মিয়ানমার সরকার তার দেশের একটি প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী—রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু তারা তাতে সাড়া দেয়নি। ২০২৫ সালের ঘটনা এটি, যা ২০১৬-১৭ সালে ঘটে যাওয়া রোহিঙ্গা ঢলের প্রায় নয় বছর পরের কথা। সে সময় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ মানুষ কক্সবাজার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় তাঁবু ও অস্থায়ী শেডে আশ্রয় নিয়েছিল। মিয়ানমার সরকারের আহ্বানে রোহিঙ্গাদের সাড়া না দেওয়ার মূল কারণ ছিল—মিয়ানমার প্রশাসন মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইন অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করেছিল। ফলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শরণার্থীরই নিজ দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
নাগরিকত্ব না পাওয়ায় আবার কোনো নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে তারা এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। এটি এখন এক জটিল পরিস্থিতি; কারণ এই জনবহুল দেশের একটি ছোট জায়গায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১০ লাখের বেশি মানুষের বোঝা টেনে বাংলাদেশ সরকারও ধৈর্য হারাচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে দুই দেশের মধ্যে তথাকথিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং মিয়ানমারের নিরাপত্তার আশ্বাস সত্ত্বেও ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হলেও রোহিঙ্গারা পিছিয়ে এসেছে। প্রত্যাবাসনের নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে গেলেও ক্যাম্প ছেড়ে কেউ এক পা-ও নড়েনি। বস্তুত, নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত তারা আর কোনো প্রত্যাবাসন মেনে নেবে না—এমন একটি মনোভাব তাদের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর এই নাগরিকত্ব পাওয়ার দাবিটি এত দ্রুত পূরণ হওয়ারও নয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশকে এখন এদের নিয়েই থাকতে হচ্ছে।
চার দশক আগের একটি ঘটনাকে এই পরিস্থিতির একটি ঐতিহাসিক সমান্তরাল উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, যখন ১৯৭৮ সালে প্রথম রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে প্রথম যখন শরণার্থী প্রবাহ শুরু হয়, তখন আমি চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ছিলাম।
উখিয়া সীমান্ত দিয়ে অল্প অল্প করে কয়েক শ মানুষ ঢুকেছিল। সেই সংখ্যা হাজারে পৌঁছাতেই সীমান্তরক্ষীরা প্রবাহ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। একবার যখন বাঁধ ভেঙে গেল, তারপর আর কাউকে থামানো যায়নি। এক মাসের মধ্যে সেই প্রবাহ স্রোতে রূপ নেয় এবং মোট সংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখেরও বেশি।
মূলত ১৯৭৮ সালে আকিয়াব (আরাকান) থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার প্রধান কারণ ছিল অবৈধ বাসিন্দাদের চিহ্নিত করতে বার্মা সরকারের 'অপারেশন নাগামিন' (ড্রাগন কিং)। ফাইল ছবি: রয়টার্স
মাত্র সাত বছরে পা দেওয়া একটি নতুন স্বাধীন দেশের জন্য এত বড় শরণার্থী দল সামলানো ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সাহায্য আসতে সময় লেগেছিল, তবে শেষ পর্যন্ত নিজস্ব সম্পদ এবং রেডক্রস ও ইউএনএইচসিআরের আন্তর্জাতিক সহায়তায় কক্সবাজারে (তখন মহকুমা) ১৩টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। যার মধ্যে একটি ছিল বান্দরবানে, যেখানে দুই লাখের কিছু বেশি মানুষ আশ্রয় নেয়।
তৎকালীন সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর মধ্যে প্রধান সিদ্ধান্তগুলো ছিল: রোহিঙ্গাদের শুধু নির্দিষ্ট ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ রাখা, ক্যাম্পের বাইরে তাদের যাতায়াত বন্ধে পুলিশের টহল জোরদার করা, বার্মার সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেওয়া এবং ক্যাম্পগুলোতে আন্তর্জাতিক ত্রাণের সার্বিক ব্যবস্থাপনা সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালনা করা।
