সুদীপ্ত সালাম

একটি দেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একই সঙ্গে বাবা ও মেয়ে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন এমন ঘটনা ভীষণ বিরল। বাবা ছিলেন পথিকৃৎ আলোকচিত্রী, আর কন্যা হলেন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী। আবার এই দুজনের মধ্যকার যে নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক, তাও অনুধাবন করার মতো। বলছি মেক্সিকান আলোকচিত্রী কার্ল ভিলহেল্ম কাহলো ও তার মেয়ে চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোর কথা।
চিত্রশিল্পী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেলেও ক্যামেরা ছিল ফ্রিদার কাছে খেলনার মতো। চোখ খুলেই দেখেছেন বাল্বের ঝাঁঝাল আলো, ক্যামেরা নামের ইয়া বড় জাদুর বাক্স ও ঘরের একপাশে স্টুডিও–যেন এক টুকরো কল্পনার জগৎ। তার বাবা কার্ল ভিলহেল্ম কাহলো (১৮৭১-১৯৪১) মেক্সিকান ফটোগ্রাফির ইতিহাসে কিংবদন্তিতুল্য। গোটা ফটোগ্রাফি দুনিয়ায় তিনি গিয়ারমো কাহলো নামে পরিচিত। ছবি আঁকা শেখার আগে ফ্রিদার হাতেখড়ি ক্যামেরা দিয়ে। বাবাই তাকে ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আবার বাবাই তাকে ক্যামেরার পেছন থেকে সামনে আনেন। বাবার ক্যামেরার গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট হয়ে ওঠেন ফ্রিদা।

ফ্রিদা ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে বেশি ক্যামেরায় ধরাপড়া নারীদের একজন। তার গাম্ভীর্য, আবেদনময়তা, সাজ, তার ব্যতিক্রমধর্মী পোশাক–ছবিগুলোকে তার সময় থেকে এগিয়ে রেখেছে। এখনো ছবিগুলো অনুকরণীয়। গিয়ারমো কাহলো ছাড়াও ফ্রিদার ছবি অনেকেই তুলেছেন। তাদের মধ্যে আছেন নিকোলাস ম্যুরে, ম্যানুয়েল আলভারেজ ব্রাভো, লোলা ম্যানুয়েল আলভারেজ ব্রাভো, জিজেল ফ্রোয়েন্ড, জুলিয়েন লেভি, টিনা মুদাতি, ইসামু নোগুচিসহ আরো অনেকে। কিন্তু বাবার ক্যামেরার সামনে বারবার দাঁড়াতে গিয়েই তার আলোকচিত্রের শক্তি ও প্রভাব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি হয়।
১৯২৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফ্রিদা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তখন প্রাণ বেঁচে গেলেও শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়। হারান সন্তানধারণ ক্ষমতাও। দুর্ঘটনার পর বাবার ক্যামেরার সামনে আসা নিয়ে ফ্রিদার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, তিনি বলেছিলেন, “দুর্ঘটনার পর বাবা যখন আমার ছবি তুলেছিল, তখন বুঝতে পেরেছিলাম–আমার চোখে যন্ত্রণার এক রণক্ষেত্র ফুটে উঠেছে। তখন থেকেই আমি ক্যামেরার লেন্সের দিকে সোজাসুজি তাকাতে শুরু করি–হাসি ও দ্বিধা ছাড়াই; শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যে একজন হার না মানা যোদ্ধা, তাই প্রমাণ করার শপথ নিয়েছিলাম।”
ক্যামেরা ও ক্যানভাসের ফ্রিদাকে বুঝতে এই উক্তিটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরায় তোলা তার ছবিগুলো–প্রধানত বাবা গিয়ারমো কাহলোর তোলা ছবিগুলো (ছোটবেলার ছবিগুলো বাদে) এবং ফ্রিদার সেল্ফ-পোর্ট্রেটগুলোতে সত্য-সুন্দর ফ্রিদাকে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তার দৃঢ়তা ও একাকীত্ব ছবিগুলোতে স্পষ্ট। সেল্ফ-পোর্ট্রেট নিয়ে ফ্রিদা বলেছিলেন, “আমি সেল্ফ-পোর্ট্রেট আঁকি, কারণ আমি প্রায়ই একা…আর নিজেকে সবচেয়ে ভালো চিনি।” অন্য কারো চেনায় ভুল থাকতে পারে, শিল্পী যখন নিজেকে চেনেন এবং সেই চেনা ছবিকে ক্যানভাসে তুলে আনেন, তখন তা সত্য ও সুন্দর না হয়ে পারে না। বাবা গিয়ারমোও আদরের কন্যাকে চিনতে ভুল করেননি। তিনি তার ক্যামেরায় লড়াকু ও বেদনার্ত ফ্রিদাকে যথাযথভাবে ধরতে পেরেছিলেন।

সড়ক দুর্ঘটনার পর ফ্রিদার জীবন বদলে যায়। পুরোদমে ছবি আঁকা শুরু করেন। যদিও “সরাসরি সে দুর্ঘটনার কোনো ছবি ফ্রিদা কখনো আঁকেননি, বরং রঙের উজ্জ্বলতা ও পুষ্পের বর্ণিল ঔজ্জ্বল্যে ঢেকে রেখেছেন তাকে। এতে বেদনার সুর মিলেছে বটে, কিন্তু তার আভা মেলায়নি।” এই বেদনার সুর বাবার তোলা ছবিগুলোতেও ধরা পড়েছে। ফ্রিদার ভাষায়, ছবিগুলোতে হাসি নেই, দ্বিধা-দ্বন্দ্বও নেই। তবে দৃঢ়তা আছে। নিজের এই প্রতিকৃতি তিনি যে সচেতনভাবেই তৈরি করেছেন, তা আগে উল্লেখ করা তার উক্তি থেকেই স্পষ্ট। এই পাথরের মতো ঠান্ডা পোজ শুধু যে তার পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফগুলোতে দেখা যায়, তা নয়। গিয়ারমোর তোলা ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির একটি গ্রুপ ছবিতেও আমরা ফ্রিদার একই অবতার দেখতে পাই। ক্যামেরায় যে লুক তিনি দিচ্ছিলেন, সেল্ফ-পোর্ট্রেটগুলোতে সেই একই লুক আমরা দেখি, সঙ্গে প্রতীক হিসেবে যুক্ত করছিলেন নানা অনুষঙ্গ। যেন আলোকচিত্রের সীমাবদ্ধতাকে ‘মনের মাধুরী’ দিয়ে পরিপূর্ণ করে নিয়েছিলেন।
ফ্রিদার পুরো জীবন কেটেছে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ও বঞ্চনায়–১৯১৩ সালে পোলিওর কারণে ডান পা বিকৃত হয়ে যায়, ১৯২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা, ১৯৩০ সালে গর্ভপাত, ১৯৩২ সালে ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের মৃত্যু, জান দিয়ে যাকে ভালোবাসতেন সেই দিয়েগো রিভেরোর প্রতারণা ও শারীরিক নির্যাতন, ১৯৩৯-এ বিবাহবিচ্ছেদ, ১৯৫৩ সালে ডান পা কেটে ফেলা…।
ফ্রিদার বাবা গিয়ারমোর মৃত্যু হয় ১৯৪১ সালে। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি তার প্রিয় মেয়ের পাশে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। ১৯৩২ সালে ফ্রিদা যখন তার স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তখন চিঠির মাধ্যমে তিনি মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন। সেসময় ফ্রিদাকে লেখা গিয়ারমোর কয়েকটি চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরলে আমরা বাবা ও মেয়ের সম্পর্কটা কেমন ছিল, তা বুঝতে পারব।

১৯৩৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি লিখেছেন, “মানুষের প্রতি আমার আগ্রহ কম, আমি মেলামেশাও কম করি, তোমার যদি মনে হয় এই প্রবণতা তুমি আমার কাছ থেকে পেয়েছ–তাহলে তোমার ধারণা হয়তো সঠিক। কিন্তু আমি মন থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, তাতে তুমি অনেক কিছু পেয়েছ। তোমার তথাকথিত বন্ধু থাকবে না, যারা প্রায়ই প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তাদের দূরে রাখাই ভালো। তবে তোমার শত্রুও থাকবে না। এই দুটির মধ্যে কোনটি বেশি মূল্যবান, আমি সত্যিই জানি না।...মানুষের সঙ্গে অযথা জড়িয়ে না পড়াই সবচেয়ে ভালো। যদিও কখনো কখনো জড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর তখন ভোগান্তি পোহাতে হয় আর্থিকভাবে, নয়তো মানসিকভাবে।”
১৯৩২ সালের ৮ আগস্ট লিখেছিলেন, “গত রাতে জানতে পারলাম, তোমার স্বামীর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি আর মেক্সিকোতে ফিরতে পারবে না। এই সংবাদে আমি একই সঙ্গে খুশি ও ব্যথিত। স্বামীর সঙ্গেই আছ বলে খুশি। আর ব্যথিত, কারণ আমার ফ্রিদুচাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে দীর্ঘ সময় আমাকে অপেক্ষা করতে হবে।”
আর্ট নিয়েও কথা হতো এই দুই ধীমান দৃশ্যশিল্পীর মধ্যে। ১৯৩৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাবা মেয়েকে বলছেন, “এখন আবার যখন শিল্পকলা চর্চায় ফিরতে চাই, তখন নিজের গালে চড় দিতে ইচ্ছে করে। কারণ, তুমি তো জানো–রং, তুলি ইত্যাদি হাতে নিয়ে কোনো ছবি হুবহু নকল করা এক ব্যাপার, আর নিজের কল্পনা দিয়ে একটি ছবি সৃষ্টি করার প্রতিভা থাকা এবং সেই ছবিটিকে মাথা থেকে হাতে, হাত থেকে তুলি হয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা একেবারে ভিন্ন ব্যাপার।…আমি ভীষণ নির্বোধ, এজন্যই আমার মেজাজ বিগড়ে থাকে, গভীর বিষণ্নতায় ভুগি।”
ফ্রিদার কাছেও তার বাবা ছিলেন মহীরুহ, আশ্রয়স্থল। ১৯৫১ সালে তিনি বাবার একটি পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন, সেই পোর্ট্রেটের নিচে তুলিতে লিখেছিলেন, “আমি আমার বাবা, ভিলহেল্ম কাহলোর প্রতিকৃতি এঁকেছি। তিনি ছিলেন হাঙ্গেরীয়-জার্মান বংশোদ্ভূত, পেশায় একজন শিল্পী ও আলোচিত্রী। তিনি ছিলেন উদার প্রকৃতির, প্রখর বুদ্ধিমান ও বিনয়ী। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী। টানা ৬০ বছর মৃগী রোগে ভুগেছেন; কিন্তু কখনো থমকে যাননি। শুধু তাই নয়, তিনি হিটলারের বিরুদ্ধেও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়–তার কন্যা, ফ্রিদা।”
ফ্রিদার বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে হয়তো গিয়ারমোর ক্যামেরা খুব বেশি কাজে আসেনি। কিন্তু ফ্রিদার ফ্রিদা হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে, বাবা গিয়ারমোর অব্যাহত ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা ও সমর্থন।
তথ্যসূত্র:

একটি দেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একই সঙ্গে বাবা ও মেয়ে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন এমন ঘটনা ভীষণ বিরল। বাবা ছিলেন পথিকৃৎ আলোকচিত্রী, আর কন্যা হলেন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী। আবার এই দুজনের মধ্যকার যে নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক, তাও অনুধাবন করার মতো। বলছি মেক্সিকান আলোকচিত্রী কার্ল ভিলহেল্ম কাহলো ও তার মেয়ে চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোর কথা।
চিত্রশিল্পী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেলেও ক্যামেরা ছিল ফ্রিদার কাছে খেলনার মতো। চোখ খুলেই দেখেছেন বাল্বের ঝাঁঝাল আলো, ক্যামেরা নামের ইয়া বড় জাদুর বাক্স ও ঘরের একপাশে স্টুডিও–যেন এক টুকরো কল্পনার জগৎ। তার বাবা কার্ল ভিলহেল্ম কাহলো (১৮৭১-১৯৪১) মেক্সিকান ফটোগ্রাফির ইতিহাসে কিংবদন্তিতুল্য। গোটা ফটোগ্রাফি দুনিয়ায় তিনি গিয়ারমো কাহলো নামে পরিচিত। ছবি আঁকা শেখার আগে ফ্রিদার হাতেখড়ি ক্যামেরা দিয়ে। বাবাই তাকে ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আবার বাবাই তাকে ক্যামেরার পেছন থেকে সামনে আনেন। বাবার ক্যামেরার গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট হয়ে ওঠেন ফ্রিদা।

ফ্রিদা ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে বেশি ক্যামেরায় ধরাপড়া নারীদের একজন। তার গাম্ভীর্য, আবেদনময়তা, সাজ, তার ব্যতিক্রমধর্মী পোশাক–ছবিগুলোকে তার সময় থেকে এগিয়ে রেখেছে। এখনো ছবিগুলো অনুকরণীয়। গিয়ারমো কাহলো ছাড়াও ফ্রিদার ছবি অনেকেই তুলেছেন। তাদের মধ্যে আছেন নিকোলাস ম্যুরে, ম্যানুয়েল আলভারেজ ব্রাভো, লোলা ম্যানুয়েল আলভারেজ ব্রাভো, জিজেল ফ্রোয়েন্ড, জুলিয়েন লেভি, টিনা মুদাতি, ইসামু নোগুচিসহ আরো অনেকে। কিন্তু বাবার ক্যামেরার সামনে বারবার দাঁড়াতে গিয়েই তার আলোকচিত্রের শক্তি ও প্রভাব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি হয়।
১৯২৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফ্রিদা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তখন প্রাণ বেঁচে গেলেও শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়। হারান সন্তানধারণ ক্ষমতাও। দুর্ঘটনার পর বাবার ক্যামেরার সামনে আসা নিয়ে ফ্রিদার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, তিনি বলেছিলেন, “দুর্ঘটনার পর বাবা যখন আমার ছবি তুলেছিল, তখন বুঝতে পেরেছিলাম–আমার চোখে যন্ত্রণার এক রণক্ষেত্র ফুটে উঠেছে। তখন থেকেই আমি ক্যামেরার লেন্সের দিকে সোজাসুজি তাকাতে শুরু করি–হাসি ও দ্বিধা ছাড়াই; শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যে একজন হার না মানা যোদ্ধা, তাই প্রমাণ করার শপথ নিয়েছিলাম।”
ক্যামেরা ও ক্যানভাসের ফ্রিদাকে বুঝতে এই উক্তিটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরায় তোলা তার ছবিগুলো–প্রধানত বাবা গিয়ারমো কাহলোর তোলা ছবিগুলো (ছোটবেলার ছবিগুলো বাদে) এবং ফ্রিদার সেল্ফ-পোর্ট্রেটগুলোতে সত্য-সুন্দর ফ্রিদাকে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তার দৃঢ়তা ও একাকীত্ব ছবিগুলোতে স্পষ্ট। সেল্ফ-পোর্ট্রেট নিয়ে ফ্রিদা বলেছিলেন, “আমি সেল্ফ-পোর্ট্রেট আঁকি, কারণ আমি প্রায়ই একা…আর নিজেকে সবচেয়ে ভালো চিনি।” অন্য কারো চেনায় ভুল থাকতে পারে, শিল্পী যখন নিজেকে চেনেন এবং সেই চেনা ছবিকে ক্যানভাসে তুলে আনেন, তখন তা সত্য ও সুন্দর না হয়ে পারে না। বাবা গিয়ারমোও আদরের কন্যাকে চিনতে ভুল করেননি। তিনি তার ক্যামেরায় লড়াকু ও বেদনার্ত ফ্রিদাকে যথাযথভাবে ধরতে পেরেছিলেন।

সড়ক দুর্ঘটনার পর ফ্রিদার জীবন বদলে যায়। পুরোদমে ছবি আঁকা শুরু করেন। যদিও “সরাসরি সে দুর্ঘটনার কোনো ছবি ফ্রিদা কখনো আঁকেননি, বরং রঙের উজ্জ্বলতা ও পুষ্পের বর্ণিল ঔজ্জ্বল্যে ঢেকে রেখেছেন তাকে। এতে বেদনার সুর মিলেছে বটে, কিন্তু তার আভা মেলায়নি।” এই বেদনার সুর বাবার তোলা ছবিগুলোতেও ধরা পড়েছে। ফ্রিদার ভাষায়, ছবিগুলোতে হাসি নেই, দ্বিধা-দ্বন্দ্বও নেই। তবে দৃঢ়তা আছে। নিজের এই প্রতিকৃতি তিনি যে সচেতনভাবেই তৈরি করেছেন, তা আগে উল্লেখ করা তার উক্তি থেকেই স্পষ্ট। এই পাথরের মতো ঠান্ডা পোজ শুধু যে তার পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফগুলোতে দেখা যায়, তা নয়। গিয়ারমোর তোলা ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির একটি গ্রুপ ছবিতেও আমরা ফ্রিদার একই অবতার দেখতে পাই। ক্যামেরায় যে লুক তিনি দিচ্ছিলেন, সেল্ফ-পোর্ট্রেটগুলোতে সেই একই লুক আমরা দেখি, সঙ্গে প্রতীক হিসেবে যুক্ত করছিলেন নানা অনুষঙ্গ। যেন আলোকচিত্রের সীমাবদ্ধতাকে ‘মনের মাধুরী’ দিয়ে পরিপূর্ণ করে নিয়েছিলেন।
ফ্রিদার পুরো জীবন কেটেছে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ও বঞ্চনায়–১৯১৩ সালে পোলিওর কারণে ডান পা বিকৃত হয়ে যায়, ১৯২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা, ১৯৩০ সালে গর্ভপাত, ১৯৩২ সালে ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের মৃত্যু, জান দিয়ে যাকে ভালোবাসতেন সেই দিয়েগো রিভেরোর প্রতারণা ও শারীরিক নির্যাতন, ১৯৩৯-এ বিবাহবিচ্ছেদ, ১৯৫৩ সালে ডান পা কেটে ফেলা…।
ফ্রিদার বাবা গিয়ারমোর মৃত্যু হয় ১৯৪১ সালে। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি তার প্রিয় মেয়ের পাশে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। ১৯৩২ সালে ফ্রিদা যখন তার স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তখন চিঠির মাধ্যমে তিনি মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন। সেসময় ফ্রিদাকে লেখা গিয়ারমোর কয়েকটি চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরলে আমরা বাবা ও মেয়ের সম্পর্কটা কেমন ছিল, তা বুঝতে পারব।

১৯৩৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি লিখেছেন, “মানুষের প্রতি আমার আগ্রহ কম, আমি মেলামেশাও কম করি, তোমার যদি মনে হয় এই প্রবণতা তুমি আমার কাছ থেকে পেয়েছ–তাহলে তোমার ধারণা হয়তো সঠিক। কিন্তু আমি মন থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, তাতে তুমি অনেক কিছু পেয়েছ। তোমার তথাকথিত বন্ধু থাকবে না, যারা প্রায়ই প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তাদের দূরে রাখাই ভালো। তবে তোমার শত্রুও থাকবে না। এই দুটির মধ্যে কোনটি বেশি মূল্যবান, আমি সত্যিই জানি না।...মানুষের সঙ্গে অযথা জড়িয়ে না পড়াই সবচেয়ে ভালো। যদিও কখনো কখনো জড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর তখন ভোগান্তি পোহাতে হয় আর্থিকভাবে, নয়তো মানসিকভাবে।”
১৯৩২ সালের ৮ আগস্ট লিখেছিলেন, “গত রাতে জানতে পারলাম, তোমার স্বামীর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি আর মেক্সিকোতে ফিরতে পারবে না। এই সংবাদে আমি একই সঙ্গে খুশি ও ব্যথিত। স্বামীর সঙ্গেই আছ বলে খুশি। আর ব্যথিত, কারণ আমার ফ্রিদুচাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে দীর্ঘ সময় আমাকে অপেক্ষা করতে হবে।”
আর্ট নিয়েও কথা হতো এই দুই ধীমান দৃশ্যশিল্পীর মধ্যে। ১৯৩৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাবা মেয়েকে বলছেন, “এখন আবার যখন শিল্পকলা চর্চায় ফিরতে চাই, তখন নিজের গালে চড় দিতে ইচ্ছে করে। কারণ, তুমি তো জানো–রং, তুলি ইত্যাদি হাতে নিয়ে কোনো ছবি হুবহু নকল করা এক ব্যাপার, আর নিজের কল্পনা দিয়ে একটি ছবি সৃষ্টি করার প্রতিভা থাকা এবং সেই ছবিটিকে মাথা থেকে হাতে, হাত থেকে তুলি হয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা একেবারে ভিন্ন ব্যাপার।…আমি ভীষণ নির্বোধ, এজন্যই আমার মেজাজ বিগড়ে থাকে, গভীর বিষণ্নতায় ভুগি।”
ফ্রিদার কাছেও তার বাবা ছিলেন মহীরুহ, আশ্রয়স্থল। ১৯৫১ সালে তিনি বাবার একটি পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন, সেই পোর্ট্রেটের নিচে তুলিতে লিখেছিলেন, “আমি আমার বাবা, ভিলহেল্ম কাহলোর প্রতিকৃতি এঁকেছি। তিনি ছিলেন হাঙ্গেরীয়-জার্মান বংশোদ্ভূত, পেশায় একজন শিল্পী ও আলোচিত্রী। তিনি ছিলেন উদার প্রকৃতির, প্রখর বুদ্ধিমান ও বিনয়ী। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী। টানা ৬০ বছর মৃগী রোগে ভুগেছেন; কিন্তু কখনো থমকে যাননি। শুধু তাই নয়, তিনি হিটলারের বিরুদ্ধেও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়–তার কন্যা, ফ্রিদা।”
ফ্রিদার বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে হয়তো গিয়ারমোর ক্যামেরা খুব বেশি কাজে আসেনি। কিন্তু ফ্রিদার ফ্রিদা হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে, বাবা গিয়ারমোর অব্যাহত ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা ও সমর্থন।
তথ্যসূত্র:

জাতীয় সংসদের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যকে মোটেই ভালোভাবে নেননি জামায়াতের নেতারা।

তারা পরীক্ষা দেয়নি বলে আমরা অবাক। বরং অবাক হওয়া উচিত, এত বছর ধরে একই নাটক দেখে, একই প্রতিশ্রুতি শুনে, একই প্রশ্ন মুখস্থ করে, একই লাইনে দাঁড়িয়ে, একই হতাশার গল্প শুনেও এত মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, এইবার হয়তো অলৌকিক কিছু ঘটবে! বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা আর নদী নয়, এটা মরীচিকা।