বাংলাদেশের নতুন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নের কথা বলে আসছেন। এই ছয় মাস পূর্তিকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় রদবদল ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আলোচনার মধ্যেই সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চরচা প্রতিবেদক মেরিনা মিতু।
ছয় মাসের সরকারের মূল্যায়ন, রেল খাতের লোকসান, সড়ক নির্মাণের ব্যয়, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ এবং আগামী দিনের যোগাযোগ পরিকল্পনা নিয়ে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব থাকছে আজ–
চরচা: একজন মন্ত্রী হিসেবে সরকারের এই ছয় মাসকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শেখ রবিউল আলম: সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এটা সরকারের একটা অঙ্গীকার ছিল–ছয় মাস পর আমরা মূল্যায়ন করব। এটা তো আমাদের সরকারের জায়গা থেকে রিয়েলাইজেশন। আমরা যে একটা দায়বদ্ধ সরকার, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকার, আমরা মনে করি, আমাদের জবাবদিহি থাকা দরকার এবং আমাদের কর্মের একটা মূল্যায়ন আমাদের মধ্যেই হওয়া উচিত–ছয় মাসে আমরা কতটুকু করতে পারলাম; পাঁচ বছরের যে টার্গেট, সেই টার্গেটের ছয় মাসে কী কী প্রাধিকার পাবে; সেটা চিহ্নিত করে ছয় মাস পর জনগণকে জানাতে হবে।
একটা সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর। সে পাঁচ বছরই তার যে নির্বাচনী স্থিতি, সেই অনুপাতে কাজ করবে–এটাই হলো ন্যায্য। আমরা অধিকতর দায়বদ্ধ থাকার জন্য, অধিকতরভাবে ধারাবাহিকভাবে ফাংশন করার জন্য ছয় মাস নির্ধারণ করেছি। বলতে পারেন এটা আমাদের জবাবদিহিতার অংশ।
সেই জায়গা থেকে যদি বলেন, উই আর ইন রাইট ট্র্যাক। সরকার তার অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন ছয় মাসের মধ্যে করেছে। আর আগামীতে বাস্তবায়ন হতেই হবে–সেই ধরনের প্রকল্প এই ছয় মাসে গ্রহণ করেছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমি সফলতাই দেখছি। খুব বেশি বিচ্যুতি আমি দেখছি না। দুই-একটি ক্ষেত্রে ছয় মাসের জায়গায় সেটা বাস্তবায়ন করতে হয়তো এক মাস-দুই মাস বেশি লেগেছে।
আমার সব জায়গাতে ঠিক আছে। অ্যাচিভমেন্ট যেটি চেয়েছিলাম, ছয় মাসের মধ্যেই রাস্তায় নিয়ে আসব ইলেকট্রিক বাস–সেটা আমাদের প্রক্রিয়াগত একটু জটিলতায় দেরি হচ্ছে। যেমন–পারচেজটা (ক্রয়) আপনি কীভাবে করবেন… প্রকল্প নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার করে, প্রকল্প পাস করে যদি করতে যান, দেড় থেকে দুই বছর লেগে যায়। বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দরকার। বাজেট কয়দিন আগে হয়েছে, এটা জানেন। অর্থ আবার প্রকল্প ছাড়া বড় ছাড় করা যায় না। তাহলে প্রকল্প নিতে গেলে দেড়-দুই বছর দরকার।
তো, সেখানে ডাইরেক্ট পারচেজের আবার একটা প্রক্রিয়া আছে। আপনি ইচ্ছা করলেই যেকোনো একটা কোম্পানি থেকে বাস কিনে আনতে পারবেন না। ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার করতে হবে। ডাইরেক্ট পারচেজ করতে গেলে কী হয়? সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আরেকটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডাইরেক্ট পারচেজ করতে পারে, যেটাকে ডিপিএম বলে।
অল্প সময়ে আনার জন্য আমরা ডিপিএমে গিয়েছি। অলরেডি ডান। আমরা হয়তো…এই বাসটা ছয় মাসের মধ্যে আনতে পারলে ভালো হতো, আমাদের কয়েক মাস বেশি লাগবে। ইলেকট্রিক বাস নিয়ে বাংলাদেশের যে চুক্তি হচ্ছে, সেই অনুসারে আমি ধরে নিচ্ছি, আড়াই মাসের মধ্যে আমরা ই-বাসটা চালু করতে পারছি।
আর বাকি যেগুলো আমার ছিল, সবগুলো আশা করছি যে ছয় মাসের জবাবদিহিতা—আমার কাছে ছয় মাসের জবাবদিহিতা, কিন্তু সরকারের জবাবদিহিতা সরকারের কাছে, রাইট কি না? মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা মন্ত্রণালয়ের কাছে—যে আমরা কী অ্যাচিভ করলাম, আমরা একটু বিশ্লেষণ করে দেখি, ভেবে দেখি, ছয় মাসে আমাদের টার্গেটটা আমরা ফিল করতে পারলাম কি না, জানলাম কি না। সে জায়গায় যদি বলেন, আমরা সফলতার সাথেই ছয় মাস শেষ করেছি।
চরচা: সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় রদবদল কিংবা দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস কিছু হয়েছে, আরও কিছুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। গুঞ্জন আছে, আপনার মন্ত্রণালয়গুলোতেও পরিবর্তন আসতে পারে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
শেখ রবিউল আলম: দেখুন, পরিবর্তন-পুনর্বিন্যাস এগুলো গণতান্ত্রিক চাওয়া। আলোচনা-গুঞ্জন এ সবকিছুই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অংশ। মানুষের মনেই হবে, এই হলে ভালো, ওই হলে ভালো। কিন্তু মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন বা দায়িত্বের পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। প্রধানমন্ত্রী যেটা ভালো মনে করবেন, যেভাবে মনে করবেন, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবেন।
মন্ত্রিসভার আকার বাড়বে কি না, কারো দায়িত্ব পরিবর্তন হবে কি না–এগুলো আমার জানার বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রী তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু করবেন।
আমি যে দায়িত্ব পেয়েছি, সেটা পালন করার চেষ্টা করছি। আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমি কতটুকু করতে পারলাম, সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব থাকবে কি থাকবে না, সেটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত।
আমি মনে করি, একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে, নিজের কাজটা যথাযথভাবে করা। পরিবর্তন বা পুনর্বিন্যাস হলে সেটাও সরকারের স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রধানমন্ত্রী যখন যেটা প্রয়োজন মনে করবেন, সেটাই করবেন।
শেখ রবিউল আলম। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
চরচা: আপনার পরিশ্রম, অর্জন এবং একাধিক দায়িত্বের জায়গা থেকে নিজের সফলতা ও ব্যর্থতার জায়গাটা কোথায় দেখেন?
শেখ রবিউল আলম: আত্মসমালোচনা যদি আমি বলি–সরকার যে গতিতে চাইছে, প্রধানমন্ত্রী যে গতিতে চাইছেন, সেই গতিতে আমি পারছি না।
আপনি যদি বলেন আমার সদিচ্ছার অভাব–একেবারে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর যে জরাজীর্ণতা এবং যে প্রতিবন্ধকতা দীর্ঘদিন ধরে আছে, সেই প্রতিবন্ধকতাগুলোকে রাতারাতি জয় করে, ফেস করে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে বাস্তবায়ন করাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং।
সে জায়গায় আমি অগ্রসর হয়েছি। যতটা অগ্রসর হয়েছি, সেটা যথেষ্ট আমি মনে করলেও মানুষ মনে করবে না। কারণ মানুষ আরও অ্যাডভান্স চিন্তার ওখানে চলে আসছে। দেখছি না, সে সাফার করছে!
আর আমি যখন সারাদিন-রাত চেষ্টা করে ওই জরাজীর্ণ অবস্থানগুলোকে রিফর্ম করতে চাচ্ছি, সেটা আমার কাছে মনে হয় আরও দ্রুত করা দরকার। কিন্তু বাস্তবিকভাবে যখন করতে যাচ্ছি, তখন দেখছি যে প্রত্যাশার চেয়ে গতি…আমি প্রত্যাশার সাথে গতি মিলাতে পারছি না। সেখানে রাতারাতি পরিবর্তন করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বেশ আইনগত জটিলতা, প্রসিডিউরাল প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অনেক অন্তরায় আছে। সেই চ্যালেঞ্জগুলো জয় করতে পারলে আমার মনে হয় ভালো হবে।
তবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, এলাকাপ্রীতি, ব্যক্তিগোষ্ঠীর স্বার্থ–সেটা শতভাগ বন্ধ, এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তা সব জায়গায় বন্ধ হয়েছে।
যে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি জনগণের টাকা জনগণের জন্য ব্যয় করার জন্য হচ্ছে। এখানে কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো প্রকল্প হচ্ছে না। ব্যক্তিগোষ্ঠী লাভবান হবে–সেই প্রক্রিয়া, সেটা একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তো, এটা হলো একটা জিনিস যে জনগণের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, জনবান্ধব প্রকল্প হচ্ছে।
চরচা: আগামী ছয় মাসে সড়ক যোগাযোগে কোন প্রকল্পগুলোকে আপনি সামনে রাখতে চান?
শেখ রবিউল আলম: এটা আমাকে সময় দিতে হবে–মিনিমাম দুই ঘণ্টা বলতে হবে! এত প্রকল্প! দুই ঘণ্টা বলতে হবে!
আমি যদি আপনাকে পাতা সাপ্লাই করি, আমার মনে হয় এই তিন মন্ত্রণালয়ে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেটা স্মরণীয়, অসাধারণ হবে মানুষের কাছে। এখন এটা বাস্তবায়ন করবার জন্য আমরা বেশি বৈদেশিক ঋণের দিকে যেতে চাইছি না। নিজস্ব অর্থায়নে আবার অনেকটা চ্যালেঞ্জ আছে। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্য থেকে সর্বোত্তম অর্থ বরাদ্দ করতে চাচ্ছি।
পিপিপি পদ্ধতিকে বেশি উৎসাহিত করছি। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, পিপিপি পদ্ধতিতে যদি বড় প্রকল্প, মেগা প্রকল্প করা যায়… জনগণ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সুফল পায় এবং তাতে জনগণকে কিছু কন্ট্রিবিউশন করতে হয়, (তবে) এটি হচ্ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো মেথড। তো, সেই মেথডে আমরা বড় বড় প্রকল্পগুলো নিচ্ছি।
আর যদি যোগাযোগে বলেন, ন্যাশনাল হাইওয়ে, আঞ্চলিক হাইওয়ে এবং ডিস্ট্রিক্ট হাইওয়ে–সেগুলো আগে একটা ক্যাটাগরি ছিল না। সর্বশেষ মিটিংয়ে আমরা যেমন ধরেন, জেলা মহাসড়ক–অনেকে না বুঝে বলে চার লেনের…তো, চার লেনের একটা সড়ক আপনি করবেন, সেই যাত্রী ওখানে আছে কি না, সেই মালামাল ক্যারি হয় কি না দেখতে তো হবে।
অর্থাৎ জেলা সড়কগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড টুলে করতে চাই। তার মানে ৩৪ মিটারের মতো। যেটা চার লেন বললে ভুল হয় না? স্ট্যান্ডার্ড টুল চাই। আমরা উপজেলা সড়কগুলোকে সেটা ২৪ মিটারের মধ্যে করতে চাই। স্ট্যান্ডার্ড টুলের কাছাকাছি পেয়ে যাবে–এরকম একটা নীতিমালা গ্রহণ করেছি।
রাষ্ট্রে একটা মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনটি সেক্টরে–রেল, নৌ এবং সড়কে–এলাকার ডিমান্ডকে বিবেচনায় নিয়ে, জাতীয় অর্থনীতি এবং স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প হয়েছে। যার ফলে একটা মাল্টিমোডাল যোগাযোগ সিস্টেম প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য সমন্বয় করে যা যা করা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী করা হয়েছে। যা প্রয়োজন, তা-ই করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুসারে করা হবে বিধায় তিনটি মন্ত্রণালয় এক করে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।