সেখানে কর্মরত আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর প্রতিবাদ সত্ত্বেও আমাদের কৌশলগুলো ভালোভাবে কার্যকর হয়েছিল—বিশেষ করে বার্মার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা।
প্রথম ঢলের পর বার্মার সঙ্গে তিনটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়—একটি রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন), একটি ঢাকায় এবং একটি কক্সবাজারে। কক্সবাজারের বৈঠকটিতে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ইমিগ্রেশন ডিরেক্টর জেনারেল এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত বার্মার রাষ্ট্রদূত অংশ নিয়েছিলেন, এমনকি তারা শরণার্থী ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন। রেঙ্গুনের বৈঠকটি ছাড়া বাকি সব কটিতে আমি উপস্থিত ছিলাম এবং বার্মিজ প্রতিনিধিদলকে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিলাম। এসব বৈঠকের মূল সাফল্য ছিল কোনো শর্ত ছাড়াই প্রত্যাবাসনে বার্মা পক্ষের সম্মতি অর্জন।
মূলত ১৯৭৮ সালে আকিয়াব (আরাকান) থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার প্রধান কারণ ছিল অবৈধ বাসিন্দাদের চিহ্নিত করতে বার্মা সরকারের 'অপারেশন নাগামিন' (ড্রাগন কিং)। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর সহায়তায় চরম নৃশংসতায় রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে অভিযান চালায়, যার ফলে তারা গণহারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে আরাকানের স্থানীয় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা এই কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িত ছিল। আন্তর্জাতিক মনোযোগ এড়াতে বার্মা দ্রুত চুক্তি করতে চেয়েছিল বলে এই আলোচনা ও চুক্তি সহজ হয়ে যায়।
চুক্তি খুব দ্রুত হলেও এর বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। মূলত নির্যাতনের ভয়ে রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। রোহিঙ্গা নেতারা প্রত্যাবাসনের জন্য অনেকগুলো শর্ত তুলে ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যার মধ্যে ছিল আরাকানে তাদের নিরাপদ বসবাসের আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি—যেটি কোনো পৃথক ভূখণ্ড দেওয়া ছাড়া পূরণ করা সম্ভব ছিল না। এই প্রতিরোধ প্রথমে ক্যাম্পগুলোতে প্রত্যাবাসনবিরোধী একটি নীরব প্রচারণার মাধ্যমে শুরু হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যাবাসনের আগে আমাদের তৈরি করা নিবন্ধনে তারা নাম তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকার করে। তৃতীয়ত, নিবন্ধনকারী কর্মকর্তাদের ওপর তারা হামলা চালায়। এই তৃতীয় ঘটনার জেরে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয় এবং কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল আহত হওয়ার পর ১৩ জন শরণার্থী মারা যায়।
ইউএনএইচসিআরের আন্তর্জাতিক সহায়তায় কক্সবাজারে (তখন মহকুমা) ১৩টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। যার মধ্যে একটি ছিল বান্দরবানে, যেখানে দুই লাখের কিছু বেশি মানুষ আশ্রয় নেয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স
এরপর সরকার অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ নেয়। পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ এবং শরণার্থীদের বিচারিক তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, প্রত্যাবাসনে কোনো বাধা সহ্য করা হবে না। নিবন্ধনে তাদের অংশ নিতেই হবে এবং বার্মার সঙ্গে যেভাবে সম্মতি হয়েছে, সেভাবেই তাদের ফিরে যেতে হবে।
এরপর থেকে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, যতক্ষণ না প্রত্যাবাসনের আসল দিনটি এসে পৌঁছায়—যা যতদূর মনে পড়ে ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে ছিল। প্রথম বা প্রতীকী প্রত্যাবাসনের জন্য আমরা ৪০ জন মানুষকে বেছে নিয়েছিলাম, যারা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়েছিল। তাদের সীমান্তসংলগ্ন একটি বিশেষ ক্যাম্পে রাখা হয়।
প্রত্যাবাসনের আগের রাতে ওই ক্যাম্পের কিছু রোহিঙ্গা নেতা রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশ ফাঁড়ি ঘিরে ফেলে এবং প্রত্যাবাসন বন্ধের দাবি জানায়। তারা ফাঁড়ি দখল করে সব রাইফেল ছিনিয়ে নেয় এবং পুলিশকে ক্যাম্প ছেড়ে যেতে বলে। শুধু তা-ই নয়, ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির জন্য যাওয়া শরণার্থী কমিশনারকেও (সরকার নিযুক্ত একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা) তারা অপহরণ করে ক্যাম্পের গহিনে নিয়ে যায়।
বার্মা ও বাংলাদেশ, দুই পক্ষেই এই প্রতীকী প্রত্যাবাসন বড় একটি অনুষ্ঠান হিসেবে উদ্যাপিত হওয়ার কথা ছিল এবং কর্মকর্তারা এটি সফল করতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। নাফ নদীর ওপর একটি বেইলি ব্রিজ তৈরি করা হয়েছিল, যা ঘুমানধুমকে আরাকানের মংডু অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। বাংলাদেশ প্রান্তে বাস থেকে নামিয়ে তালিকাভুক্ত ৪০ জন রোহিঙ্গাকে হেঁটে নদী পার করানোর কথা ছিল।
আমাদের পাশাপাশি ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ ছিল। দেশি-বিদেশি একদল সাংবাদিক এই দৃশ্য ধারণ করতে কক্সবাজারে জড়ো হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজকে প্রথম দলটিকে বার্মা কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের অঘোষিত বিদ্রোহ ও সহিংস আচরণ প্রথম দলটির প্রত্যাবাসন পণ্ড করে দেওয়ার উপক্রম করে।
উখিয়া থানায় যাওয়ার পথে আমি এই সংবাদ পাই, যেখানে ঘুমধুম ক্যাম্প ও বিওপি অবস্থিত ছিল। আমি থানায় পৌঁছানোর সময় সঙ্গে ছিলেন পুলিশ সুপার (এসপি)। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বেশ চিন্তিত মুখে আমাদের জানালেন, ঘুমধুম ক্যাম্পটি বিদ্রোহী শরণার্থীদের দখলে চলে গেছে এবং তারা পুলিশ ক্যাম্প থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। ২০-২৪ জনের পুলিশ দলটি সন্ধ্যায় রামদা ও ছুরির মতো প্রাণঘাতী অস্ত্রসহ আকস্মিক হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা রাইফেল লুট করে, সেখানে থাকা পুলিশদের হাত-পা বেঁধে ফেলে আর বাকিরা পালিয়ে যায়। যে ক্যাম্পে পরদিন সকালে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত ৪ জন শরণার্থী রাখা হয়েছিল, বিদ্রোহীরা সেটিও ঘিরে ফেলেছিল। তা ছাড়া, তারা শরণার্থী কমিশনারকে অপহরণ করে জিম্মি বানিয়ে ক্যাম্পের ভেতরে নিয়ে যায়। তাদের স্পষ্ট কথা—অস্ত্র ফেরত দেওয়া হবে না এবং কমিশনারকেও ছাড়া হবে না, যদি না প্রত্যাবাসন কর্মসূচি বাতিল করা হয়। তারা কোনোভাবেই এই প্রতীকী প্রত্যাবাসন হতে দেবে না।
পরিস্থিতি দাঁড়াল চরম সংকটময়। পুরো প্রত্যাবাসন কর্মসূচিটাই হুমকির মুখে। কয়েক মাসের দ্বিপক্ষীয় শ্রম ও চেষ্টা আমি কিছু উগ্র শরণার্থীর কাছে পণ্ড হতে দিতে পারি না—যারা আমাদের পুলিশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অস্ত্র লুটে নিয়েছে এবং পুরো ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আমি জানতাম, আজ রাতে যদি আমরা এই বিদ্রোহ দমন করতে না পারি এবং প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকাভুক্ত শরণার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা না করতে পারি, তবে পুরো কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেস্তে যাবে।
উখিয়া থানা থেকে আমি ওয়্যারলেসে (তখন মোবাইল ফোন ছিল না) অবরুদ্ধ ক্যাম্পে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলি। সেই কর্মকর্তা জানালেন, তিনি বিদ্রোহীদের এক প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং কী শর্তে তারা অস্ত্র ফেরত দেবে ও অবরোধ তুলবে, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। শর্তগুলো মূলত একই ছিল। আমি তাকে আলোচনা চালিয়ে যেতে বলি এবং জানাতে বলি, জেলা প্রশাসক (আমি) নিজে ক্যাম্পে আসছেন এবং তাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন। কৌশলটি কাজ করেছিল এবং বিদ্রোহী প্রতিনিধি আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়।
তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যাওয়ার আগে আমি পুলিশ সুপারকে কক্সবাজারে থাকা চার কোম্পানি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে (প্রায় চার শ সদস্য) ঘুমধুম ক্যাম্পের চারপাশে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিই—তবে তারা ক্যাম্পে প্রবেশ করবে না। রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ আমি গাড়িতে কেবল দুজন সশস্ত্র পুলিশ গার্ড নিয়ে একাই ঘুমধুম গিয়ে পৌঁছাই।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা ক্লান্ত একজন রোহিঙ্গা নারী। ছবি: রয়টার্স
প্রায় তিন থেকে চার হাজার শরণার্থীর ওই ক্যাম্পে তখন এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা। প্রায় আধা বর্গমাইল এলাকাজুড়ে তারপোলিন ও ছনের তৈরি আশ্রয়ে পরিবারগুলো থাকত। গাছগাছালির ছায়ায় ঢাকা ক্যাম্পের গলিগুলো চলে গেছে ভেতরের দিকে। একটি পরিত্যক্ত ডাকঘর ভবনকে ক্যাম্পের পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। আমি যখন সেখানে পৌঁছাই, যে কনস্টেবলরা অস্ত্র হারিয়েছিলেন, তারা বেশ ভীতসঞ্চারিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। ঘরের মেঝেতে কয়েকজন সাধারণ রোহিঙ্গা বসে ছিল, যারা সশস্ত্র ছিল না এবং জানাল যে তারা এই উগ্র দলের অংশ নয়।
তক্ষণাৎ মেঝেতে বসা শরণার্থীদের মধ্য থেকে ওই তথাকথিত প্রতিনিধিকে আমার সামনে আনা হয়। তিরিশের কোঠায় বয়স, ছাগলদাড়ি, পরনে লুঙ্গি ও রঙিন শার্ট। তিনি সালাম দিলেন, আমি উত্তর দিয়ে তাকে ভবনের বারান্দায় ডেকে নিলাম। সরাসরি জানতে চাইলাম তিনি ওই উগ্র দলের লোক কি না। তিনি সজোরে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে বললেন, তিনি হামলায় ছিলেন না, তবে হামলাকারীদের চেনেন। আমি কাজের কথায় এসে তাকে বললাম—আমি যদি প্রত্যাবাসন স্থগিত করার আশ্বাস দিই, তবে তিনি কি অস্ত্র ফেরত আনা এবং জিম্মি কমিশনারকে মুক্ত করার বিষয়ে নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবেন? তিনি বললেন, আমার উপস্থিতিতে ফোনে চেষ্টা করতে পারেন।
কক্সবাজারের সঙ্গে ঘুমধুমসহ অন্য ক্যাম্পের একটি অপারেটরচালিত ফোন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল। ফোনটি পুলিশ আউটপোস্ট এবং ক্যাম্পের একটি তাঁবু—যা শরণার্থী কমিশনারের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল এবং উভয় স্থানেই যুক্ত ছিল। উগ্র রোহিঙ্গারা ওই কার্যালয়টি দখল করে রেখেছিল। প্রতিনিধিটি সেখান থেকে ফাঁড়ির ফোন ব্যবহার করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন। আমি অন্য প্রান্তের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না, তবে প্রতিনিধিটি যে অফার দিচ্ছিলেন তা শুনছিলাম। অবশ্য শুনলেও পুরোপুরি বুঝতাম না, কারণ তারা স্থানীয় উপভাষায় কথা বলছিল, যা চট্টগ্রামের উপভাষার চেয়েও দুর্বোধ্য।
আলোচনা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলল, কারণ বিদ্রোহীরা শর্তগুলো মানতে রাজি হচ্ছিল না। তারা কমিশনারকে ছাড়বে ও কার্যালয় ত্যাগ করবে, কিন্তু তালিকাভুক্ত শরণার্থীদের মূল ক্যাম্পে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত অস্ত্র দেবে না। কিন্তু এর মানেই তো প্রতীকী প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি স্পষ্ট জানালাম, বিদ্রোহীরা অস্ত্র ফেরত না দিলে, অবরোধ না তুললে এবং কমিশনারকে মুক্ত না করলে প্রত্যাবাসন বন্ধের কোনো প্রশ্নই আসে না। তবুও তারা না মানায় আমি নিজেই ফোন হাতে নিই এবং সরাসরি তাদের নেতাকে সম্বোধন করি।
