বাংলাদেশে আবার শিক্ষা নিয়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। কারণ এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেনি। এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই দুশ্চিন্তার শেষ নেই। যেন ছেলে চিরকুট লিখে বুড়িগঙ্গায় ঝাঁপ দেবে বলে নিখোঁজ হয়েছে।
আসলে ৩৬ শতাংশ পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতি তেমন কোনো টেনশনের ব্যাপার না। বরং অনেক বেশি উদ্বেগের হলো ৬৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী কিসের আশায় পরীক্ষার হলে গেল? তাদের আশাবাদকে ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঘোষণা করা উচিত!
এই দেশে পরীক্ষা এমন একটা ব্যাপার, যেটার উদ্দেশ্য কেউ জানে না, কিন্তু সবাই জানে এটা না দিলে জীবন শেষ। পরীক্ষা দিয়ে কী হবে, সেটা পরে দেখা যাবে। আগে পরীক্ষা দাও। তারপর ভর্তি পরীক্ষা দাও। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা দাও। তারপর চাকরির পরীক্ষা দাও। তারপর চাকরি না পেয়ে জীবনের পরীক্ষা দাও। এই হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস।
বাংলাদেশের শিক্ষা এখন আর শিক্ষা নয়। এটা একটা রিয়েলিটি শো। নাম হতে পারে, ‘কে হবে পরবর্তী বেকার?’ প্রথম রাউন্ডে এসএসসি। দ্বিতীয় রাউন্ডে এইচএসসি। তৃতীয় রাউন্ডে ভর্তি যুদ্ধ। চতুর্থ রাউন্ডে সিজিপিএ যুদ্ধ। পঞ্চম রাউন্ডে বিসিএস। শেষ রাউন্ডে বাবা জিজ্ঞেস করেন, “কিছু হলো?” প্রতিযোগী চোখের পানি মুছে বলেন, “আবার চেষ্টা করছি।” দর্শক করতালি দেয়।
একটা সময় গ্রামের মানুষ ভাবত, ছেলে পড়াশোনা করবে, কোট টাই পরবে, অফিসে যাবে, এসি রুমে বসবে। এখন ছেলে সত্যিই অফিসে যায়। তবে ইন্টারভিউ দিতে। অফিস থেকে বের হয়ে আবার অন্য অফিসে ইন্টারভিউ দিতে যায়। দিন শেষে বাড়ি ফিরে বলে, “আব্বা, আজও অভিজ্ঞতার কাছে হেরে গেলাম।”
এই দেশে অভিজ্ঞতা এমন এক জিনিস, যেটা চাকরি ছাড়া হয় না, আবার চাকরি পেতেও লাগে। এটা ঠিক সেই রকম, যেমন বলা হয়, আগে সাঁতার শিখে নদীতে নামো। কিন্তু সাঁতার শেখানো হবে নদীর মাঝখানে।
আর কোচিং সেন্টার? আহা! বাংলাদেশের প্রকৃত শিল্প যদি কিছু থাকে, সেটা গার্মেন্টসের পরে কোচিং। একটা শিশু জন্মানোর পাঁচ মিনিট পরই আত্মীয়স্বজন জিজ্ঞেস করে, “কোন স্কুলে দিবা?” শিশু তখনো কান্না করছে। মা বলছে, “আগে একটু দুধ খাক।” পাশ থেকে এক কোচিং মালিক বলে ওঠেন, “ম্যাডাম, আমাদের প্লে গ্রুপ ফাউন্ডেশন ব্যাচে ভর্তি করিয়ে দেন। পরে সিট পাবেন না।”
এ দেশে শিশু হাঁটতে শেখার আগেই ভর্তি ফর্ম পূরণ করে। কথা বলতে শেখার আগেই মডেল টেস্ট দেয়। হাসতে শেখার আগেই ব্যাচ বদলায়। আর কাঁদতে শেখে রেজাল্টের দিন। শিক্ষাব্যবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বইয়ের চেয়ে নোট মোটা। নোটের চেয়ে সাজেশন গুরুত্বপূর্ণ। সাজেশনের চেয়ে শর্ট সাজেশন গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত পুরো বইকে নামিয়ে আনা হয় একটা ভাঁজ করা কাগজে। সেটারও আবার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। মনে হয় জ্ঞান ও শিক্ষা ডায়েট করছে।
শিক্ষা এখন কোচিংয়ে পরিণত হয়েছে। এখন বিদ্যালয় শুধু কোচিংয়ের বিজ্ঞাপন ঝোলানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। স্কুলে ক্লাস হয় এই প্রমাণ দেওয়ার জন্য যে, কোচিংয়ের সত্যিই প্রয়োজন আছে। শহরে শিক্ষক স্কুলে এসে বোর্ডে দুটো লাইন লিখে বলেন, “বাকিটা কোচিংয়ে বুঝিয়ে দেব।” যেন মূল সিনেমা দেখানো হবে সন্ধ্যায়, সকালে শুধু ট্রেইলার চলছে। শিক্ষা এখন আর শ্রেণিকক্ষে হয় না, শিক্ষা এখন হয় মাসিক কিস্তিতে।
একটা সময় কোচিং ছিল দুর্বল ছাত্রদের জন্য। এখন কোচিংয়ে না গেলে আপনিই দুর্বল। আপনি যদি বলেন, “আমি শুধু স্কুলের পড়াই পড়ব”, সবাই এমনভাবে তাকায় যেন আপনি ঘোষণা দিয়েছেন, “আমি আজ থেকে বাতাস খেয়ে বাঁচব।” অভিভাবকেরা সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করেন সরকারি নিয়ম মেনে, আর কোচিংয়ে ভর্তি করেন ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে। কারণ স্কুলে না পড়লেও সমস্যা নেই, কোচিং মিস হলে সর্বনাশ নিশ্চিত।
বাংলাদেশে এখন শিক্ষার্থীর পরিচয় রোল নম্বর দিয়ে হয় না, হয় কোচিংয়ের নামে। “ও কোন স্কুলে পড়ে?” এই প্রশ্নের আর দাম নেই। এখন প্রশ্ন হয়, “ও কোন স্যারের ব্যাচে?” এমন দিন খুব দূরে নয়, যখন বিয়ের কাবিননামায় লেখা থাকবে, বর অমুক কোচিংয়ের গোল্ডেন ব্যাচের ছাত্র, কনে তমুক কোচিংয়ের এক্সক্লুসিভ ক্র্যাশ কোর্সের ছাত্রী।
কোচিং ব্যবসার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তারা পুরো জাতিকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে বই পড়া একটা পুরোনো প্রযুক্তি। বই পড়ে নাকি কেউ ভালো ফল করতে পারে না। দরকার শর্টকাট। প্রথমে সাজেশন, তারপর শর্ট সাজেশন, তারপর ফাইনাল সাজেশন, তারপর আল্টিমেট সাজেশন, তারপর কমন পড়লে যা লাগবে শুধু সেটা। শেষ পর্যন্ত পুরো পাঠ্যবইকে নামিয়ে আনা হয় একটা ভাঁজ করা কাগজে। মনে হয় জ্ঞানেরও ওজন কমানোর অভিযান চলছে। শিক্ষা নয়, যেন ইনস্ট্যান্ট নুডলস। দুই মিনিট গরম করলেই এ প্লাস।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, কোচিং এমন এক শিল্প যেখানে ব্যর্থতারও ব্যবসা আছে। ছাত্র ফেল করলে বলা হয়, “আরেকটা ব্যাচে ভর্তি হন।” ছাত্র পাস করলে বলা হয়, “দেখলেন তো, আমাদের কারণেই হয়েছে।” অর্থাৎ হারলেও কোচিংয়ের জয়, জিতলেও কোচিংয়ের জয়। এমন ব্যবসায়ী পৃথিবীতে আর আছে কি না সন্দেহ। বৃষ্টিতে ছাতা বিক্রি হয়, রোদে সানগ্লাস বিক্রি হয়, কিন্তু কোচিং এমন এক পণ্য, যা ঝড়, বৃষ্টি, রোদ, বন্যা, নির্বাচন, মহামারি সব মৌসুমেই চলে।
অভিভাবকদের অবস্থাও করুণ। সন্তানের পড়াশোনার চেয়ে তারা এখন বেশি ব্যস্ত ব্যাচ ম্যানেজ করতে। সোমবার গণিত, মঙ্গলবার ইংরেজি, বুধবার আইসিটি, বৃহস্পতিবার জীববিজ্ঞান, শুক্রবার মডেল টেস্ট, শনিবার বিশেষ ব্যাচ। শিশুর শৈশব কোথায় গেল, সেটা কেউ জানে না। ছেলেমেয়ে এখন মাঠে খেলতে গেলে মা বলেন, ‘দৌড়ানোর এত শখ? কোচিংয়ে যাও, সিট না পেলে তখন দৌড়াবে।”
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কোচিং এখন শিক্ষাব্যবস্থার অক্সিজেন নয়, ভেন্টিলেটর। কোচিং ব্যবসার সবচেয়ে বড় কীর্তি, তারা শিক্ষাকে পণ্য বানায়নি, তারা ভয়কে পণ্য বানিয়েছে। তারা বই বিক্রি করে না, তারা বিক্রি করে এই আতঙ্ক যে, “আমাদের কাছে না এলে আপনার সন্তান পিছিয়ে পড়বে।” আর পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে মানুষের ভয় বিক্রি করা। তাই বাংলাদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগে কোচিং মন্ত্রণালয় খুললেও খুব একটা পার্থক্য হতো না। কারণ বাস্তবতা হলো, স্কুলে ভর্তি হওয়া শিক্ষাজীবনের শুরু, আর কোচিংয়ে ভর্তি হওয়াই এখন শিক্ষাজীবনের প্রকৃত উদ্বোধন।
