দেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে, নাকি চলবে না? হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? উত্তরের বদলে বরং ফের প্রশ্ন করা যায়–প্রশ্নটি উঠবে না কেন? কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর তো বটেই বর্তমান সরকারের সময়েও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন আয়োজন ঘিরে হামলা, হুমকির মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবেই। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক আয়োজন পিছু হটেছে।
খুব বেশি আগের কথা নয়। বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমা যখন সারা দেশে একটা আলোড়ন তুলল, সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি স্কুলে এই সিনেমার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অথচ ‘অশ্লীলতা’ রয়েছে–এমন দাবি এবং এ নিয়ে বেশ প্রবল আপত্তির (পড়া ভালো হুমকির) মুখে সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করা হয়।
সর্ব সাম্প্রতিক ঘটনাটি একই জেলার একটি পুলিশ লাইনসে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে। সেখানে পুলিশের বড় কর্তার আগমন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সে আয়োজন ভেস্তে শুধু যায়নি, হামলা, আহত এবং পুলিশের তিন সদস্যের প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে আপাত নিষ্পত্তি হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে পুলিশের তরফ থেকে এটিকে নিষ্পত্তিই বলা হয়েছে। আর সেখানে সালিশ মীমাংসার চূড়ান্ত রায়টি দিয়েছেন মাদ্রাসা পক্ষের লোকেরাই।
এ রায়টি রাষ্ট্র শুধু মাথা পেতে মেনেই নেয়নি রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র হিসেবে প্রকারান্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে স্বীকারও করে নিয়েছে। এই ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাটিই শুনুন-“ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এরকম যে গান-বাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আরকি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে যা ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার সেটা নিয়েছি।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিস্থিতি আলাদা বলে সেখানে রাষ্ট্রের বিকল্প কোনো শক্তির কথা কি জানান দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? অনেকটা সে রকমই। সেখানে সালিশি মেনে তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করতে হয়েছে, আর মুখে বলতে হয়েছে বরখাস্তের কথা, যেন উচ্চ সাজার কথা বলে ঠিকঠাক ম্যানেজ করা যায়। তো এই ম্যানেজ করার চেষ্টাটা রাষ্ট্রের তরফ থেকে করা হচ্ছে। সেটা ‘পরিস্থিতি আলাদা’ মনে হওয়া অঞ্চলগুলোতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় সে অঞ্চলের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কিন্তু বাস্তবে তার আরও অনেক পরিচয় সামনে আসছে। এই যেমন কিশোরগঞ্জ, যেখানে কনসার্ট বাতিল হলো একই দাবিতে, তালিকায় আছে সিলেট, যেখানে নৌকাবাইচ হওয়া না হওয়াটা ঝুলছে চিকন সুতার ওপর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা মানলে হয় সিলেট, কিশোরগঞ্জকেও একই কাতারে ফেলতে হয়, নইলে উভয়কেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে স্বীকার করে নিতে হয়। শুধু এ দুই জেলা কেন, আরেকটু এগিয়ে এও বলে দেওয়া যায় যে, গোটা বাংলাদেশই ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কারণ, এলাকার নাম নির্বিশেষে ব্যবস্থা একই। একটু বুঝিয়ে বলা যাক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাটির বিবরণে যেটা জানা যায়–পুলিশ লাইনসের সন্নিহিত অংশেই ছিল মাদ্রাসাটি। পরদিন ছিল ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উচ্চ শব্দ তাদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। এটা নিশ্চিতভাবেই নাগরিকের বা শিক্ষার্থীদের একটি বিজয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষত অপরপক্ষে যখন থাকছে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে পুলিশের মতো একটি কাঠামো। কিন্তু এ সামষ্টিক গৌরবের কি সুযোগ আছে?
