ads

শতবর্ষ পেরিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কোথায় যাচ্ছে?

শতবর্ষ পেরিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কোথায় যাচ্ছে?
ছবি: চরচা

শিরোনাম দেখে কি অস্বস্তি হচ্ছে? মনে কি হচ্ছে যে, এ আবার কেমন শিরোনাম! এমন প্রশ্ন কি কারো চেতনায় কাঁটা দিচ্ছে?

যাদের মনে বা মননে এমন অস্বস্তি হচ্ছে, তাদের বলি, আপনাদের অস্বস্তি দিতেই এমন শিরোনাম। কারণ কবিগুরু বলে গেছেন, সত্যরে নাকি সহজে গ্রহণ করে নিতে হয়। যে সত্যকে আমাদের মনের সুশীল অংশ সহজভাবে গ্রহণ করে নিতে পারে না, ঠিক সেই সত্যটিকে সামনে আনতেই কখনো কখনো নিচের বা অগোচরে থাকার বস্তুকে সামনে আনতে হয়। কেন এ কথা? কথাটি আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষ শিক্ষার্থীদের একাংশের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে।

একটু খুলে বলা যাক। ভদ্র ভাষায় বলা আন্ডারওয়্যার বা খাঁটি বাংলায় বলা জাঙ্গিয়া আজ আর আন্ডারে থাকতে চাইছে না। কিছু শিক্ষার্থী, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী একে আপার পজিশনে নিয়ে আসতে চাইছে।

কারণটা শুনলে যে কেউ স্তম্ভিত হয়ে যেতে পারে। কারণটা হলো মেয়েদের, যারা আবার সেইসব শুধু জাঙ্গিয়া পরে থাকতে ইচ্ছুক ছেলে শিক্ষার্থীদেরই সহপাঠী বা বড়, ছোট বোন–তাদের ঠেকাতে হবে!

তা সেই মেয়েরা কী করতে চেয়েছিল? প্রতিবাদ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের মাঠে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখতে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।

ঘটনা পুরোটা বুঝতে আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২৬ জুন নরওয়ে ও ফ্রান্সের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে এক সাবেক শিক্ষার্থী দম্পতিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৬ জন সাবেক শিক্ষার্থী হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হন। অভিযোগ উঠেছে, হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক মো. সাজু মিয়াসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ওই সাবেক শিক্ষার্থীদের জোর করে হল থেকে বের করে দেন।

টিএসসিতে আর্জেন্টাইন ভক্তদের উল্লাস। ছবি: চরচা
টিএসসিতে আর্জেন্টাইন ভক্তদের উল্লাস। ছবি: চরচা

এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রী। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। সেই আয়োজনের অংশ হিসেবে এক সাবেক শিক্ষার্থী তার স্ত্রীকে নিয়ে শহীদুল্লাহ হলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে একজন নারী থাকায় হল সংসদের শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদক সাজু ও তার সহযোগীরা ওই দম্পতিকে বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক ও হয়রানিমূলক প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে তারা (দম্পতি) খেলা না দেখেই হল ছাড়তে বাধ্য হন।

এমন ঘটনা এবং এর সঙ্গে কার্জন হলে দুই শিক্ষার্থীর ভিডিও গোপনে ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে মোরাল পুলিশিং করার অভিযোগ সামনে এনে পুরো ক্যাম্পাসে নারীবিদ্বেষ রোখার হিসাব থেকেই প্রতিবাদস্বরূপ গত ২৮ জুন সেই শহীদুল্লাহ হলেই বিশ্বকাপ ফুটবলের আর্জেন্টিনা-জর্ডানের ম্যাচ দেখতে জড়ো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা। এর পূর্বঘোষণাও দেওয়া হয়। আর তখনই আসে জাঙ্গিয়া পরার পাল্টা প্রতিক্রিয়া!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে সাম্প্রতিক ‘নারীবিদ্বেষী’ ঘটনার প্রতিবাদে ২৮ জুন প্রক্টরের কাছে নারী শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি দেওয়ার পর সানজানা চৌধুরী বলেছেন, নারীদের খেলা দেখার ঘোষণায় শহীদুল্লাহ হলেরই টিটু নামের আরেক শিক্ষার্থী নাকি আন্ডারওয়্যার পরে ওইসময় উপস্থিত থাকার ঘোষণা দেয়। একইসাথে বেডের বা সোজা বাংলায় বিছানার ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

কেন নারীদের ঠেকাতে জাঙ্গিয়া পরার ঘোষণা আসে? বা বিছানার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়?

কারণ, আমাদের বাংলায় একটি বিষয় বহুকাল ধরেই চলে আসছে যে, নারীদের ঠেকানোর মোক্ষম অস্ত্র হলো যৌন আক্রমণ। ওই একটি অস্ত্রের মধ্য দিয়েই নারীকে চূড়ান্তভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা সব সময় চলে। ধরেই নেওয়া হয় যে, যৌন হেনস্থা বা যৌন হেনস্থার হুমকি দেওয়াই নারীকে কোণঠাসা করার একমাত্র অস্ত্র। তার জন্য এই বাংলার অনেক পুরুষ নিজেরা ন্যাংটো হয়ে রাস্তায় ঘুরতেও রাজি। ঠিক যেমনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছেলে এখন করতে চাইছে। প্রয়োজনে নিজেরা দিগম্বর হয়ে হলেও নারীকে ঠেকাতে হবে! নারী যেন পুরুষের নির্লজ্জতার ভয়ে হলেও প্রতিবাদ করতে না পারে-এটিই হলো তাদের একমাত্র চাওয়া।

বাংলাদেশের এ ধরনের পুরুষের কাছে জিজ্ঞাসা-আপনারা কি বাইরের পাশাপাশি ঘরেও জাঙ্গিয়া তত্ত্বই খাটান? সবকিছুতেই বিছানার ভয় দেখান? সবকিছুই আপনাদের জাঙ্গিয়া বা তার নিচে থাকা অঙ্গটি দিয়ে ঠেকাতে হয় কেন? আর কিছু কি অবশিষ্ট নেই?

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা অভিযোগ তুলে বলেছেন, জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলা ডাকসু নাকি এসব বিষয় টুঁ শব্দ করছে না তাৎক্ষণিকভাবে। আর কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী তো বলেই দিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর নারীবান্ধব নেই। ডাকসু নারীদের প্রতি কমিটমেন্ট রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

এখন ডাকসুর এই ব্যর্থতা সামগ্রিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই ব্যর্থতা। পুরুষ শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে সেই দায় একটু বেশিই বর্তায়। আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আর কীইবা বলার আছে! সেটি তো ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকতেই বোধহয় বেশি ভালোবাসে।

ছবি: চরচা
ছবি: চরচা

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কোনো বিষয় নয়। সেসব বড় পর্দার ম্যাচ নারী-পুরুষ, সব শিক্ষার্থী মিলেই দেখত। অন্তত নিজের ছাত্রত্ব থাকাকালে তেমনটাই প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে এই লেখকের। কিন্তু এভাবে যৌন হেনস্তা করার প্রকাশ্য হুমকি কখনোই দেখা হয়নি। যদিও এখন দিন বদলেছে, অনেক কিছুই হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মব করে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনাও তো আগে ঘটেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে জোর করে বেড়া দেওয়ার ইচ্ছাও আগে এতটা উদগ্রভাবে প্রকাশ করেনি। সব মিলিয়ে আসলে একটি আবদ্ধ ও চরম কূপমণ্ডুক এবং সহিংস মানসিকতার প্রকাশই দেখা যাচ্ছে। শহরের মাঝখানে থাকা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলছে ‘বহিরাগত’ প্রসঙ্গ এবং সেই প্রসঙ্গে যাকে-তাকে ধরে কখনো পেটাচ্ছে, কখনো কটু কথা শোনাচ্ছে। এবার সেই ধারাবাহিকতাতেই হয়তো এলো নারীদের বিরুদ্ধে জাঙ্গিয়া পরা ও বিছানার ব্যবস্থা করার হুমকি!

তো এভাবে চললে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সামাজিক সম্মান ও গর্বের মিনার তৈরি করা আছে গত ৫০ বছরের বেশি সময়ে ধরে, সেটি চুরমার হতে আর বেশি সময় লাগবে না। সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১০৬ বছর হলো। শত বছর ধরে টিকে থাকা এবং বাংলাদেশের সকল জাতীয় আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একটি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যদি যৌন হেনস্তার ভয়ে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাই ঢুকতে ভয় পান, তবে আর সেটির মান-সম্মান কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে? তারা কি মা-বোনদের ঢাকার রাস্তায় বের হলেই সাবধান করে বলবে যে, “খবরদার ঢাবিতে যেও না, ওখানে ছেলেরা জাঙ্গিয়া পরে ঘোরে!”

আগে চান্স পেয়ে দেখানোর মতো জাঙ্গিয়া পরে ভয় দেখানোর বখাটেপনা যদি ঢাবিয়ানদের গর্বের প্রতীক হয়ে উঠতে চায়, তাহলে অবশ্য বলার কিছু নেই। জন্মদিনের মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সেই বাছাই নিয়েই ভাবা উচিত আসলে। এসবে মত না থাকলে প্রতিবাদও জোরালো হওয়া উচিত, হওয়া উচিত সমস্বরে।

নইলে হয়তো সামনের জন্মদিনগুলোয় ক্রমে নারীবিদ্বেষী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই কুখ্যাত হতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ দাবি করে ফ্লেক্স নেওয়ার কষ্ট অবশ্য তাতে কমবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়েও খুঁজতে হবে না আর কষ্ট করে। কারণ, বখাটেপনা বা অসভ্যতা নিশ্চয়ই সেসবে সূচক হিসেবে বিবেচ্য থাকে না!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত