মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গাদের ঢলের ৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৫ আগস্ট। ২০১৭ সালের এই দিন মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে পৌঁছায়।
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৫টি কূটনৈতিক মিশন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। এতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী মিশনগুলোর মধ্যে রয়েছে—কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, ইতালি, জাপান, কসোভো, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বিবৃতিতে বলা হয়, “মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির নয় বছর পরও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এই বার্ষিকীতে চলমান বাস্তুচ্যুতি ও দুর্ভোগের মধ্যেও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দৃঢ়তা, সাহস ও মর্যাদার প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের উদারতার জন্যও আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাখাইনজুড়ে সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ত্রাণ ও বাণিজ্যে অবরোধ মানবিক সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে আরও মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বিপজ্জনক সমুদ্রপথে যাত্রার কারণে মর্মান্তিক প্রাণহানিও ঘটছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুযোগ দিচ্ছে না।”
প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো মোকাবিলা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারে কৌশলগত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সফল প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের এমন শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, যা তাদের রাখাইনে নিজেদের বাড়িঘর, জীবিকা ও সম্প্রদায় পুনর্গঠনে সহায়তা করবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পথ খুঁজে বের করতে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাব। ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর মধ্যে তাদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগও থাকবে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার ভবিষ্যৎ শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর নির্ভর করে না; কীভাবে সেই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তারও উন্নতি করতে হবে। স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং সহায়তা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশি ও শরণার্থী-নেতৃত্বাধীন পক্ষগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি। রোহিঙ্গাদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের কণ্ঠ অবশ্যই কেন্দ্রে থাকতে হবে।”
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “এই সংকট দশম বছরে প্রবেশ করায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাতে বিস্মৃত না হয়, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আমরা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কণ্ঠ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং বৈশ্বিক সমর্থন ধরে রাখতে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাব।”