আমি বললাম, আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। যদি তারা আমার শর্ত না মানে, তবে ক্যাম্প ঘিরে থাকা চার শ সশস্ত্র পুলিশ সদস্য আমার এক নির্দেশে ভেতরে ঢুকে যাবে। যে তাঁবুতে তারা অবস্থান করছে, সেখানে গিয়ে যাকেই পাবে তাকেই গুলি করবে। আমি জানতাম এটি একটি ফাঁকা হুমকি বা ব্ল্যাফ ছিল, তবে আমি এ-ও জানতাম যে বিদ্রোহীরা এই ধরনের আক্রমণের মুখমুখী হওয়ার মতো অবস্থানে নেই।
ফাঁকা হুমকি কাজ দিল। বিদ্রোহীরা অস্ত্র জমা দিতে ও কমিশনারকে ছেড়ে দিতে রাজি হলো, তবে শর্ত দিল আমাকে প্রত্যাবাসন স্থগিতের প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। আমি রাজি হলাম, তবে জানালাম আমি নিজেই ওই ৪০ জন শরণার্থীকে সঙ্গে করে কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে দেব। আর ভোর হওয়ার আগেই বাসে (যেটি সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল) তাদের ওঠানোর নির্দেশ দিলাম।
কয়েক মিনিটের মধ্যে একদল রোহিঙ্গা সংগৃহীত অস্ত্র নিয়ে ফাঁড়িতে জমা দিয়ে গেল। কমিশনারের কথা জিজ্ঞেস করতেই তারা জানাল, তাকে এক শরণার্থীর ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে, আমি গিয়ে নিয়ে আসতে পারি। একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচ মিনিট হেঁটে গিয়ে দেখি পুরোপুরি হতবিহ্বল হয়ে পড়া এক শরণার্থী কমিশনার বিছানায় বসে আছেন। মানসিক বিপর্যয়ের কারণে আমাকে দেখেই তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি চাকরিতে ও বয়সে আমার চেয়ে বেশ সিনিয়র ছিলেন। এমনকি তিনি আমার সঙ্গে আসতেও অস্বীকৃতি জানান। অনেক বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কথা বলে এবং প্রত্যাবাসন স্থগিতের এক মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাকে বের করে আনি।
ফাঁড়িতে ফিরে প্রথমে কমিশনারকে একটি গাড়িতে তুলে কক্সবাজার পাঠিয়ে দিই। তারপর ৪০ জন তালিকাভুক্ত শরণার্থীর কাছে গিয়ে তাদের বাসে তুলি। পুলিশের সঙ্গে আমি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, বাসটি কুতুপালংয়ের দিকে রওনা হলেও কয়েক মাইল গিয়ে থেমে আমার গাড়ির জন্য অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে কক্সবাজারের এসডিওকে (মহকুমা প্রশাসক) ফোন করে জানালাম যে আমাদের প্রত্যাবাসন পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। প্রতীকী প্রত্যাবাসনের সময় কয়েক ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে এবং তিনি যেন স্থানীয় বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) কমান্ড্যান্টকে ঘুমধুম বিওপি দিয়ে প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নিতে বলেন। এই তথ্যটি যেন প্রেস বা অন্য কারও কাছে না যায়, সে বিষয়ে তাকে সতর্ক করি।
যাত্রীবাহী বাসটিকে পেছনে রেখে আমি দুজন পুলিশ নিয়ে জিপ চালিয়ে কুতুপালংয়ের উল্টো দিকে (অর্থাৎ ঘুমধুমের দিকে না গিয়ে) রওনা দিলাম। কয়েক মাইল যাওয়ার পর গাড়ি থামিয়ে বাসটিকে ঘোরাতে বললাম—আবার ঘুমধুম বিওপির দিকে। কুতুপালংয়ের দিকে এই যাত্রাটি ছিল মূলত একটি প্রতারণামূলক কৌশল, যাতে সাধারণ রোহিঙ্গারা মনে করে যে তালিকাভুক্তদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। হয়তো এত সতর্কতার প্রয়োজন ছিল না, কারণ বাসে তোলার পর সোজা সীমান্তে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি এবং বার্মা পক্ষকে সময় পরিবর্তনের কথা জানানোরও প্রয়োজন ছিল।
দুই ঘণ্টার মধ্যে আমরা ঘুমধুম সীমান্তে পৌঁছাই। তখন দুপুর ১২টা। আমাদের বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বিডিআর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। নাফ নদীর ওপরের সেই বেইলি ব্রিজ পার করে আমি নিজেই ৪০ জন শরণার্থীকে বার্মা অংশে নিয়ে যাই, যেখানে বার্মিজ কর্মকর্তারা অপেক্ষা করছিলেন। সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়! পুরো এক রাতের ভয়াবহতা, জিম্মি দশা এবং রক্তপাতের আশঙ্কার পর সেই স্বস্তি ছিল অবর্ণনীয়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে সব নিরাপদে শেষ হলো!
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহায়তা কমার পর মানবেতর জীবন পার করছেন রোহিঙ্গারা। ছবি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
বার্মিজ কর্মকর্তারা সৌজন্যের সঙ্গে শরণার্থীদের গ্রহণ করেন এবং একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে যান। কিন্তু ফেরার পথেই ঘটে এক দুর্ঘটনা। কাঠের তৈরি বেইলি ব্রিজটি মানুষের ভার সইতে না পেরে ভেঙে পড়ে এবং আমরা সবাই পানিতে পড়ে যাই। ভাগ্যবশত নাফ নদী সেখানে খুব একটা চওড়া বা গভীর ছিল না। ফলে আমরা ডুবে যাইনি, তবে কাঠের আঘাতে আমার চশমা ভেঙে গিয়ে কপালে বেশ গভীর কেটে যায়। বিডিআর সদস্যরা আমাকে উদ্ধার করে। উপস্থিত এক চিকিৎসক ক্ষতে ব্যান্ডেজ করে দেন। সেই গভীর ক্ষতচিহ্নটি আমার কপালে বহু বছর রয়ে গিয়েছিল।
ঘুমধুমের এই সাফল্য এক বিশাল লজিস্টিক বাধা দূর করে দিয়েছিল। প্রথম সংগঠিত পারাপার সফল হওয়ার পর সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ অনেকটাই ভেঙে পড়ে এবং একটি দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সফল কৌশলের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই অর্ধেক শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় এবং ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ১৯৭৮ সালের সব ক্যাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রায় পাঁচ দশক আগে আমাদের সেই ১৯৭৮-৭৯ সালের প্রত্যাবাসনের সাফল্য আজকের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ দেখাতে পারবে না। সে সময় আমরা মাত্র দুই লাখ শরণার্থী সামলেছিলাম, ১০ লাখের বিশাল জনগোষ্ঠী নয়। তা ছাড়া, সে সময় আন্তর্জাতিক মহলের বড় কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি আমরা সমাধান করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি ভারত, চীন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহু পক্ষ যুক্ত। তখনকার প্রাথমিক রোহিঙ্গা আন্দোলনটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
তাই ৪৬ বছর আগে আমরা যা করতে পেরেছিলাম, তা এখন সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা নেতারা যতক্ষণ না বিশ্বাস করছেন যে তারা নিজ দেশে নিরাপদ, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ১০ লাখের বেশি মানুষকে মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারি না। তার ওপর যুক্ত হয়েছে রাখাইন অঞ্চলের নতুন শাসক 'আরাকান আর্মি', যারা রোহিঙ্গাদের প্রতি একেবারেই সহানুভূতিশীল নয়। মিয়ানমার সরকারের ভঙ্গুর অবস্থা এবং আরাকানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ফলে এই বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গাকে নিরাপদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো চুক্তির আশা করা কঠিন। তা ছাড়া, কোনো বিবেকবান সরকার হিসেবে বলপ্রয়োগ করে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার অমানবিক পথও আমরা বাছতে পারি না। ফলে, এখনকার মতো মনে হচ্ছে—এই ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আরও কিছুকাল কক্সবাজারেই আমাদের রেখে দিতে হবে।
লেখক: চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক