ক্ষমা চাওয়া না চাওয়া বিতর্ক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জামায়াতপ্রীতি
সোহরাব হাসান
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৫২
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যকে মোটেই ভালোভাবে নেননি জামায়াতের নেতারা।
মির্জা ফখরুল বাজেট বক্তৃতা দিলেন ২৮ জুন। ৩০ জুন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, “যে ভাষায় বাইরে ও পার্লামেন্টে আপনারা কথা বলেন, প্রশ্ন করেন, তাহলে আমাদেরও তো প্রশ্ন আছে। সেই জবাবটা তো বিএনপিকে দিতে হবে।” এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাহ আজিজুর রহমানকে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আরও ১৪-১৫ জনকে মন্ত্রী করার জন্য আগে বিএনপির ক্ষমা চাওয়া উচিত।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও যোগ করেন, “তারা (বিএনপি) বলে জামায়াতের ওপরে ভূত চেপেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সরকার আর সরকারি দলের ওপর ভূত চেপেছে। বিএনপি মহাসচিবের মাথায়ও ভূত চাপে। মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়কে সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেন। বিভ্রান্তির মাধ্যমে দেশকে আবার ফ্যাসিবাদের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি–এটাই বিএনপির অবস্থান।”
জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বিএনপিকে ক্ষমা চাইতে বলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণ করলেন। অর্থাৎ জামায়াত ক্ষমা চাইবে একাত্তরে পাকিস্তানি জান্তার অপকর্মে সহায়তার জন্য। আর বিএনপি ক্ষমা চাইবে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় পদে বসানোর জন্য।
মির্জা ফখরুল জামায়াতকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন, একাত্তরে তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য। আর গোলাম পরওয়ার বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী করার জন্য বিএনপিকে ক্ষমা চাইতে হবে। এ প্রসঙ্গে একাত্তরের জামায়াতে ইসলামী কী ভূমিকা নিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা কেবল ভারতীয় আগ্রাসন রুখতে অখণ্ড পাকিস্তানকে সমর্থন করেননি। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যাসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কাজে সক্রিয় সহায়তা করেছেন।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গঠিত প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিত্ব নিয়েছে। জামায়াত ও ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীদের দ্বারা গঠিত আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে হত্যা করেছে।
বিএনপি গঠিত হয় স্বাধীনতার আট বছর পর, ১৯৭৮ সালে। অতএব তাদের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ আনার সুযোগ নেই। তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, এ রকম কেউ কেউ পরবর্তীকালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে থাকেন, তাদের সম্পর্কে জামায়াত প্রশ্ন তুলতেই পারে।
দুই পক্ষের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে এই সত্যটি বেরিয়ে এল যে বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে। অন্যদিকে জামায়ত সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। দুই অন্যায়ের মাত্রা এক নয়। অতীতে জামায়াত যেমন এসব নিয়ে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করেনি, তেমনি বিএনপিও একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে এতটা সোচ্চার হয়নি।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। সংবিধানে ধর্মভিত্তিক দল গঠনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ধর্মীয় দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জামায়াতের রাজনীতি উন্মুক্ত হয়। প্রথমে তারা আইডিএল নামে এবং পরে স্বনামে মাঠে নামে।
এ কথা সত্য যে, ১৯৮০ সাল থেকে বিএনপি জামায়াতের সম্পর্কটি একই ধারায় চলেনি। কখনো জামায়াত বিএনপির মিত্র হিসেবে রাজনীতি করেছে, সরকারের অংশীদার হয়েছে। আবার কখনো বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে।
নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর সংসদে প্রধান বিরোধীদলের আসন পেয়ে এবারই জামায়াত বিএনপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করল। মির্জা ফখরুলের ক্ষমা চাওয়ার দাবির জবাবে তারাও একই দাবি জানাল বিএনপির প্রতি।
কিন্তু জামায়াতের দ্বিতীয় প্রধান নেতা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্দেশে করে যে মন্তব্য করেছেন, সেটা ‘বিলো দ্য বেল্টের’ পর্যায়ে পড়ে। তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বলেছেন, “আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন। কারণ, আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইব কেন? আপনার বাবা অপরাধী, এই অভিযোগ আছে। সুতরাং কথা সতর্কভাবে বলা উচিত।”
এতদিন আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপিকে যেই ভাষায় ঘায়েল করার চেষ্টা করতেন, এখন জামায়াতের নেতারাও সেটা শুরু করেছেন। মির্জা ফখরুল কিন্তু জামায়াতের কোনো নেতাকে নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি। কিন্তু জামায়াত করল।
নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত, এমনকি বর্তমান সময় পর্যন্ত দলটির কারণে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, কারও কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে আমির বলেন, “এই অ্যাপোলজি আমরা মিনিমাম তিনবার দিয়েছি। প্রফেসর গোলাম আযম সাহেব দিয়েছেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেব দিয়েছেন এবং আমি নিজে দিয়েছি।”
এই উপসম্পাদকীয়টি যখন লিখছি, তখনই আগামীর সময়ে একটি কৌতূহলোদ্দীপক খবর পড়লাম। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে চিহ্নিত জামায়াত, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগের নাম বাদ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যদের বিরোধিতার কারণে সেটা তারা করতে পারেনি।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও সংজ্ঞা চূড়ান্ত করে। এই সংজ্ঞায় বলা ছিল, মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা পদাধিকার বলে জামুকার চেয়ারম্যান।
গত বছর ১০ মে অনুষ্ঠিত সভায় উপদেষ্টা মহোদয় জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঠ্যবই থেকে উল্লিখিত দলগুলোর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন জামুকার সংজ্ঞা থেকেও সেটা বাদ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান।
উপদেষ্টা যখন দেখলেন জামুকার সদস্যরা কোনোভাবে দলগুলোর নাম বাদ দেবেন না, তখন তিনি এসব দলের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দটি বসানোর প্রস্তাব দেন এবং সেটা সবাই মেনে নেন। ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ওই সংজ্ঞাটিই আইনে পরিণত হয়। এই সংজ্ঞার বিষয়ে জামায়াত আপত্তি করলেও তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যরা সমর্থন করেছেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার তলে তলে জামায়াতের পক্ষেই কাজ করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ক্ষমা চাইতে বলে কোনো অন্যায় করেননি। বরং দলটিকে নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে যে বিতর্ক চলছিল, তারই অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। জামায়াত নেতারা অন্তত দায়টি তৎকালীন নেতাদের ওপর চাপাতে পারতেন। সেটাই হয়তো ন্যায্য হতো। কিন্তু তা না করে ইটের বদলে পাটকেল মারার যে নীতি তারা নিলেন, তা রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।
লেখক:সম্পাদক, চরচা।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যকে মোটেই ভালোভাবে নেননি জামায়াতের নেতারা।
মির্জা ফখরুল বাজেট বক্তৃতা দিলেন ২৮ জুন। ৩০ জুন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, “যে ভাষায় বাইরে ও পার্লামেন্টে আপনারা কথা বলেন, প্রশ্ন করেন, তাহলে আমাদেরও তো প্রশ্ন আছে। সেই জবাবটা তো বিএনপিকে দিতে হবে।” এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাহ আজিজুর রহমানকে, একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আরও ১৪-১৫ জনকে মন্ত্রী করার জন্য আগে বিএনপির ক্ষমা চাওয়া উচিত।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও যোগ করেন, “তারা (বিএনপি) বলে জামায়াতের ওপরে ভূত চেপেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সরকার আর সরকারি দলের ওপর ভূত চেপেছে। বিএনপি মহাসচিবের মাথায়ও ভূত চাপে। মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়কে সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেন। বিভ্রান্তির মাধ্যমে দেশকে আবার ফ্যাসিবাদের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি–এটাই বিএনপির অবস্থান।”
জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বিএনপিকে ক্ষমা চাইতে বলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণ করলেন। অর্থাৎ জামায়াত ক্ষমা চাইবে একাত্তরে পাকিস্তানি জান্তার অপকর্মে সহায়তার জন্য। আর বিএনপি ক্ষমা চাইবে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় পদে বসানোর জন্য।
মির্জা ফখরুল জামায়াতকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন, একাত্তরে তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য। আর গোলাম পরওয়ার বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী করার জন্য বিএনপিকে ক্ষমা চাইতে হবে। এ প্রসঙ্গে একাত্তরের জামায়াতে ইসলামী কী ভূমিকা নিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা কেবল ভারতীয় আগ্রাসন রুখতে অখণ্ড পাকিস্তানকে সমর্থন করেননি। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যাসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কাজে সক্রিয় সহায়তা করেছেন।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গঠিত প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিত্ব নিয়েছে। জামায়াত ও ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীদের দ্বারা গঠিত আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে হত্যা করেছে।
বিএনপি গঠিত হয় স্বাধীনতার আট বছর পর, ১৯৭৮ সালে। অতএব তাদের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ আনার সুযোগ নেই। তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, এ রকম কেউ কেউ পরবর্তীকালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে থাকেন, তাদের সম্পর্কে জামায়াত প্রশ্ন তুলতেই পারে।
দুই পক্ষের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে এই সত্যটি বেরিয়ে এল যে বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে। অন্যদিকে জামায়ত সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। দুই অন্যায়ের মাত্রা এক নয়। অতীতে জামায়াত যেমন এসব নিয়ে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করেনি, তেমনি বিএনপিও একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে এতটা সোচ্চার হয়নি।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। সংবিধানে ধর্মভিত্তিক দল গঠনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ধর্মীয় দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জামায়াতের রাজনীতি উন্মুক্ত হয়। প্রথমে তারা আইডিএল নামে এবং পরে স্বনামে মাঠে নামে।
এ কথা সত্য যে, ১৯৮০ সাল থেকে বিএনপি জামায়াতের সম্পর্কটি একই ধারায় চলেনি। কখনো জামায়াত বিএনপির মিত্র হিসেবে রাজনীতি করেছে, সরকারের অংশীদার হয়েছে। আবার কখনো বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে।
নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর সংসদে প্রধান বিরোধীদলের আসন পেয়ে এবারই জামায়াত বিএনপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করল। মির্জা ফখরুলের ক্ষমা চাওয়ার দাবির জবাবে তারাও একই দাবি জানাল বিএনপির প্রতি।
কিন্তু জামায়াতের দ্বিতীয় প্রধান নেতা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্দেশে করে যে মন্তব্য করেছেন, সেটা ‘বিলো দ্য বেল্টের’ পর্যায়ে পড়ে। তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বলেছেন, “আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন। কারণ, আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইব কেন? আপনার বাবা অপরাধী, এই অভিযোগ আছে। সুতরাং কথা সতর্কভাবে বলা উচিত।”
এতদিন আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপিকে যেই ভাষায় ঘায়েল করার চেষ্টা করতেন, এখন জামায়াতের নেতারাও সেটা শুরু করেছেন। মির্জা ফখরুল কিন্তু জামায়াতের কোনো নেতাকে নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি। কিন্তু জামায়াত করল।
নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত, এমনকি বর্তমান সময় পর্যন্ত দলটির কারণে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, কারও কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, তার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে আমির বলেন, “এই অ্যাপোলজি আমরা মিনিমাম তিনবার দিয়েছি। প্রফেসর গোলাম আযম সাহেব দিয়েছেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেব দিয়েছেন এবং আমি নিজে দিয়েছি।”
এই উপসম্পাদকীয়টি যখন লিখছি, তখনই আগামীর সময়ে একটি কৌতূহলোদ্দীপক খবর পড়লাম। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে চিহ্নিত জামায়াত, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগের নাম বাদ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যদের বিরোধিতার কারণে সেটা তারা করতে পারেনি।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও সংজ্ঞা চূড়ান্ত করে। এই সংজ্ঞায় বলা ছিল, মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা পদাধিকার বলে জামুকার চেয়ারম্যান।
গত বছর ১০ মে অনুষ্ঠিত সভায় উপদেষ্টা মহোদয় জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঠ্যবই থেকে উল্লিখিত দলগুলোর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন জামুকার সংজ্ঞা থেকেও সেটা বাদ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান।
উপদেষ্টা যখন দেখলেন জামুকার সদস্যরা কোনোভাবে দলগুলোর নাম বাদ দেবেন না, তখন তিনি এসব দলের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দটি বসানোর প্রস্তাব দেন এবং সেটা সবাই মেনে নেন। ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ওই সংজ্ঞাটিই আইনে পরিণত হয়। এই সংজ্ঞার বিষয়ে জামায়াত আপত্তি করলেও তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যরা সমর্থন করেছেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার তলে তলে জামায়াতের পক্ষেই কাজ করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ক্ষমা চাইতে বলে কোনো অন্যায় করেননি। বরং দলটিকে নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে যে বিতর্ক চলছিল, তারই অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। জামায়াত নেতারা অন্তত দায়টি তৎকালীন নেতাদের ওপর চাপাতে পারতেন। সেটাই হয়তো ন্যায্য হতো। কিন্তু তা না করে ইটের বদলে পাটকেল মারার যে নীতি তারা নিলেন, তা রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।