তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থায় এক বিপ্লব ঘটে গেছে। এফবিআইর পরিচালক কাশ প্যাটেল এমন এক বাস্তবমুখী পথ বেছে নিয়েছেন, যা পরাশক্তিগুলোর পুরোনো শত্রুতার হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে কাজের ফলাফলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। চীন ও রাশিয়ার সাথে সীমিত কিন্তু অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে এফবিআই এটি প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, বহুমাত্রিক বিশ্বের বিশ্বনেতারা তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে রেখেও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনে একসাথে কাজ করতে পারেন। বর্তমানের জটিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেবল ফাঁকা নীতিবাক্য বা আদর্শিক সংঘাতের বদলে নিজেদের মূল স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবভিত্তিক এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত কার্যকর এক দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।
বেইজিংয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। কিন্তু এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল সেই বরফ গলাতে সক্ষম হয়েছেন। ২০১৫ সাল বা পরবর্তী মেয়াদের স্থবিরতা ভেঙে তিনি গত নভেম্বর ২০২৫-এ প্রথম এফবিআই পরিচালক হিসেবে চীন সফর করেন এবং চীনের জননিরাপত্তা বিষয়ক উপমন্ত্রী শু দাতোং-এর সাথে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হন। সেই সফল সূচনার ধারাবাহিকতায় তিনি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে পুনরায় চীনে যান এবং দেশটির স্টেট কাউন্সিলর তথা জননিরাপত্তা মন্ত্রী ওয়াং জিয়াওহং-এর সাথে সরাসরি আলোচনায় বসেন। চীনা সরকারের পক্ষ থেকে এই সংলাপকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
কাশ প্যাটেলের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের কারণেই বেইজিংয়ের সাথে সরাসরি এই যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে। ট্রাম্পের মে ২০২৫-এর চীন সফর এবং পরবর্তীতে ফেন্টানিল বা ক্ষতিকর মাদকের রাসায়নিক রোধে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যে সমঝোতা হয়েছিল, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই এই সম্পর্কের সূচনা। উভয় দেশই এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে কেবল ক্ষণস্থায়ী বার্তা হিসেবে না রেখে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছে।
বর্তমানে এফবিআই ও চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে চারটি বিশেষায়িত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো মূলত সাইবার অপরাধ ও জালিয়াতি, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংস অপরাধ, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পলাতক অপরাধীদের ধরার জন্য গঠিত স্পেশাল টাস্কফোর্স হিসেবে কাজ করছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে চীনা কর্মকর্তারা প্রতি মাসে রোটেশন বা পর্যায়ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সফর করছেন এবং একইভাবে এফবিআই কর্মীরাও নিয়মিত চীন সফর করছেন। দুই দেশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, বর্তমানে তাদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিন দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা বিগত বহু বছরে কল্পনাও করা যেত না।
এই দৈনন্দিন যৌথ যোগাযোগের ফলে ইতিমধ্যে অত্যন্ত চমকপ্রদ ও বাস্তবমুখী সাফল্য আসতে শুরু করেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো ‘অপারেশন স্যান্ড ডলার’। এই সুনির্দিষ্ট অভিযানে মার্কিন এফবিআই, চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এবং দুবাই পুলিশ যৌথভাবে একটি বিশাল সাইবার-স্ক্যাম কেন্দ্রের বিরুদ্ধে হামলা চালায়। আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই যৌথ অভিযানের ফলে প্রায় ৩০০ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। আনুমানিক ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং মানবপাচারের শিকার হওয়া হাজার হাজার দাস শ্রমিককে উদ্ধার করে মুক্তি দেওয়া হয়। আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ চক্রগুলোকে নিজেদের একক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে একটি সাধারণ বা যৌথ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার ফলেই এমন সুনির্দিষ্ট সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।
কাশ প্যাটেল তার গ্রহণ করা এই নজিরবিহীন কৌশলগত দর্শনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, চীনকে ঘিরে বিদ্যমান বৈরিতা ও বহুমুখী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যখন সবাই বলছিল চীনকে বিশ্বাস করা বা তাদের সাথে কাজ করা সম্ভব নয়, তখন এফবিআই এটি করে দেখিয়েছে। প্যাটেলের মতে, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো দেশের সাথেই যৌথভাবে কাজ করা সম্ভব। তবে এই অংশীদারত্বকে বিশ্ব রাজনীতির অন্যান্য ইস্যু থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। এই সহযোগিতা কেবল নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক বা আঞ্চলিক কৌশলগত বিরোধ মিটিয়ে ফেলার কোনো মিথ্যা দাবি করা হচ্ছে না। কাজের এই সুস্পষ্ট সীমারেখা বা সুনির্দিষ্ট পরিধির কারণেই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও এই যৌথ কাজ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
চীন সফলভাবে বরফ গলানোর পর একই বাস্তবসম্মত নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে রাশিয়ার ক্ষেত্রেও। এফবিআই প্রধান কাশ প্যাটেল ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গ সফরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে স্বাগতিক হিসেবে কাজ করবে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি)। উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালে রবার্ট মুলারের সফরের পর আর কোনো এফবিআই পরিচালক রাশিয়া সফর করেননি। তবে প্যাটেলের এই প্রস্তাবিত সফর হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং সহিংস অপরাধী চক্র দমনে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে গোপনে চলা সফল সহযোগিতারই এক দৃশ্যমান রূপ।
রাশিয়ার সাথে এফবিআইর এই সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টাটি মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মস্কোর সাথে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর সামগ্রিক উদ্যোগেরই একটি অংশ। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জারার্ড কুশনার একাধিকবার রাশিয়া সফর করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠক করেছেন। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ প্রকাশ্যে চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে ওঠা এই উদীয়মান গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী যৌথ নিরাপত্তাকে স্বাগত জানিয়েছেন, যা নির্দেশ করে যে মস্কোও যুক্তরাষ্ট্রের এই বাস্তবমুখী কূটনৈতিক চ্যানেলে সমান গুরুত্ব খুঁজে পাচ্ছে।
প্যাটেলের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের নীতি থেকেও আলাদা কোনো পদক্ষেপ নয়। পেন্টাগনের নীতি নির্ধারণী প্রধান এলব্রিজ কোলবি, যাকে এতদিন চীনের প্রতি কঠোর মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো, তিনিও এখন চীন সফর করতে এবং দুই দেশের পেশাদার সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় জোরদার করতে স্পষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কৌশলগত প্রতিযোগিতায় কঠোর অবস্থান রাখা একজন নীতি নির্ধারকের পক্ষে চীন সফর ও সামরিক যোগাযোগের আহ্বান জানানো একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। এতে স্পষ্ট হয় যে, তীব্র দ্বিপক্ষীয় বিরোধ সত্ত্বেও কৌশলগত ঝুঁকি কমানোর জন্য যৌথ যোগাযোগের একটি মাধ্যম সবসময় খোলা রাখা জরুরি।
একইভাবে মার্কিন ওয়ার সেক্রেটারি বা যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ বেইজিংয়ের সাথে একটি বিশ্বস্ত সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর পক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন। হেগসেথ বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ঝুলে থাকা সামরিক হট লাইনগুলো এবং সংকট ব্যবস্থাপনা নীতি সচল করার তাগিদ দিয়েছেন, যাতে সমুদ্র বা আকাশে মুখোমুখি সামরিক টহল চলাকালীন কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বড় যুদ্ধে রূপ নিতে না পারে। মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলোকে দুর্বলতা বা ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এগুলোকে একটি দায়িত্বশীল পরাশক্তি হিসেবে নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা খাতের এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, আমেরিকার প্রধান প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সীমিত কিন্তু কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নীতিকে গ্রহণ করে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি আনুষ্ঠানিক বন্দী বা অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি ছাড়াই ফেন্টানিল রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ও পলাতক অপরাধী ফেরত পাঠাতে একসাথে কাজ করছে। আবার রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও রাশিয়ার সাথে মার্কিন গোয়েন্দাদের সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিষয়ক গোপন কাজ সচল রয়েছে। এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি একটাই: নিজেদের সাধারণ স্বার্থগুলো চিহ্নিত করা, সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত কাজের নিয়ম তৈরি করা এবং নীতিবাক্যের চেয়ে কাজের ফলাফল দিয়ে সফলতা পরিমাপ করা।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলের গৃহীত এই কৌশলগত পথ একটি বহুমাত্রিক বিশ্বে কীভাবে পরাশক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে সহাবস্থান বজায় রাখতে পারে, তার একটি আদর্শ মডেল তুলে ধরে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অন্ধ ও অতিরিক্ত আবেগভিত্তিক মিত্রতাকে যেমন বর্জন করে, তেমনই অহেতুক ও একঘেয়ে একাকীত্ববাদকেও অস্বীকার করে। এটি একক কোনো পরাশক্তির প্রভাবমুক্ত বর্তমান বিশ্বে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অ-ঐতিহ্যবাহী অংশীদারদের সাথে কাজের সক্ষমতা রক্ষা করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি বড় কৌশলগত সম্পদ।
অবশ্যই চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে ওঠা এই উদীয়মান আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইরান, তাইওয়ান, ইউক্রেন কিংবা প্রযুক্তিগত তীব্র প্রতিযোগিতার মতো জটিল ভূরাজনৈতিক বিরোধগুলোকে পুরোপুরি মিটিয়ে দেবে না। আর সে রকম কোনো প্রয়োজনও নেই। এই উদ্যোগের মূল্যই হলো এটি প্রমাণ করা যে, দুটি চরম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশও চাইলে তাদের সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা ও জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে একসাথে কাজ করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার বদলে আরও বেশি শক্তিশালী হয়। এই জাতীয় কার্যকর সহযোগিতার পথ খুলে দিয়ে কাশ প্যাটেল মার্কিন নীতি নির্ধারকদের সামনে একটি নতুন ও যুগোপযোগী কূটনৈতিক অস্ত্র তুলে দিয়েছেন, যা বর্তমান অস্থির ও পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লাদিস্লাভ জেমানেক: চায়না-সিইই ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট রিসার্চ ফেলো এবং ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের বিশেষজ্ঞ।
(এই লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে প্রকাশিত)