রাজধানীর সড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, স্টপলাইন দখল, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, লেন পরিবর্তনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধ এখন ট্রাফিক পুলিশের চোখ এড়িয়ে গেলেও চোখে এড়াবে না এআই ক্যামেরার।
ঢাকার সড়কের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অপরাধ শনাক্ত করছে। আইন অমান্য করা যানবাহনের ভিডিও ও ছবি সংরক্ষণ করছে, তাৎক্ষণিকভাবে মামলা (প্রসিকিউশন) প্রস্তুত করবে।
শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকের মোবাইল নম্বর ও ঠিকানায় সেই মামলার নোটিশও পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, যা সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
যেভাবে শুরু হলো এআই ট্রাফিক মনিটরিং
গত ২৮ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর শাহবাগ ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে জাহাঙ্গীরগেট পর্যন্ত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল পয়েন্টে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। পরদিন ২৯ এপ্রিল ডিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির ‘এআই বেজড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম’সহ মোট নয়টি প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই প্রযুক্তি ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। এর ফলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।”
এরপর ৩ মে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চালক ও গাড়ির মালিকদের সতর্ক করা হয়। তবে তার আগেই ২ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় মামলা কার্যক্রম শুরু করে ট্রাফিক বিভাগ।
এআই ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে?
ধরা যাক, ট্রাফিক সিগন্যালে সকল যানবাহন লালবাতি দেখে অপেক্ষায় আছে। এসময় একটি মোটরসাইকেল বামপাশের লেন বন্ধ করে দিলো। এআই ক্যামেরা সেই মোটরসাইকেলটিকে তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে তাৎক্ষনিকভাবে সনাক্ত করবে এবং মোটরসাইকেল চালক নিয়ম ভেঙ্গে সড়কের বামপাশের লেনের ঠিক কত শতাংশ জায়গায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে তাও নির্ণয় করবে। এরপর স্বয়ংক্রীয়ভাবে ওই মোটসাইকেলের নম্বরপ্লেটের তথ্য সংগ্রহ করবে এআই ক্যামেরা। এসব তথ্য এআই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রসিকিউশন প্রস্তুত করে সার্ভারে জমা করবে।

আবার ধরা যাক, কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ার মোড়ে বসুন্ধরা সিটির সামনে থেকে আসা একটি প্রাইভেট কার সিগন্যালে এসে জেব্রা ক্রসিং ব্লক করে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে এআই ক্যামেরা গাড়িটির নাম্বার প্লেটসহ কী ধরনের অপরাধ করেছে, কখন-কোথায় এবং অপরাধের মাত্রা কতখানি তা নির্ণয় করবে এবং তথ্য-প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট সার্ভারে সংরক্ষণ করবে। পরে সেই অনিয়ম প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে অভিযুক্তদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে পুলিশ।
ডিএমপির সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এআই ক্যামেরাগুলো সড়কের প্রতিটি যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলেই ক্যামেরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটিকে শনাক্ত করে ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করে রাখে। এরপর পুরো ঘটনার তথ্য-প্রমাণ ডিএমপির সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি প্রসিকিউশন প্রস্তুত করে। পরে ডিএমপি সদর দপ্তরের মনিটরিং কক্ষ থেকে যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরে নোটিশ পাঠানো হয়।”
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানান, এই প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ডাটাবেজও সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো গাড়ির নম্বর স্ক্যান করেই গাড়ির মালিকের পরিচয়, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা যাচ্ছে।
কোনো গাড়ির কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কিংবা রেজিস্ট্রেশন না থাকলেও এআই ক্যামেরা সেটি শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রস্তুত করতে পারবে।

বর্তমানে যেসব অপরাধ শনাক্ত করছে এআই ক্যামেরা
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাঁচ ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এআই ক্যামেরা সিস্টেমে সংযুক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে— ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, স্টপলাইন ও জেব্রা ক্রসিং দখল করা, বাম লেন বন্ধ করে রাখা, সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং লেন পরিবর্তন।
এ পর্যন্ত যত মামলা
এখন পর্যন্ত শাহবাগ, বাংলামোটর ও কারওয়ান বাজারসহ অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। চালু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ট্রাফিক আইন অমান্যের আড়াই হাজারের বেশি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলা করা হয়েছে তিন শতাধিক।