প্রশ্নটা আসছে কারণ, যখন প্রসঙ্গটা গানের অনুষ্ঠান, কনসার্ট, মেলা, যাত্রা বা এমন যেকোনো সাংস্কৃতিক বিষয় সম্পর্কিত, তখন এ নিয়ে বিরোধে বিজয়ী দল শুধু একটিই, এবার সেটা মাদ্রাসা বা স্থানীয় আলেম ওলামা বা হেফাজত বা এমন যেকোনো লেবাসধারীই হোক না কেন। কিশোরগঞ্জে যে কনসার্ট বাতিল হলো, মধুপুরে যে লালন মেলা পণ্ড হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে সিনেমার প্রদর্শন বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হলো, কিংবা মাজারে মাজারে যে হামলা হলো, জশনে জুলুস থেকে শুরু করে দরবারে হামলা করে আবদুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো কিংবা নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হলো–এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি পক্ষ ও তাদের দাবি ধ্রুব–বেদাতি কাজ করা যাবে না। প্রতিটি ক্ষেত্র আয়োজন ও আয়োজকের পরিচয় বিচারে ভিন্ন ভিন্ন হলেও তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে আসা পক্ষটির পরিচয় এক ও অভিন্ন–তৌহিদি জনতা। মজার বিষয় হলো–এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজয়ী পক্ষও এই এক ও অভিন্ন পক্ষ, যার কিন্তু আবার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিচয় নেই। অনেকটা পানির মতো বিষয়–যখন যে পাত্রে থাকে, সে পাত্রের আকার ধারণ করে, কিন্তু বৈশিষ্ট থাকে একই।
আর পরাজিত পক্ষ বা পিছু হটা বা আক্রান্ত পক্ষগুলো আগেই বলেছি–পরিচয় ও ভূমিকা বিচারে আলাদা তারা। এর মধ্যে যেমন সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাজার, বাউল, ব্যক্তি থেকে শুরু করে পুলিশ পর্যন্ত। এই প্রতিটি ভিন্ন পরিচয়ের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এ ক্ষেত্রে পিছু হটার তালিকায়। ফলাফল? ফলাফল হলো রাষ্ট্রের বাইরে এবং রাষ্ট্রকে চোখ রাঙিয়ে একটি ক্ষমতাতন্ত্রের প্রকাশ এখন দিবালোকের মতো সত্য। তারা কারও কাছে জবাবদিহি করে না। তারা গুঁড়িয়ে দেয়। এমনকি তাদের সালিশ মেনে পুলিশও নিজ বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করে এবং ভাষার মারপ্যাঁচ দিয়ে রাখঢাকের চেষ্টা করে ক্ষমা চায়।
এর শুরুটা কী প্রকারে? সেই ইতিহাসে গেলে অনেক কেত্তন করতে হবে। এসব এখন আর নতুন কথাও নয়। বরং এ নিয়ে যার ইচ্ছা একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। মূল কথা হলো–দেশে ৩০ হাজারের বেশি মাদ্রাসা রয়েছে। মোটাদাগে ২০ হাজারের কাছাকাছি কওমি ঘরানার এবং ৯ হাজারের বেশি আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে। কেউ কেউ ২৫ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসা আছে বলে দাবি করেন। এ নিয়ে রাষ্ট্রও খুব একটা এগোয়নি। এই কওমি ঘরানা আবার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনেকটাই। এর অর্থায়ন থেকে শুরু করে সিলেবাস কোনো কিছুরই নিয়ন্ত্রণ তো দূর ঠিকঠাক তথ্যও নেই সরকারের কাছে। ফলে একটা সমান্তরাল জগৎ চলছে বাংলাদেশে।
এই কওমি ঘরানাটি কিন্তু গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ বাস্তবতায়। মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে ইসলাম আক্রান্ত হচ্ছে–এমন ধারণা থেকেই ইসলামকে রক্ষার চেষ্টা থেকে এক ধরনের রক্ষণশীল ঘরানা হিসেবে এর জন্ম (যার প্রয়োজন ইতিহাসে নজর বোলাতে পারেন)। এর পর পাকিস্তানের জন্ম এবং তা থেকে বাংলাদেশের জন্ম। দুটি নয়া ইতিহাসের চক্রে ভূখণ্ডটি প্রবেশ করলেও এই ঘরানায় কোনো বদল আসেনি। ফলে এই ঘরানা থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের গাঢ় রক্ষণশীলতা দেখা যায়। এটা এমন এক চোখ ফোটায়, যা প্রতিনিয়ত বলে যে, তোমার ধর্মকে লুট করতে নেমেছে অন্যরা। এরই ফল হলো–সব কিছুতে গেল গেল রব। আর সংখ্যার শক্তিতে দিন দিন ফুলে ফেঁপে ওঠায় তাদের অর্থায়ন যেমন, তেমনি প্রভাব দুইই বেড়েছে হাতে হাত ধরে।
