বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পরিচয় কেবল তারা কোথায় চাকরি করেছেন, কতটি লেখা লিখেছেন কিংবা কতটি বই প্রকাশ করেছেন, তার হিসাব দিয়ে শেষ করা যায় না। তাদের মূল্যায়ন করতে হয় তারা কোন সময়ে লিখেছেন, কী নিয়ে লিখেছেন, কীভাবে লিখেছেন এবং তাদের লেখার ভেতর দিয়ে সময়কে কতটা ধারণ করতে পেরেছেন, সেই বিচারে। বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন তেমনই একজন সাংবাদিক, সম্পাদক, কলামিস্ট ও লেখক। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ ও নাগরিক জীবনের নানা প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন। তার সাংবাদিকতা ছিল একই সঙ্গে পেশা, বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা।
১৯৫৪ সালের ৬ জুন মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার উথুলীর বাসাইল নামের এক নিভৃত গ্রামে তার জন্ম। আট ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পঞ্চগড় জেলার বোদা হাইস্কুলে মাধ্যমিক, দিনাজপুর সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ ও এমএ সম্পন্ন করেন। কিন্তু সাংবাদিকতার সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও আগে। ক্লাস এইটের ছাত্র থাকা অবস্থায় দৈনিক আজাদ-এর মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় তার হাতেখড়ি। এই তথ্যটি শুধু তার দীর্ঘ কর্মজীবনের সূচনা বোঝায় না, তার সাংবাদিকসত্ত্বার গভীরতাও বুঝিয়ে দেয়। সাংবাদিকতা তার কাছে পরবর্তী জীবনে বেছে নেওয়া একটি পেশা ছিল না; বরং কৈশোর থেকেই তা ছিল তার চিন্তা ও জীবনযাপনের অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মুখপত্র ‘জয়ধ্বনি’-র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে দৈনিক সংবাদ-এ সম্পাদনা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতায় যোগ দিয়ে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রতিবেদক ও সম্পাদকীয় সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এর মধ্যেই ১৯৮৪ সালে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ রাজনৈতিক কলাম লেখা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে অপরাজেয় বাংলা, দৈনিক রূপালী, পুনঃপ্রকাশিত যায়যায়দিন, চলতিপত্র, দৈনিক মাতৃভূমি, মৃদুভাষণ, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের উন্নয়ন পদক্ষেপ, আমাদের নতুন সময় এবং আজকের পত্রিকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তার কর্মজীবনের এই দীর্ঘ তালিকা আসলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তনেরও একটি খণ্ডচিত্র।
তার সাংবাদিকতার সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি আশির দশকের যায়যায়দিন পর্ব। সামরিক শাসনের সেই সময়ে সংবাদপত্রে সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনা করা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। সেই বাস্তবতায় তিনি তারিখ/তারিক ইব্রাহিমসহ একাধিক ছদ্মনামে লিখতেন। তার লেখায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, ক্ষমতার অন্তর্গত সমীকরণ, শাসকদের সিদ্ধান্ত এবং বিরোধী রাজনীতির নানা দিক উঠে আসত। ছদ্মনামটি পাঠকের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছিল। তবে শুধু রহস্য নয়, এসব লেখার মূল আকর্ষণ ছিল রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ, তথ্যের ব্যবহার এবং ব্যঙ্গের মাধ্যমে কঠিন বাস্তবতাকে পাঠযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা।
বিভুরঞ্জন সরকারের লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার ভাষা। তিনি খুব বেশি অলংকারের আশ্রয় নিতেন না। জটিল রাজনৈতিক প্রশ্নকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা তার ছিল। তার লেখায় যুক্তি ছিল, আবার পাঠযোগ্যতাও ছিল। রাজনীতির কঠিন বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যাতে সাধারণ পাঠকও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তার ব্যঙ্গ কখনো সরাসরি হাসানোর জন্য নয়; বরং রাজনৈতিক অসঙ্গতি ও সামাজিক ভণ্ডামিকে দৃশ্যমান করার জন্য ব্যবহৃত হতো। এই জায়গাতেই তার সাংবাদিকতা নিছক সংবাদ বিশ্লেষণকে ছাড়িয়ে কলাম সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।
তার লেখার বিষয়ও ছিল বিস্তৃত। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও লিখতেন। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘দাসত্বের আরেক শিকল, নয়া উপনিবেশবাদ’, ‘গণতন্ত্রের স্বপ্ন’, ‘বিশ্বাসহীনতার রাজনীতি’, ‘বন্যা ফারাক্কা ও বাংলাদেশের রাজনীতি’, ‘নন্দিত-নিন্দিত ম্যারাডোনা’, ‘দোষারোপের রাজনীতি’, ‘বৃত্তবন্দি রাজনীতি’, ‘নানা চিন্তা নানা মত’, ‘কার চেয়ে কে ভালো’, ‘দুর্নীতি, বিড়াল ও বিএনপি’, বঙ্গবন্ধু : ইতিহাসের নির্মাতা’সহ বহু বই। তার একটি কাব্যগ্রন্থও রয়েছে, ‘কখনো রোদ্দুর কখনো মেঘদল’।
তার লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধারাবাহিকতা। তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক লেখক ছিলেন না। আশির দশকের সামরিক শাসন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচন, দলীয় সংঘাত এবং নাগরিক জীবনের নানা সংকট তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন। সাপ্তাহিক সন্ধানী, খবরের কাগজ, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং বাংলা ট্রিবিউন, জাগো নিউজ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরসহ অনলাইন মাধ্যমে নিয়মিত লিখেছেন। তারিখ/তারিক ইব্রাহিম ছাড়াও আকবর হাবিব, ওমর ইমতিয়াজ, ইব্রাহিম বিন তারিখ/তারিক ও বিরস নামেও লিখেছেন।
বিভুরঞ্জন সরকার। ফাইল ছবি
বিভুরঞ্জন সরকারের পরিচয় শুধু সাংবাদিক বা কলামিস্টে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পঞ্চগড়ের বোদায় দৃষ্টিদান নামের সংগঠন ও ফরহাদ মেমোরিয়াল ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠন সিটিজেনস ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তিন দিনব্যাপী ‘উৎসবে পার্বণে’ সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। অর্থাৎ, সংবাদপত্রের পাতা থেকে বাস্তব সামাজিক জীবন পর্যন্ত তার আগ্রহের পরিধি ছিল বিস্তৃত।
তার সাংবাদিকতার মূল্যায়নে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সংবাদমাধ্যমকে কেবল খবর প্রকাশের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের সঙ্গে সংলাপের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার কলামে রাজনীতি ছিল, কিন্তু রাজনীতির বাইরে মানুষও ছিল। গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি নাগরিকের কথা ভেবেছেন, রাষ্ট্র নিয়ে লিখতে গিয়ে সমাজের কথা ভেবেছেন, ইতিহাস নিয়ে লিখতে গিয়ে বর্তমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুঁজেছেন। এ কারণেই তার লেখার অনেক প্রশ্ন নির্দিষ্ট সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পদক্ষেপ পুরস্কার ২০২০ এবং কবি কুসুমকুমারী দাশ সম্মাননা ২০২২ পেয়েছেন। অসংখ্য স্মারকগ্রন্থ ও বই সম্পাদনা করেছেন। কলকাতা বইমেলায় অংশ নিয়েছেন। বই পড়া, গান শোনা, কবিতা আবৃত্তি ও ভ্রমণের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তার জীবনযাত্রার এই দিকগুলো মনে করিয়ে দেয়, তিনি কেবল সংবাদ ও রাজনীতির মানুষ ছিলেন না; সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিও তার গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি বহু বই সম্পাদনা করেছেন।
কিন্তু এত দীর্ঘ, সক্রিয় ও সৃজনশীল জীবনের শেষ অধ্যায়টি বড়ই বেদনাদায়ক এবং রহস্যময়। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট সকালে তিনি বাড়ি থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হন। সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি না ফেরায় স্বজনেরা খোঁজ শুরু করেন। রাতে রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরদিন ২২ আগস্ট দুপুরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাই তার জীবন ও সাংবাদিকতার দীর্ঘ যাত্রার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে।
মৃত্যুর কারণ ও সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যত প্রশ্ন রয়েছে, তার সবগুলোর উত্তর আমাদের হাতে নেই। আর এই জায়গাটিই সবচেয়ে কষ্টের। একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন অন্যের জীবনের অন্ধকার, রাজনীতির অস্পষ্টতা, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং সমাজের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, তার নিজের চলে যাওয়াই যদি অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে যায়, তার চেয়ে বড় আক্ষেপ আর কী হতে পারে!
একজন সাংবাদিকের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রশ্ন করার ক্ষমতা। বিভুরঞ্জন সরকার অসংখ্য প্রশ্ন রেখে গেছেন। কিন্তু তার শেষ যাত্রা আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যেগুলোর উত্তর হয়তো সময়, তদন্ত এবং সত্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই একদিন স্পষ্ট হবে।
তাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা নয়। তার লেখাগুলো আবার পড়া, তার সাংবাদিকতার ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা এবং তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোকে জীবিত রাখা জরুরি। কারণ সাংবাদিকের মৃত্যুতে তার কলম থেমে যায়, কিন্তু তার প্রশ্ন থেমে যাওয়ার কথা নয়।
বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন তাই একই সঙ্গে সাংবাদিকতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস এবং আমাদের সময়ের একটি দলিল। কৈশোরে মফস্বল প্রতিবেদক থেকে শুরু করে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় কক্ষে, ছদ্মনামের আড়ালে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লেখা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত কলাম, বই, সম্পাদনা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড…তার পথচলা ছিল বহুমাত্রিক। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার লেখা রয়ে গেছে। তার বই রয়ে গেছে। তার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তার প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে।
একজন সাংবাদিকের প্রকৃত উত্তরাধিকার হয়তো তার পদবি নয়, তার লেখা নয়, এমনকি তার পুরস্কারও নয়। তার প্রকৃত উত্তরাধিকার হলো– তিনি পাঠককে কতটা ভাবতে বাধ্য করেছেন। সেই বিচারে বিভুরঞ্জন সরকারের উত্তরাধিকার এখনও জীবন্ত। আর তার রহস্যময় চলে যাওয়ার আক্ষেপটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সত্যের অনুসন্ধান শেষ হওয়ার কথা নয়।