেন্সি স্ট্যান্ডিং কমিটির একটি সমন্বয় ব্যবস্থা। এটি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এবং সংঘাতের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আশ্রয়ের মাধ্যমে সহায়তা করে।
বৈশ্বিকভাবে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন জিএসসিকে পরিচালনা করে। বর্তমানে জিএসসির সঙ্গে নিয়মিতভাবে ৬৯৫টি অংশীদার সংস্থা যুক্ত রয়েছে।
জিএসসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বন্যায় অবকাঠামোগত দিক থেকে ৮ হাজার ৫৯২টি ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধসে পড়ে এবং আরও ৪৬ হাজার ঘরবাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই দুর্যোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫২৩ কিলোমিটার সড়ক, ৫৭৮ কিলোমিটার বাঁধ এবং ৮৫০টি ব্রিজ ও কালভার্ট মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়, যা ত্রাণ কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্গত এলাকায় সরকারি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো দ্রুত সাড়া দেয়। সরকার প্রাথমিক জরুরি সহায়তা হিসেবে ঘর মেরামতের জন্য ৪ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ১ লাখ ৫ হাজার মার্কিন ডলার নগদ অর্থ দেয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থাও এগিয়ে আসে। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৭১টি পরিবারকে ঘর পুনর্নির্মাণে সরাসরি সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। জরুরি চাহিদা মেটাতে ৭ হাজার ৭৫০ পরিবারকে তার্পালিন, মশারি, রান্নার সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় পারিবারিক দেয়। আশ্রয় খাতের জন্য এখন পর্যন্ত মোট ৭ লাখ ৪৫ হাজার ১৭ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে।
ওই প্রতিবদনে বলা হয়, সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত সব ঘরবাড়ি স্থায়ীভাবে মেরামত করে পুনর্বাসনের জন্য আনুমানিক ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। আশিকা, বিডিআরসিএস, ব্র্যাক, কেয়ার, আইওএম, এনআরসি ও ওয়াইপিএসএর মতো ১৫টিরও বেশি দেশি-বিদেশি সংস্থা মাঠপর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ এবং নগদ আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
জুলাই মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ভারী বৃষ্টিতে ভূমিধসের কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন ‘মারাত্মক ঝুঁকির’ মধ্যে রয়েছে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, “বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সাম্প্রতিক ভূমিধসের ঘটনায় আবারো স্পষ্ট হয়েছে।”
সময়ের সাথে সাথে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর পরিধি বাড়লেও তাদেরকে গাছপালা কেটে ন্যাড়া করা খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি অস্থায়ী ছাউনিতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে, যা বর্ষা মৌসুমে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মিয়ানমার থেকে নতুন করে আরও শরণার্থী আসার কারণে এই ঘিঞ্জি ক্যাম্পগুলোতে প্রাণঘাতী সাইক্লোন, বন্যা ও ভূমিধসে হতাহতের আশঙ্কা নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।