সমাজের এই অংশটি রাষ্ট্র স্বীকৃত না হলেও একটি শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যায়। বিনিময়ে পায় হতাশা। কারণ তার জন্য অপেক্ষা করে নেই কোনো চাকরি। ফলে তাকে আশ্রয় নিতে হয় আরেকটি অনুরূপ কাঠামোয়। হয় সে নিজেই কয়েকজনকে একজোট করে একটি মাদ্রাসা দেয়, অথবা কোনো মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন ইত্যাদি পদে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফল হয় দুটি–আরও কওমি মাদ্রাসা এবং আরও মসজিদ। একইসঙ্গে এটি সমাজের বিদ্যমান কাঠামো, জীবনাচার ইত্যাদিকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরই ফল হলো সেই পুরোনো নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মতো স্থানিক আইন, যা সিনেমা থেকে গান সবকিছুর কণ্ঠ চেপে ধরতে চায়। কতটা উৎকটভাবে, তার প্রমাণ বিভিন্ন সংবাদেই মিলবে।
এই কণ্ঠ চেপে ধরাটা সমাজের ভেতরে নয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর একটা ইঙ্গিত পৌঁছে দেয়। এই ইঙ্গিত সমাজকে নতুন করে ইসলামে বা আশু ইসলামি জমানার জন্য প্রস্তুত হতে বলে। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। ফলে দলগুলো আর এ নিয়ে কথা বলে না। কেউ কেউ এদের সঙ্গে সখ্য রাখতে চায়। সবই ক্ষমতার সমীকরণ। কারণ এরা প্রত্যেকেই ভোট বা ভোটের সম্ভাবনা। রাষ্ট্রকে কোনো বিচারেই ধর্তব্যে না নিয়ে চলা এই সমাজের এই অংশের সংকট সমাধান নয়, তার জন্য রুটি রুজির অনুকূল শিক্ষার দাবি তোলা নয়, তার সামাজিক ও ব্যক্তিক জীবনাচার নয়, তার মানসিক বিকাশ নয়, মূল বিবেচ্য হয় ভোট। কারণ আগামী নির্বাচন সব সময় সামনেই থাকে। আর সেখানে থাকে এক মোহনীয় ব্যালট বাক্স।
তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমার প্রদর্শন বন্ধ হলেও, সেখানে পুলিশদের সাংস্কৃতিক আয়োজনে হামলা হলেও সে অঞ্চলের সংসদ সদস্য নিশ্চুপ থাকেন, যিনি একসময় এসব বিষয়ে পথে ও পোডিয়ামে বেশ সোচ্চার ছিলেন। তাকে নিশ্চুপ থাকতে হয়। না কারও হুমকি-ধমকিতে নয়। এ চুপ থাকা কোনো বোকা বোকা চুপ থাকাও নয়। এ বরং স্বেচ্ছায় একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া, যে পক্ষের দিকে ক্ষমতা অনেকটাই নত হয়ে আছে। কে না জানে পলিটিক্স হলো আর্ট অব নেগোসিয়েশন। সেই আর্ট যে যত রপ্ত করতে পারবে, সে তত উচ্চতায় উঠবে। এটা তো একটি উদাহরণ দেওয়া হলো। বিষয়টা এক–দুইয়ের নয়। বর্তমান বিএনপি সরকার ও তার শীর্ষ নেতারা এই সমঝোতা করে টিকে থাকার লাইনেই হাঁটছেন। ক্ষমতাকে সুসংহত করতে সাধারণ মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকানোর বদলে গলা ও বাহুর জোরওয়ালাদের আশপাশে ঘুর ঘুর করছেন তারা। ভুলে যাচ্ছেন এ সমীকরণের উল্টো দিকের কথা।
সেটা কেমন? বুঝতে হলে ‘কওমি জননী’ খেতাব ও তা সম্পর্কিত আলাপে ডুব দিতে হবে। এত সময় কোথায়? শুধু খেতাবটি মনে করে দেখুন–খেতাবপ্রাপ্ত কিন্তু ক্ষমতার শিখরটিতে নেই। নেগোসিয়েশন আসলে কার সঙ্গে কী নিয়ে কাদের স্বার্থে করছেন–সেদিকে একটু নজর দিন। নইলে ক্ষমতা পোক্ত হওয়ার বদলে তা ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে। তা ঝরে পড়ুক; সমস্যা নেই। কেউ না কেউ ক্ষমতা নেবে। বসবে মসনদে। কিন্তু মাঝখান থেকে কোটি লোকের সর্বনাশ হয়ে যাবে। সে সর্বনাশ তারাপদ রায়ের অতটা কাব্যিক সর্বনাশ নয়। বড় তেতো, বড় বিদঘুটে সে সর্বনাশ।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা