জর্জ ইস্টম্যান বিশ্বাস করতেন ক্যামেরাকে পেন্সিলের মতো সহজ ও সহজলভ্য করা সম্ভব। এই বিশ্বাসকে বাস্তব রূপ দিতেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন কোডাক। তার সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী চিন্তা ক্যামেরাকে নিয়ে এসেছিল মানুষের দোর গোড়ায়। ফটোগ্রাফির ব্রাহ্মণ্যবাদকে ইস্টম্যান প্রায় একাই দূর করতে সফল হয়েছিলেন। এজন্যই ফটোগ্রাফির দীর্ঘ ইতিহাসে তার অবদান অবিস্মরণীয়।
জর্জ ইস্টম্যানের জন্ম ১৮৫৪ সালের ১২ জুলাই, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ওয়াটারভিল গ্রামে। জর্জ ওয়াশিংটন ইস্টম্যান ও মারিয়া কিলবোর্ন দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে জর্জ ইস্টম্যান সবার ছোট। বাবা যখন মারা যান, তখন তার বয়স মাত্র ৫ বছর। এই ঘটনায় পরিবারটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। আর্থিক সংকটে ১৪ বছর বয়সে ইস্টম্যানকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমে পড়তে হয়।
প্রথমে একটি বিমা কোম্পানিতে ম্যাসেঞ্জার হিসেবে যোগ দেন। সপ্তাহে বেতন মাত্র ৩ ডলার। পরে অন্য আরেকটি বিমা কোম্পানিতে যোগ দেন দপ্তর সহকারী হিসেবে। বেতন বেড়ে হয় ৫ ডলার। এই টাকাতেও পরিবারের ভরণপোষণ হচ্ছিল না। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে হিসাববিজ্ঞান পড়তেন, যাতে আরও ভালো চাকরি পাওয়া যায়। পরে ১৮৭৪ সালে তিনি রচেস্টার সেভিংস ব্যাংকে জুনিয়র কেরানি হিসেবে চাকরি পেয়ে যান, বেতন সপ্তাহে ১৫ ডলার।
ক্যামেরার সঙ্গে জর্জ ইস্টম্যানের সংযোগটা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে। তখন তার বয়স ২৪ বছর। সে সময় তিনি ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী সান্তো ডোমিঙ্গো ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তখন তার এক সহকর্মী তাকে ক্যামেরা সঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দেন, ভ্রমণ করবেন ক্যামেরা সঙ্গে থাকবে না–এ কেমন কথা! ইস্টম্যান তাই করলেন। ক্যামেরার নামে তাকে বিপুল পরিমাণে ক্যামেরা-সরঞ্জাম কিনতে হলো। সে সময় ক্যামেরা মানেই লটবহর। বড় ও ভারী ক্যামেরার সঙ্গে কিনেছিলেন ওজনদার ট্রাইপড, কাচের পাত, নানা রাসায়নিক দ্রব্য, কাচের পাত্র, বাক্স, পানির পাত্র, তাঁবুসহ অনেক কিছু।
অবশ্য এই মহাযজ্ঞের পরও ইস্টম্যান সান্তো ডোমিঙ্গো ভ্রমণ বাতিল করেন। তবে তার দুটি শিক্ষা হয়, ছবি তোলা আনন্দের কাজ, তবে ছবি তোলার পদ্ধতিটিকে জটিল করে রাখা হয়েছে। তিনি বাজারে একটি ঘাটতি বা গ্যাপ দেখতে পান, এই গ্যাপের সমাধানে তিনি কাজ করা শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ পত্রপত্রিকা থেকে জানতে পারেন কয়েকজন আলোকচিত্রী জেলাটিন দিয়ে আলোকসংবেদনশীল মিশ্রণ তৈরি করছে। এই মিশ্রণের প্রলেপ কাচের পাতে দিলে তা শুকিয়ে গেলেও আলোকসংবেদনশীল থাকত। সুতরাং চাইলে পরেও তাতে ছবি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। ফটোগ্রাফির এই ড্রাই প্লেট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ইস্টম্যান নিজেও জেলাটিন তৈরি করা শুরু করেন। দিনে অফিস, আর রাতে রান্নাঘরে বসে চলত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কোনো কোনো সময় অফিস থেকে ফিরেই কাপড় না বদলে কাজে বসে পড়তেন। অনেক রাতে ওই রান্নাঘরের মেঝেতেই কম্বল পেতে ঘুমাতেন। সকালে আবার ছুটে যেতে হতো ব্যাংকে।
টানা তিন বছর গবেষণার পর ইস্টম্যান সফলতার মুখ দেখেন। ১৮৮০ সালের দিকে তিনি ড্রাই প্লেট তৈরির একটি কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। আলোকচিত্রীদের কাছে এই ড্রাই প্লেট বিক্রি করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। বড় পরিসরে ড্রাই প্লেট তৈরির জন্য একটি যন্ত্রের পেটেন্টও তিনি নিয়ে নেন। একই বছরের এপ্রিল–রচেস্টারের স্টেট স্ট্রিটে দোকান খোলেন। ব্যবসার ভবিষ্যৎ ভালো মনে করে ভারী যন্ত্রপাতিও কিনেছিলেন। ব্যবসায়ী হেনরি এ স্ট্রংও সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে ইস্টম্যানের নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করলেন। ১৮৮১ সালের ১ জানুয়ারি যাত্রা করে ‘ইস্টম্যান ড্রাই প্লেট কোম্পানি’। সেই বছরের শেষের দিকে তিনি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে নিজের কোম্পানিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। ১৮৮৪ সালের কোম্পানির নাম বদলে হয় ‘ইস্টম্যান ড্রাই প্লেট অ্যান্ড ফিল্ম কোম্পানি’ এবং ১৮৮৯ সালে হয় ‘ইস্টম্যান কোম্পানি’। ‘কোডাক’ নামটি যুক্ত হয় ১৮৯২ সালে–‘ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি’।
মজার ব্যাপার হলো ‘কোডাক’ নামের কোনো অর্থ নেই। নামটি ইস্টম্যান নিজে তৈরি করে নিয়েছিলেন। ইংরেজি ‘কে’ বর্ণটি তার পছন্দের ছিল। তার কাছে, অক্ষরটি শক্তিশালী ও স্পষ্ট। তিনি চাইছিলেন তার কোম্পানির নামটি ‘কে’ দিয়ে শুরু হয়ে ‘কে’ দিয়েই শেষ হবে। এমন একটি শব্দ তৈরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষ চলে। শেষে বেছে নেওয়া হয় ‘কোডাক’ শব্দটি। আরেকটি প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, ইস্টম্যান নাকি তার গবেষকদের বলেছিলেন এমন একটি শব্দ তৈরি করতে, যার অনুবাদ কোনো ভাষাতেই সম্ভব নয়। উজ্জ্বল হলুদ রং হয়ে ওঠে কোডাকের পরিচয়। এই রংটিও নির্বাচন করেছিলেন ইস্টম্যান।
জর্জ ইস্টম্যানের ব্যবসায়িক নীতি ছিল চারটি–গ্রাহককে প্রাধান্য দেওয়া, কম খরচে বেশি উৎপাদন, সারা বিশ্বে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক প্রচার। তিনি মনে করতেন, একটি নীতির সঙ্গে অন্যটি সম্পর্কযুক্ত। ব্যাপক উৎপাদন তখনই অর্থবহ হয়, যখন পণ্যও ব্যাপকভাবে তার ক্রেতাদের হাতে পৌঁছায়। আবার এই পৌঁছে দিতে চাই যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা। তার বিশ্বাস ছিল, গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করাই উৎপাদকের সাফল্যের চাবিকাঠি। এমনও হয়েছে, তিনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়া কোডাকের ড্রাই প্লেট সংগ্রহ করে নতুন ড্রাই প্লেট ফেরত দিয়েছেন। এতে তার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতো। কিন্তু তিনি তার নীতিতে থাকতেন অটুট। তার কাছে কোডাক-এর সুনাম ছিল সবচেয়ে মূল্যবান।
ওই ক্ষতি থেকেও তিনি শিখেছেন, কাচের ড্রাই প্লেট ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক। তাই তিনি কাচের বিকল্প খোঁজা শুরু করেন। তিনি কাগজের ওপর আলোকসংবেদনশীল প্রলেপ দিয়ে সেটিকে গোলাকার ধারকের মধ্যে জড়িয়ে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। এভাবেই তিনি ১৮৮৩ সালে উদ্ভাবন করে ফেলেন রোল ফিল্ম! এই আবিষ্কার আলোকচিত্র জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে কাগজের ফিল্মের একটি সমস্যা ছিল। তখনকার কাগজ তো আজকের মতো মসৃণ ছিল না, কাগজে দানা ও ময়লা থাকত। সেগুলোর ছাপ ছবিতে দেখা দিত। ইস্টম্যান জেলাটিনের স্তর ব্যবহার করে সেই সমস্যারও সমাধান করে ফেলেন। ফিল্ম নিয়ে তার এই বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা আলোকচিত্রচর্চার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে দেয়।
১৮৮৮ সালে বাজারে আসে কোডাক-এর প্রথম ক্যামেরা। কোডাক ফিল্মের মাধ্যমে এই ক্যামেরা দিয়ে তোলা যেত ১০০টি ছবি। ফিল্মসহ ক্যামেরার দাম ২৫ ডলার। ক্যামেরাটি ছিল বহনযোগ্য, ছবি তোলাও ছিল ঝঞ্ঝাটমুক্ত। ছবি তোলা শেষে গ্রাহক ক্যামেরাটি পাঠিয়ে দিতেন রচেস্টারের কোডাক দপ্তরে। সেখানে ছবিগুলো প্রিন্ট এবং নতুন ফিল্ম লোড করা হতো। এজন্য গ্রাহকের আরও ১০ ডলার খরচ হতো। এভাবে ফটোগ্রাফি সাধারণ মানুষের হয়ে উঠতে থাকে, এই তো চেয়েছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা জর্জ ইস্টম্যান।
১৮৮৮ সালের কোডাক ক্যামেরা। ছবি: টেকনোগ্যালারি ডটকম
কোডাক তাদের প্রচারে ভীষণ গুরুত্ব দিত। ইস্টম্যান নিজে তা তদারকি করতেন। পণ্যের প্রচারে কী লেখা থাকবে তিনিই ঠিক করতেন। যেমন, ১৮৮৮ সালে যখন প্রথম কোডাক ক্যামেরা বাজারে এল, তখন কোডাক বলত, “আপনি বোতাম চাপবেন, বাকি কাজ আমাদের।” এই বাক্যটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা, প্রদর্শনী, যানবাহন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়ও দেখা যেতে শুরু করে কোডাকের বিজ্ঞাপন। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারেও ছিল কোডাক নামের জ্বলজ্বলে উপস্থিতি।
১৯৮০ সালের কোডাক ফিল্মের বাক্স। ছবি: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফটোগ্রাফার
কর্মীবান্ধব হিসেবেও ইস্টম্যানের সুনাম ছিল। তিনি মনে করতেন, শুধু মজুরি পরিশোধের মাধ্যমেই নিয়োগদাতার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তিনি কোডাকের বার্ষিক মুনাফার একটি অংশও কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। শুধু তাই নয়, ১৯১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের এক-তৃতীয়াংশ শেয়ার কর্মীদের লিখে দিয়েছিলেন, যার মূল্য তখনই ছিল এক কোটি ডলার। এ ছাড়া অবসর ভাতা, জীবনবিমা এবং কর্মক্ষমতা হারালে সহায়তার ব্যবস্থাও ছিল।
দানবীর হিসেবেও তিনি স্মরণীয়। আয়ের একটি বড় অংশ তিনি মানবকল্যাণে ব্যয় করতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান দিতেন। আজকের বিশ্বখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) তার দেওয়া অনুদানের পরিমাণ দুই কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, হ্যাম্পটন ও টাসকিজিতেও অনুদান দিতেন। রচেস্টারে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনি দাঁতের চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং লন্ডন, প্যারিস, রোম, ব্রাসেলস ও স্টকহোমে একই ধরনের চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন।
সংগীত বিদ্যালয়, নাট্যমঞ্চ, বাদ্যযন্ত্রদল প্রতিষ্ঠায়ও আজীবন পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। রচেস্টারে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই যে এত এত দান-অনুদান করছিলেন, তার সবই ছদ্মনামে! তিনি দাতা হিসেবে নিজের আসল নাম গোপন রাখতেন, ছদ্মনাম ছিল ‘মি. স্মিথ’।
কোডাক-এর জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন, ‘আপনি বোতাম চাপবেন, বাকি কাজ আমাদের’
এত কিছুর পরও জর্জ ইস্টম্যানকে আমরা মনে রেখেছি ক্যামেরার মানুষ হিসেবে। তাতেও এই মহান ব্যক্তিত্বকে পাঠ করতে আমাদের অসুবিধা হয় না। ফটোগ্রাফির দীর্ঘ ইতিহাসে তার এবং তার কোডাকের যে অবদান, তার তুলনা হয় না। আর এ জন্যই কোডাকের ইতিহাস মানেই ফটোগ্রাফির ইতিহাস, জর্জ ইস্টম্যানের জীবনী মানে ফটোগ্রাফির বিকাশের চমকপ্রদ কাহিনি।
কোডাকের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ইস্টম্যান ছিলেন কর্মবীর। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর কুড়ির দশকে তার মেরুদণ্ডের রোগ ধরা পড়ে। শরীরের নিচের অংশের কোষ শক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। কর্মমুখর জীবনযাপন করতে না পারার কষ্ট তাকে জেঁকে বসেছিল। ১৯৩২ সালের ১৪ মার্চ তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তবে মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও তিনি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে খোশমেজাজে কথা বলেছেন।
আলোচনার মাঝেই হঠাৎ তিনি বলেন, “তোমরা যাও, আমাকে একটি নোট লিখতে হবে।” নিজের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করার আগে তিনি লিখেছিলেন মাত্র একটি লাইন, “বন্ধুরা, আমার কাজ শেষ, আর বেঁচে থাকা কেন? জি. ই.।” পরদিন দ্য নিউইর্ক টাইমস ইস্টম্যানের মৃত্যুর খবরে লিখেছিল, “ইস্টম্যানের মৃত্যুর সংবাদ শুধু রচেস্টার শহরকেই নয়–পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম প্রান্তগুলোতেও পৌঁছে গিয়েছিল। দাতব্য কর্মকাণ্ডে তার ব্যয় করা ৭ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলার শুধু তার নিজ দেশেই কাজে আসেনি, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল।” জর্জ ইস্টম্যানের জীবন যেন এক মহাকাব্য। যে কাব্য রচনা তিনি নিজে শুরু করেছিলেন, নিজেই শেষ করেন।
তথ্যসূত্র: কোডাক ডটকম, ইস্টম্যান মিউজিয়াম, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ান