একসময় মানুষ বলত, ‘বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু।’ এখন ছাত্র বলে, “ভাই, বই পড়িস? এত সময় কই?” একটা সময় বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ছিল জ্ঞানচর্চা। এখন বিশ্ববিদ্যালয় হলো দীর্ঘমেয়াদি ওয়েটিং রুম। চার বছর ভর্তি থাকো। দুই বছর সেশনজটে থাকো। এক বছর চাকরির প্রস্তুতি নাও। তারপর আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোর্সে ভর্তি হও।
সেখানে প্রথম ক্লাসেই শেখানো হয়, “এখন কী করছ?” এই প্রশ্নের উত্তর হাসিমুখে কীভাবে দিতে হয়। বাংলাদেশে ডিগ্রি এখন ঠিক লটারির টিকিটের মতো। পাঁচ লাখ মানুষ কিনছে। পাঁচ হাজার জিতছে। বাকি সবাই ভাবছে, “আমার কপাল খারাপ।” কেউ জিজ্ঞেস করছে না, লটারির ব্যবসাটাই আসলে কেন চলছে? সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, সবাই শিক্ষাকে সম্মান করে। শুধু শিক্ষা ছাড়া!
শিক্ষক পড়ান কোচিংয়ের জন্য। ছাত্র পড়ে পরীক্ষার জন্য। অভিভাবক পড়ান আত্মীয়দের সামনে মুখ বাঁচানোর জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ায় টিকে থাকার জন্য। নিয়োগকর্তা ডিগ্রি দেখে না, দক্ষতা দেখে। কিন্তু দক্ষতা শেখানোর দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্নে সবাই হঠাৎ মোবাইল সাইলেন্ট করে ফেলে। একটা ছেলে বিশ বছর ধরে পড়ল। গণিত পড়ল। পদার্থবিজ্ঞান পড়ল। রসায়ন পড়ল। ইতিহাস পড়ল। দর্শন পড়ল। সাহিত্য পড়ল। তারপর চাকরির ইন্টারভিউতে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “এক্সেল পারেন?” ছেলে বলল, “আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স জানি।” ইন্টারভিউ বোর্ড বলল, “ভালো। কিন্তু এক্সেলে ভিলুকআপ পারেন?” সেদিন সে বুঝল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ ছিল এক্সেল শিট।
এদিকে আত্মীয়দের আচরণও গবেষণার বিষয়। এসএসসিতে এ প্লাস পেলে বলে, “ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে।” এইচএসসিতে এ প্লাস পেলে বলে, “এখন আসল যুদ্ধ।” বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে বলে, “চাকরি পেলে বুঝব।” চাকরি পেলে বলে, “বিয়ে কবে?” বিয়ে করলে বলে, “বাচ্চা কবে?” বাংলাদেশে আপনার অর্জনের মেয়াদ দুধের প্যাকেটের এক্সপায়ারি ডেটের চেয়েও কম। সামাজিক সম্মান এখানে সফটওয়্যার আপডেটের মতো। প্রতি মাসে নতুন ভার্সন লাগে।
সবশেষে আবার ফিরে আসি সেই ৩৬ শতাংশে। তারা পরীক্ষা দেয়নি বলে আমরা অবাক। বরং অবাক হওয়া উচিত, এত বছর ধরে একই নাটক দেখে, একই প্রতিশ্রুতি শুনে, একই প্রশ্ন মুখস্থ করে, একই লাইনে দাঁড়িয়ে, একই হতাশার গল্প শুনেও এত মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, এইবার হয়তো অলৌকিক কিছু ঘটবে! বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা আর নদী নয়, এটা মরীচিকা। যত সামনে এগোবেন, ততই মনে হবে পানি কাছে। আর কাছে গেলেই দেখা যাবে, ওটা আরেকটা কোচিং সেন্টারের ব্যানার। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘নিশ্চিত সাফল্য। শর্ত প্রযোজ্য।’ শর্তগুলো অবশ্য কখনো পোস্টারে লেখা থাকে না!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক